২৫ কোটি খ্রিস্টান কেন ৭ জানুয়ারি বড়দিন পালন করেন?
যিশু খ্রিস্টের জন্মস্থান বেথেলহেম। তার জন্মদিন উপলক্ষে ২৫ ডিসেম্বর বিশ্বজুড়ে বড়দিনের উৎসবে মেতে ওঠে সবাই। কিন্তু পূর্ব ইউরোপ, ফিলিস্তিন ও মিসরের মতো আরব বিশ্বের বহু খ্রিস্টধর্মের অনুসারী ৭ জানুয়ারি বড়দিন পালন করছেন।
বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৫ কোটি মানুষের এই বিশাল সম্প্রদায়ের কাছে ২৫ ডিসেম্বর নয়, বরং ৭ জানুয়ারিই উৎসবের আসল দিন।
একই উৎসব, দুই দিন কেন?
কিছু খ্রিস্টান ৭ জানুয়ারি বড়দিন পালন করেন বলে এর কারণ এটি নয় যে তারা যিশুর জন্মদিন নিয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেন। এর পেছনের আসল কারণ হলো বর্ষপঞ্জি বা ক্যালেন্ডারের ভিন্নতা।
এই পার্থক্যের সূত্রপাত সেই ১৫৮২ সালে। তখন পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি ক্যাথলিক চার্চের জন্য 'গ্রেগরিয়ান' নামে নতুন এক ক্যালেন্ডার চালু করেন। এটি ছিল পুরোনো 'জুলিয়ান' ক্যালেন্ডারের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভুল।
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬ অব্দে জুলিয়াস সিজার জুলিয়ান ক্যালেন্ডার প্রবর্তন করেছিলেন। কিন্তু এতে সৌর বছরের হিসেবে ১১ মিনিটের সামান্য গরমিল ছিল। আপাতদৃষ্টিতে সামান্য মনে হলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ভুলের কারণে ঋতুগুলোও ক্যালেন্ডার থেকে সরে যেতে থাকে।
জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে প্রতি ১২৮ বছরে একদিন পিছিয়ে পড়ে। অন্যদিকে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে ৩ হাজার ২৩৬ বছরে একদিনের হেরফের হয়। তাই এটি প্রকৃত সৌর বছরের অনেক বেশি কাছাকাছি।
এই সময়ের ব্যবধান ঘোচাতে পৃথিবীকে ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে ১০ দিন এগিয়ে নিতে হয়েছিল। গত ১৫ শতাব্দী ধরে জমে থাকা সময়ের ঘাটতি মেটাতেই এমনটা করা হয়।
বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ নতুন গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রহণ করে নিলেও, অনেক অর্থোডক্স ও ইস্টার্ন খ্রিস্টান চার্চ তাদের পুরোনো ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরে জুলিয়ান ক্যালেন্ডারই মেনে চলতে থাকে।
বর্তমানে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের চেয়ে ১৩ দিন পিছিয়ে আছে। অর্থাৎ জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী যা ২৫ ডিসেম্বর, আমাদের আধুনিক ক্যালেন্ডারে তা আসলে ৭ জানুয়ারি।
মজার ব্যাপার হলো, অর্থোডক্স চার্চ যদি এভাবেই জুলিয়ান ক্যালেন্ডার ব্যবহার চালিয়ে যায়, তবে ২১০১ সালে বড়দিনের তারিখ আবারও বদলে যাবে। তখন ১৩ দিনের ব্যবধান বেড়ে ১৪ দিন হবে। ফলে বড়দিন পালিত হবে ৮ জানুয়ারি।
কারা ৭ জানুয়ারি বড়দিন পালন করেন?
বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ২৩০ কোটি খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী রয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ২০০ কোটি মানুষ ২৫ ডিসেম্বর বড়দিন পালন করেন। এই তালিকায় আছেন প্রায় ১৩০ কোটি ক্যাথলিক, ৯০ কোটি প্রোটেস্ট্যান্ট এবং কিছু অর্থোডক্স খ্রিস্টান।
বাকি ২৫ থেকে ৩০ কোটি খ্রিস্টান ৭ জানুয়ারি বড়দিন উদযাপন করেন। এরা মূলত অর্থোডক্স ও কপটিক সম্প্রদায়ের মানুষ। এই দিনটি 'ওল্ড ক্রিসমাস ডে' হিসেবেও পরিচিত।
৭ জানুয়ারি যারা বড়দিন পালন করেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- রাশিয়ান অর্থোডক্স চার্চ (এই ঐতিহ্যের সবচেয়ে বড় গোষ্ঠী)।
- সার্বিয়ান ও জর্জিয়ান অর্থোডক্স চার্চ।
- কপটিক অর্থোডক্স চার্চ (মূলত মিসরে)।
- ইথিওপিয়ান ও এরিত্রিয়ান অর্থোডক্স তাওয়াহেদো চার্চ।
ইউক্রেনে ঐতিহাসিকভাবে ৭ জানুয়ারি বড়দিন পালিত হতো। তবে ২০২৩ সালে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ছুটির দিনটি ২৫ ডিসেম্বরে পরিবর্তন করে। পশ্চিমা ঐতিহ্যের সঙ্গে তাল মেলাতেই এই সিদ্ধান্ত। অবশ্য অনেক নাগরিক এখনো মনের টানে জানুয়ারির তারিখটিই মেনে চলেন।
গ্রিস ও রোমানিয়ার মতো অর্থোডক্স দেশগুলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে ২৫ ডিসেম্বরে সরে আসে। বুলগেরিয়াও পরে এই পথ অনুসরণ করে। ১৯৬৮ সালে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ২৫ তারিখে উৎসব পালন শুরু করে।
বেলারুশ ও মলদোভায় ২৫ ডিসেম্বর ও ৭ জানুয়ারি—উভয় দিনই সরকারি ছুটি থাকে। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা এবং এরিত্রিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলেও দুই দিনই উৎসব পালিত হয়।
১ জানুয়ারি কেন নতুন বছর?
