যেভাবে গ্রামের শেষ ফোন বুথটি বাঁচাতে লড়াই করেছেন এক ব্রিটিশ বৃদ্ধ
মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে নাম ভেসে উঠল—'ডেরেক ইন দ্য কে৬'। অর্থাৎ, কে৬ মডেলের ফোন বুথ থেকে ডেরেক ফোন করেছেন। ফোনের অপর প্রান্তে ছিলেন ডেরেক হ্যারিস। তিনি ফোন করেছিলেন সেই ঐতিহাসিক লাল ফোন বুথটি থেকে, যেটি তিনি নিজের গ্রামের জন্য লড়াই করে টিকিয়ে রেখেছেন।
ঘটনাটি যুক্তরাজ্যের। গ্রামের স্থানীয় পরিষদ বা প্যারিশ কাউন্সিলের মিটিংয়ের এজেন্ডায় হ্যারিস যখন দেখলেন যে, ব্রিটিশ টেলিকম তাদের গ্রামের এই ফোন বুথটি বন্ধ করে দেওয়ার তালিকাভুক্ত করেছে, তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন—এর বিরুদ্ধে লড়তে হবে।
নরফোকের শারিংটন গ্রামে ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাস করছেন হ্যারিস। আর ফোন বুথটি তো আরও পুরোনো। এটি বিখ্যাত 'কে৬' মডেলের, যা ১৯৩৫ সালে স্যার গাইলস গিলবার্ট স্কট ডিজাইন করেছিলেন।
গত ফেব্রুয়ারিতে এক ক্যাফেতে কফির আড্ডায় হ্যারিস বলেছিলেন, 'এটা কেবল একটি ফোন বুথ নয়, এটি আমাদের মূল্যবান স্মৃতি ও ভালোবাসার জিনিস রক্ষার লড়াই।'
যৌথ প্রচেষ্টার জয়
কয়েক সপ্তাহের জন্য ৮৯ বছর বয়সী হ্যারিস রীতিমতো তারকা বনে যান। যুক্তরাজ্যে ফোন বুথ চালু রাখার নিয়ম হলো, বছরে অন্তত ৫২টি কল সেখান থেকে করতে হবে। অথচ ২০২৪ সালে ওই বুথ থেকে ১০টিরও কম কল করা হয়েছিল।
হ্যারিস তাই শুরু করেন ফোন বুথ বাঁচানোর উদ্দেশ্যে প্রচারনা। প্রচার শুরু করতেই একদিন দেখা গেল মানুষের লম্বা লাইন। সেদিন ওই 'কে৬' বুথ থেকে ২৩০টিরও বেশি কল করা হয়! মোবাইলের যুগে ফোন বুথের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে হ্যারিস পুরো যুক্তরাজ্যজুড়ে আলোচনার জন্ম দেন।
পর্দার আড়ালে তিনি ছিলেন নাছোড়বান্দা। স্থানীয় এমপি, কাউন্সিলর এবং অবশ্যই ব্রিটিশ টেলিকম কর্তৃপক্ষকে একের পর এক ইমেইল পাঠিয়েছেন। এমনকি প্রমাণ হিসেবে তিনি দেখিয়েছিলেন যে, ফোন বুথটির কাছেই ব্রিটিশ টেলিকমর ভ্যান কাজ করছে, অর্থাৎ চাইলেই বুথটি রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব। অবশেষে মার্চ মাসে ব্রিটিশ টেলিকম তাদের সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য হয়।
হ্যারিস জোর দিয়ে বলেন, 'এটি ছিল সম্মিলিত প্রচেষ্টা। কল করার জন্য প্রচুর স্বেচ্ছাসেবী জড়ো হয়েছিল। শুধু এই গ্রামের নয়, আশপাশের গ্রামের মানুষও ছিল। স্থানীয় এমপি, জেলা কাউন্সিলর—সবাই সাড়া না দিলে এটা অসম্ভব ছিল।'
তার মতে, বিষয়টি সাধারণ মানুষের মনে দাগ কেটেছিল। কারণ, বড় বড় প্রতিষ্ঠানের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তে অনেকেই বিরক্ত হয়ে উঠছেন।
'আমি চাই না ওটা মরে যাক'
ফেব্রুয়ারিতে হ্যারিসের সঙ্গে দেখা করার সময় মনে হয়েছিল, তিনি ফোন বুথটিকে জীবন্ত সত্তা মনে করেন। যুক্তরাজ্যে অনেক লাল ফোন বুথ লাইব্রেরি বা অন্য কিছুতে রূপান্তর করা হয়েছে। কিন্তু হ্যারিস বলেন, সচল বুথ হিসেবেই এটি 'জীবিত'। লাইব্রেরি বানালে এর আত্মা মরে যাবে।
পরে জানা যায় এক হৃদয়বিদারক খবর। হ্যারিস ইমেইল করে জানান, তিনি দুরারোগ্য ক্যানসারে আক্রান্ত, যা অপারেশন করা সম্ভব নয়।
তিনি লিখেছিলেন, 'আমার জন্মের বছরেই (১৯৩৫) এই কে৬ ডিজাইন করা হয়েছিল। তাই মৃত্যুদণ্ড থেকে এটি রক্ষা পাওয়ার যোগ্য। আমি চাই না ওটা মরে যাক'
তিনি অসুস্থতার কথা তখন প্রকাশ করতে দেননি। তিনি চাননি কেউ ভাবুক যে সহানুভূতির জন্য তিনি এটি করছেন। ফোন বুথটির নিজস্ব মূল্য আছে। দুঃসময়ে এই আন্দোলন হ্যারিসকে বাঁচার নতুন লক্ষ্য দিয়েছিল।
তিনি এখন বলেন, 'এটা দারুণ অর্জন। বুড়ো হাড়ের ভেলকি এখনো বাকি।' ফোন বুথটি টিকে থাকায় গ্রামের মানুষও দারুণ খুশি।
জয়ের পর সারা বছর ধরে হ্যারিস মাঝেমধ্যেই ওই বুথ থেকে সাংবাদিককে ফোন করেন। প্রাতর্ভ্রমণের সময় বুথে থামেন, হ্যালো বলেন বা রাজনীতি নিয়ে নালিশ করেন। এতে কলের সংখ্যাও বাড়ে।
তিনি বলেন, 'একটু আগে বরফ পড়ছিল, কিন্তু আমি হেঁটেই এসেছি। পরিষ্কার কাচের ভেতর দিয়ে খোলা মাঠ আর মনোরম দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।'
শুধু ফোন বুথটি রক্ষাই হয়নি, গ্রীষ্মে ব্রিটিশ টেলিকম এটি সংস্কারও করেছে। লাগানো হয়েছে নতুন দরজা ও পিতলের কবজা।
হ্যারিস মজা করে বলেন, 'ঠিক আমার জন্মদিনের আগেই কাজটা শেষ হয়েছে।' জুলাই মাসে তিনি ৯০ বছরে পা দেন। গ্রামবাসী গার্ডেন পার্টির আয়োজন করে তাকে সংবর্ধনা দেয়।
প্যারিশ কাউন্সিলের দেওয়া কার্ডে ছিল তার প্রিয় লাল ফোন বুথের ছবি। আর উপহার হিসেবে তিনি পেয়েছেন সেই ফোন বুথের আদলে তৈরি একটি ফ্রিজ ম্যাগনেট।
