ইরানে বিক্ষোভ দমনে হুঁশিয়ারি: ‘রেড লাইন’ ঘোষণা রেভল্যুশনারি গার্ডসের
ইরানে কয়েক বছরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া সবচেয়ে ব্যাপক গণবিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে দেশটির ক্ষমতাধর রেভল্যুশনারি গার্ডস। শনিবার এক বিবৃতিতে তারা নিরাপত্তাকে 'রেড লাইন' বা চরম সীমা হিসেবে ঘোষণা করে সরকারি সম্পদ ও জননিরাপত্তা রক্ষায় সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন সতর্কতা এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কর্তৃক বিক্ষোভকারীদের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থনের পর তেহরানের পক্ষ থেকে এই সামরিক পদক্ষেপের ঘোষণা এল। শনিবার রুবিও এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাহসী জনগণের পাশে রয়েছে।'
এদিকে গতরাত জুড়েও ইরানের বিভিন্ন স্থানে অস্থিরতা অব্যাহত ছিল। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, তেহরানের পশ্চিমে কারাজ শহরে একটি পৌর ভবনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে 'দাঙ্গাকারীরা'। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে শিরাজ, কোম এবং হামেদানে বিক্ষোভের সময় নিহত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের জানাজার দৃশ্য সম্প্রচার করা হয়েছে।
মূলত লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতির প্রতিবাদে দুই সপ্তাহ আগে এই বিক্ষোভ শুরু হলেও দ্রুত তা রাজনৈতিক রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীরা ইরানের বর্তমান ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার অবসান দাবি করছেন। তবে তেহরান কর্তৃপক্ষ এই অস্থিরতা উসকে দেওয়ার জন্য শুরু থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে অভিযুক্ত করে আসছে। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো জানিয়েছে, বিক্ষোভে এ পর্যন্ত বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
অস্থিরতা দমনে কর্তৃপক্ষ দেশজুড়ে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট বা ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা বজায় রেখেছে। ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় এক প্রত্যক্ষদর্শী টেলিফোনে জানিয়েছেন, রেভল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) ওই এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে এবং তারা সরাসরি গুলি চালাচ্ছে। নিরাপত্তার স্বার্থে ওই ব্যক্তি তার নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।
রাষ্ট্রীয় টিভিতে প্রচারিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানিয়েছে, গত দুই রাতে 'সন্ত্রাসীরা' সামরিক ও আইন প্রয়োগকারী ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করেছে এবং বেশ কয়েকজন সাধারণ নাগরিক ও নিরাপত্তা কর্মীকে হত্যা করেছে। তারা সরকারি সম্পদে অগ্নিসংযোগকেও অগ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করেছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের অর্জন রক্ষা এবং নিরাপত্তা বজায় রাখা একটি 'রেড লাইন' এবং বর্তমান পরিস্থিতি আর সহ্য করা হবে না।
রেভল্যুশনারি গার্ডসের পাশাপাশি ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনী যা সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সরাসরি কমান্ডে পরিচালিত হয় ঘোষণা করেছে যে তারা 'জাতীয় স্বার্থ, কৌশলগত অবকাঠামো এবং জনগণের সম্পদ' রক্ষা করবে।
ইরানের বর্তমান শাসনের বিরুদ্ধে যখন তীব্র ক্ষোভ বাড়ছে, তখন নির্বাসিত শেষ শাহ-র পুত্র রেজা পাহলভি বিদেশ থেকে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশ্যে সরব হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত পাহলভি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'এক্স'-এ এক বার্তায় বলেন, 'আমাদের লক্ষ্য এখন কেবল রাস্তায় নামা নয়; আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে শহরের কেন্দ্রগুলো দখল করা এবং সেগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা।'
তিনি পরিবহন, তেল, গ্যাস এবং জ্বালানিসহ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতের শ্রমিক ও কর্মচারীদের দেশব্যাপী ধর্মঘটের আহ্বান জানিয়েছেন। তবে গত বৃহস্পতিবার ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন যে তিনি পাহলভির সঙ্গে সাক্ষাতে আগ্রহী নন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কোনো বিরোধী নেতাকে সমর্থনের আগে ট্রাম্প পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
গত গ্রীষ্মে ইরানে বোমা হামলা চালানো ট্রাম্প শুক্রবার পুনরায় সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, 'আপনারা (ইরান সরকার) গুলি চালানো শুরু করবেন না, কারণ তাহলে আমরাও গুলি চালানো শুরু করব।' তিনি আরও বলেন, 'আমি আশা করি ইরানের বিক্ষোভকারীরা নিরাপদ থাকবে, কারণ ওই দেশ এখন অত্যন্ত বিপজ্জনক স্থানে পরিণত হয়েছে।'
মাঠপর্যায়ে কিছু বিক্ষোভকারীকে পাহলভির সমর্থনে স্লোগান দিতে দেখা গেলেও বেশির ভাগ স্লোগান ছিল ধর্মীয় শাসনের অবসান এবং বিপর্যস্ত অর্থনীতি সংস্কারের দাবিতে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইরানের একজন চিকিৎসক জানিয়েছেন, শুক্রবার থেকে বিপুল সংখ্যক আহত বিক্ষোভকারীকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকে গুরুতর প্রহারের শিকার হয়েছেন; অনেকের মাথায় আঘাত, পা ও হাত ভাঙা এবং গভীর ক্ষত রয়েছে। অন্তত ২০ জনকে তাজা গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পাওয়া গেছে, যাদের মধ্যে ৫ জন পরে মারা যান।