খ্রিস্টধর্মের বহু আগে, খ্রিষ্টপূর্ব ১৫৩ অব্দে রোমানরা ১ জানুয়ারিকে নববর্ষ হিসেবে ঠিক করেছিল। রোমান সরকারের নেতাদের দায়িত্ব নেওয়ার নতুন মেয়াদ শুরু হতো এই দিনে। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬ অব্দে জুলিয়াস সিজার তার ক্যালেন্ডার সংস্কারের সময় ১ জানুয়ারি তারিখটি বহাল রাখেন। কারণ এই মাসের নামকরণ হয়েছিল শুরুর দেবতা 'জানুস'-এর নামানুসারে।
যিশুর জন্মের সঠিক তারিখ নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। ২৫ মার্চ যিশু মায়ের গর্ভে এসেছিলেন বলে আদি খ্রিস্টানরা বিশ্বাস করতেন। এই তারিখের সঙ্গে ৯ মাস যোগ করে ২৫ ডিসেম্বরকে বড়দিন হিসেবে বেছে নেওয়া হয়।
রোমান রাজনীতি এবং খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্বের সংমিশ্রণের কারণেই যিশুর জন্মদিনে বছর শুরু হয় না।
ক্যালেন্ডারের নানা প্রকারভেদ
বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতি ভিন্ন ভিন্ন ক্যালেন্ডার ব্যবহার করে। এগুলো মূলত সূর্য ও চাঁদের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
সৌর পঞ্জিকা বা সোলার ক্যালেন্ডার: এটি সূর্যের ওপর ভিত্তি করে চলে। এক বছরে ৩৬৫ দিন ধরা হয়। অধিবর্ষ বা লিপ ইয়ারে হয় ৩৬৬ দিন। বছরটি ১২টি মাসে বিভক্ত। ইংরেজি মাসের নামগুলো মূলত ল্যাটিন ও রোমান ঐতিহ্য থেকে এসেছে। জুলিয়ান এবং পরে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারেও এই নামগুলো রয়ে গেছে।
গ্রেগরিয়ান, কুর্দি এবং পার্সিয়ান ক্যালেন্ডার হলো সৌর পঞ্জিকার উদাহরণ। পার্সিয়ান ক্যালেন্ডারে ২১ মার্চ 'নওরোজ' বা নতুন দিন পালিত হয়। এটি বসন্তের শুরু নির্দেশ করে।
চন্দ্র পঞ্জিকা বা লুনার ক্যালেন্ডার: এটি চাঁদের ওপর ভিত্তি করে চলে। এতে বছরে ৩৫৪ দিন থাকে। ১২টি চন্দ্র মাস হয় ২৯ বা ৩০ দিনে। চাঁদ তার দশা বা ফেইজগুলো শেষ করতে এই সময় নেয়।
সৌর পঞ্জিকার চেয়ে চন্দ্র পঞ্জিকা ১০ থেকে ১২ দিন ছোট হয়। তাই প্রতিবছর লুনার নিউ ইয়ার বা চন্দ্র নববর্ষের তারিখ বদলায়।
ইসলামি বা হিজরি ক্যালেন্ডার একটি চন্দ্র পঞ্জিকা। ২০২৬ সালে নতুন হিজরি বছর বা পহেলা মহরম শুরু হতে পারে ১৬ জুন।
লুনিসোলার ক্যালেন্ডার: এই ক্যালেন্ডারে চন্দ্র ও সৌর—উভয় পঞ্জিকার বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
এতে দিন নির্ধারণে চন্দ্র পদ্ধতি এবং মাস নির্ধারণে সৌর পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। চাঁদের দশা অনুযায়ী এটি ভাগ করা থাকে। তবে সৌরচক্রের সঙ্গে মিল রাখতে এতে সমন্বয় করা হয়।
ইহুদি, হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ এবং চীনা ক্যালেন্ডার হলো লুনিসোলার ক্যালেন্ডারের উদাহরণ।
