ভেনেজুয়েলা নিয়ে ট্রাম্পের কোনো বাস্তব পরিকল্পনা নেই
শনিবার সকালে বিশ্ব জেগে ওঠে এক বিস্ময়কর খবরে—মাসের পর মাস সামরিক প্রস্তুতির পর যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন স্থাপনায় বোমা হামলা চালিয়েছে এবং একটি বিশেষ অভিযানে, যার বিস্তারিত এখনো অস্পষ্ট, দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করেছে। তাঁদের দুজনকেই এখন যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার আওতায় নেওয়া হচ্ছে, মাদক পাচার ও অস্ত্র রাখার অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করতে।
তবে সবচেয়ে বড় বিস্ময়টি আসে পরে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার-এ-লাগো এস্টেট থেকে দেওয়া সংবাদ সম্মেলনে। প্রত্যাশিত আত্মপ্রচারমূলক বক্তব্যের মাঝেই ট্রাম্প হঠাৎ ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে—যতক্ষণ না সেখানে (শাসনক্ষমতার) 'রূপান্তর' ঘটে।
এই দাবি ছিল অদ্ভুত। ভেনেজুয়েলা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাদুরোর প্রতি অনুগত নিরাপত্তা বাহিনী এখনো রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন শহরের রাস্তায় সক্রিয়, এবং বিরোধী পক্ষের কোনো গণঅভ্যুত্থানের লক্ষণ নেই। প্রায় ৩ কোটি মানুষের এই বিশাল দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা কোথাও দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করেনি।
২০১৯ সালে ভেনেজুয়েলার সাবেক জাতীয় পরিষদের সভাপতি হুয়ান গুইদোকে অন্তর্বর্তী গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট হিসেবে বসানোর ব্যর্থ চেষ্টার পর থেকেই মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরানো ট্রাম্পের ব্যক্তিগত প্রকল্পে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু এবার, অন্তত বিষয়টি গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রশ্নে করা হয়নি।
ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীর আটককে ব্যাখ্যা করছে একটি লক্ষ্যভিত্তিক 'আইন প্রয়োগকারী' অভিযান হিসেবে, এবং ভেনেজুয়েলায় বোমা ফেলাকে তার প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ বলে দাবি করছে। বিশেষ অভিযানটি দ্রুতই তাদের 'টার্গেট' নিয়ে এলাকা ত্যাগ করে, এবং বিপর্যস্ত এই লাতিন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী সেনা উপস্থিতির কোনো সরকারি স্বীকৃতিও নেই।
ভেনেজুয়েলার ভেতরে বোমা হামলা চালানো হয় দূর থেকে—বিমানঘাঁটি, সামরিক ব্যারাক ও দুর্গ, এবং একটি বন্দরসহ একাধিক স্থাপনায় আঘাত হানা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী দেশের ভেতরে কোনো দৃশ্যমান শারীরিক উপস্থিতি রেখে যায়নি। তাহলে ট্রাম্প ও যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে ভবিষ্যৎ কোনো রাজনৈতিক রূপান্তর 'নিয়ন্ত্রণ' করবে বলে ভাবছে?
এখানেই আসে প্রকৃত 'ট্রাম্পীয়' চমক। ভেনেজুয়েলায় একটি বিকল্প ও বৈধ সরকার প্রস্তুত অবস্থায় থাকলেও ট্রাম্প সঙ্গে সঙ্গেই তাদের উপেক্ষা করেন। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিরোধী পক্ষই জয়ী হয়েছিল—নিষিদ্ধ বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর পরিবর্তে প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ানো এদমুন্দো গনসালেসের মাধ্যমে।
কিন্তু বিরোধী আন্দোলনের দিকে না গিয়ে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেসের সঙ্গে আলোচনা করছেন—যিনি নিজেই যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায়। ট্রাম্প বলেন, রদ্রিগেস নাকি 'খুবই ভদ্র' এবং ভেনেজুয়েলাকে আবার 'মহান' করতে প্রস্তুত, এবং তাঁর 'অন্য কোনো উপায় নেই'। কিন্তু, এর কয়েক ঘণ্টা পরই, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও পুলিশপ্রধানকে পাশে নিয়ে রদ্রিগেস টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অস্বীকার করেন এবং প্রকাশ্যে মাদুরোর প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।
ট্রাম্পের ইঙ্গিত ছিল, এটি এক ধরনের বাস্তববাদী বা রিয়ালপলিটিক ভিত্তিক শাসন পরিবর্তনের রূপরেখা—যেখানে পুরোনো ব্যবস্থার ভেতরের শক্তিগুলোর সমর্থন থাকবে। কিন্তু ভেনেজুয়েলার অধিকাংশ নাগরিক, দেশটির ভেতরে বা গত এক দশকে দেশ ছেড়ে যাওয়া প্রায় ৮০ লাখ প্রবাসীর কেউই এটি চান না। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ভোটাররা মাদুরো ও তাঁর অনুচরদের প্রত্যাখ্যান করেছেন—প্রায় ৭০ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন গনসালেস, পরোক্ষভাবে মাচাদোও। এটি ছিল পরিবর্তন ও গণতন্ত্রের পক্ষে এক সুস্পষ্ট গণরায়, যার স্বীকৃতি দেয় নোবেল কমিটিও, গত বছরের শেষ দিকে মাচাদোকে শান্তিতে নোবেল দিয়ে।
এই প্রেক্ষাপটে আরও বিস্ময়কর ছিল মার-এ-লাগোতে ট্রাম্পের সংবাদ সম্মেলনে মাচাদোর জনপ্রিয় বৈধতাকে কার্যত অস্বীকার করা। একই ব্রিফিংয়ে ট্রাম্প বলেন, "আমি মনে করি তাঁর নেতা হওয়া খুব কঠিন হবে। দেশের ভেতরে তাঁর সমর্থন বা সম্মান নেই।" কাকতালীয় নয় যে, ট্রাম্প নিজেও ওই শান্তিতে নোবেল পাওয়ার জন্য জোর লবিং করেছিলেন।
৩ জানুয়ারির এই নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহ গণতন্ত্র বা মানবাধিকারের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার চেয়ে বেশি মনে হয়েছে এক ধরনের সীমিত ও ব্যবহারিক প্রয়াস—যার লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের এমন এক আঞ্চলিক মাথাব্যথাকে সরিয়ে দেওয়া, যে সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে গণতান্ত্রিক নীতিমালা লঙ্ঘন করেছে এবং কিউবা, ইরান ও রাশিয়ার মতো রাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছে।
কোনো স্পষ্ট রূপান্তর পরিকল্পনা ছাড়া একজন প্রেসিডেন্টকে সরিয়ে দেওয়া এবং সেই কাজটি সম্পন্ন করতে তাঁরই পুরোনো শাসনব্যবস্থার ওপর নির্ভর করা—এটি গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান নয়। এটি বিশৃঙ্খলার রেসিপি।
শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা ছিল অসংলগ্ন। আগস্টে যখন নৌবাহিনীর প্রস্তুতি শুরু হয়, তখন প্রকাশ্য উদ্দেশ্য ছিল ভেনেজুয়েলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক প্রবাহ ঠেকানো। কিন্তু বাস্তব তথ্য ভিন্ন কথা বলছিল: ভেনেজুয়েলা মূলত একটি ট্রান্সশিপমেন্ট পয়েন্ট, যুক্তরাষ্ট্রে কোকেনের বড় সরবরাহকারী নয়, এবং দেশটি ফেন্টানিল উৎপাদনও করে না—যদিও ট্রাম্প প্রশাসন বারবার সে দাবি করেছে এবং মাদুরো সরকারকে 'নার্কো-সন্ত্রাসী' হিসেবে চিহ্নিত করতে চেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেন্টানিল সংকটের সঙ্গে মাদুরোকে যুক্ত করার আগের চেষ্টার পরও, শেষ পর্যন্ত মাদুরোর বিরুদ্ধে মার্কিন আদালতে দায়ের করা অভিযোগপত্রে শুধু কোকেনের কথাই উল্লেখ করা হয়।
৩ জানুয়ারির ঘটনার আগে দীর্ঘ প্রস্তুতিপর্বে ট্রাম্প প্রশাসনের আশা ছিল, উল্লেখযোগ্য নৌবহর মোতায়েন ও ট্রাম্পের হুমকিমূলক ভাষণ ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনীকে মাদুরোর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে বাধ্য করবে। কিন্তু, 'স্বল্প খরচে শাসক পরিবর্তন'-এর আশাবাদী দৃশ্যপট ব্যর্থ হয়; কিন্তু একবার গতি তৈরি হলে উত্তেজনার পথ থেকে সরে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রস্তুতি ও হুমকি যখন কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি, তখন নিরাপদ দূরত্ব থেকে বোমা হামলা এবং সম্ভবত ভেতরের সহযোগিতায় মাদুরোকেই সরাসরি ধরে আনা হয়।
সমস্যা হলো, এই উদ্যোগের সাফল্য সীমাবদ্ধ থেকেছে মাদুরো সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বকে অপসারণে এবং ভবিষ্যৎ অস্থিরতা নিয়ে ভেনেজুয়েলাবাসীর মধ্যে ভীতি সঞ্চারে। মাদুরোর সাবেক সরকারের ভেতরের শক্তিগুলো—রদ্রিগেস নিজেও এর মধ্যে রয়েছেন—ইতোমধ্যেই ক্ষমতার জন্য দরকষাকষি শুরু করেছে।
ট্রাম্প হয়তো আশা করছেন, আকাশ থেকে আরও বিপদের হুমকি দিয়ে ভেনেজুয়েলার শাসকগোষ্ঠীকে ওয়াশিংটনের ইচ্ছামতো চলতে বাধ্য করা যাবে। কিন্তু মাচাদোর গণতান্ত্রিক বৈধতাকে উপেক্ষা করে এবং মাদুরোপন্থী একটি অন্তর্বর্তী সরকারের দিকে ঝুঁকে কি ভেনেজুয়েলার দীর্ঘদিনের ভুক্তভোগী জনগণের জন্য গণতন্ত্র আসবে? সে সম্ভাবনা ক্ষীণ—এমনকি যদি রদ্রিগেস ও অন্যরা রুবিওর সঙ্গে আলোচনায় তাদের জনসমক্ষে দেওয়া দৃঢ় বক্তব্যের চেয়ে ভিন্ন সুরে কথা বলেন তবুও।
২০১৬ সালে ট্রাম্প 'চিরস্থায়ী যুদ্ধ' ও শাসন পরিবর্তনের নামে যুক্তরাষ্ট্রের রক্ত ও সম্পদের অপচয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। ওয়াশিংটনে এখন ভেনেজুয়েলায় সেনা নামানো বা গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়ায় জড়ানোর কোনো আগ্রহ নেই।
মাদুরো সরকার নাকি ভেনেজুয়েলার তেলখাতে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক দশক আগের করা বিনিয়োগ 'চুরি' করেছে—ট্রাম্পের এমন অসংলগ্ন দাবি, এবং ভেনেজুয়েলার তেল খাত যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর হাতে তুলে দেওয়ার কথা আরও বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। (ট্রাম্পের দাবিগুলো সত্য নয়: যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর সম্পদ জাতীয়করণ ও বাজেয়াপ্তকরণ মূলত ১৯৭০-এর দশকেই ঘটেছিল, মাদুরো বা তাঁর পূর্বসূরির অনেক আগেই।)
শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ কোনো গণতান্ত্রিক সমঝোতার পথ তৈরি করতে পারে। কিন্তু সে ফলাফল ট্রাম্প বা তাঁর দলের মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকারের কারণে হবে না। তা নির্ভর করবে ভেনেজুয়েলার জনগণের ওপর—যারা ২০২৪ সালে সাহসের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ বিরোধী শক্তিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিজয় এনে দিয়েছেন।
ভেনেজুয়েলা কার্যত একটি সাময়িক মার্কিন তত্ত্বাবধানে পরিণত হবে—এমন সব বক্তব্য সত্ত্বেও, পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন বা কারাকাসে নাটকীয় অভ্যন্তরীণ অভ্যুত্থান ছাড়া বাস্তবে তা কার্যকর করার মতো তেমন কোনো হাতিয়ার ট্রাম্পের হাতে নেই। ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে ভেনেজুয়েলাবাসীর গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রতি অঙ্গীকারের ওপর, এবং ট্রাম্প প্রশাসন সেগুলো রক্ষায় সহায়তা করতে রাজি কি না—তার ওপর।
এই মুহূর্তে অবশ্য ট্রাম্প গণতন্ত্রের চেয়ে দ্রুত সাফল্য, দম্ভপূর্ণ বক্তব্য এবং নিজের লেনদেনভিত্তিক দাবি পূরণে আগ্রহী কোনো সরকারের আশাতেই বেশি মনোযোগী। আর ভেনেজুয়েলার নাগরিকরা আবারও আটকে পড়েছেন—একদিকে সমাজতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্রের বিশৃঙ্খলা, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির বিপজ্জনক অস্থিরতার মাঝখানে।
লেখাটি ফরেন পলিসিতে প্রকাশিত ক্রিস্টোফার সাবাতিনির মূল নিবন্ধ থেকে পরিমার্জনা সহকারে অনূদিত। নিবন্ধের মতামত ও বিশ্লেষণ লেখকের নিজস্ব
