রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধবিরতির চুক্তি কি সত্যিই দোরগোড়ায়?
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জার্মানির রাজধানী বার্লিনে একাধিক ইউরোপীয় দেশের নেতা ও মার্কিন কূটনীতিকদের সঙ্গে এক বৈঠক করেছেন সম্প্রতি। যেখানে মূল আলোচনার বিষয়ই ছিল রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের ইতি টানতে শর্ত নিয়ে আলোচনা। এরপর সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার দাবি করেছেন, প্রায় চার বছর ধরে চলা এ যুদ্ধ অবসানের একটি সমঝোতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি কাছাকাছি এসেছে।
বার্লিনে টানা দুই দিনের উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় কূটনীতিকরা ভবিষ্যতে রাশিয়ার সম্ভাব্য সামরিক হুমকি থেকে ইউক্রেনকে কীভাবে সুরক্ষা দেওয়া যায়, সে বিষয়সহ একাধিক জটিল ইস্যু নিয়ে আলোচনা করেন।
বার্লিন বৈঠকের আগে জেলেনস্কি বলেছিলেন, আইনি বাধ্যবাধকতাসম্পন্ন নিরাপত্তা নিশ্চয়তা পেলে কিয়েভ ন্যাটোতে যোগদানের আকাঙ্ক্ষা থেকে সরে আসতে প্রস্তুত। ২০২২ সালে ইউক্রেনে আগ্রাসনের অন্যতম যুক্তি হিসেবে ন্যাটোর সম্প্রসারণকে তুলে ধরেছিল রাশিয়া।
তবে ইউরোপীয় নেতারা বলছেন, ভূখণ্ডগত প্রশ্নে মস্কো ও কিয়েভের মধ্যে এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
তাহলে কি সত্যিই অবশেষে যুদ্ধবিরতির কোনো চুক্তি নাগালের মধ্যে? এজন্য আগে জানতে হবে বার্লিন বৈঠকের অগ্রগতি সম্পর্কে।
বার্লিন বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছে?
বার্লিনের বৈঠকে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, তার জামাতা জ্যারেড কুশনারের পাশাপাশি ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের শীর্ষ নেতা এবং ন্যাটোর প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
আলোচনা শেষে দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে ইউরোপীয় নেতারা বলেন, ইউক্রেনকে "দৃঢ় নিরাপত্তা নিশ্চয়তা" দিতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এর মধ্যে ইউরোপীয় নেতৃত্বে একটি "বহুজাতিক ইউক্রেন বাহিনী" গঠনের কথাও উল্লেখ করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র এই বাহিনীকে সহায়তা দেবে।
ইইউ নেতারা জানান, এই বাহিনীর কাজের মধ্যে থাকবে ইউক্রেনের ভেতরে কার্যক্রম পরিচালনা, দেশটির সশস্ত্র বাহিনী পুনর্গঠনে সহায়তা, আকাশসীমা সুরক্ষা এবং নিরাপদ সমুদ্রপথ নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে বলা হয়, ইউক্রেনীয় বাহিনীর সদস্যসংখ্যা শান্তিকালীন সময়ের ৮ লাখে সীমিত থাকা উচিত।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তা এসব নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ন্যাটোর "৫ নং অনুচ্ছেদ এর মতো" বলে উল্লেখ করেন। এই অনুচ্ছেদের আওয়তায় ন্যাটো জোটের সমষ্টিগত প্রতিরক্ষা নীতি রয়েছে, যেখানে জোটের এক সদস্য রাষ্ট্রের ওপর হামলা মানেই সবার ওপর হামলা। সুতরাং এই নিরাপত্তা ব্যবস্থাও অনেকটা সেই আদলে হতে চলেছে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
বার্লিনে সাংবাদিকদের জেলেনস্কি বলেন, সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির আওতায় ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কিয়েভকে প্রস্তাবিত নিরাপত্তা নিশ্চয়তাগুলো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেতে হবে। তিনি বলেন, এসব নিশ্চয়তার মধ্যে কার্যকর যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা এ ধরনের নিশ্চয়তার কাঠামো নিয়ে এখনো সতর্ক অবস্থানে আছেন। ১৯৯১ সালে ইউক্রেনের স্বাধীনতার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সমর্থনে নিরাপত্তা আশ্বাস পেলেও—তা ২০১৪ সালে রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখল এবং ২০২২ সালের পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন ঠেকাতে পারেনি।
জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস বলেন, বার্লিন আলোচনায় ওয়াশিংটন "উল্লেখযোগ্য" নিরাপত্তা নিশ্চয়তার প্রস্তাব দিয়েছে।
জেলেনস্কির সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে মের্ৎস বলেন, "আইনি ও বাস্তবিক নিশ্চয়তার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখানে বার্লিনে যা প্রস্তাব করেছে, তা সত্যিই ব্যাপক।"
এ বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি রাশিয়া।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প কী বলেছেন?
সোমবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, "ইউরোপীয় নেতাদের কাছ থেকে আমরা বিপুল সমর্থন পাচ্ছি। তারাও যুদ্ধটি শেষ করতে চায়।"
তিনি আরও বলেন, "রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আমাদের বহুবার কথা হয়েছে, এবং আমার মনে হয় আমরা এখন (যুদ্ধ সমাপ্তির জন্য) আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কাছাকাছি পৌঁছেছি। এখন দেখা যাক আমরা কী করতে পারি।"
জানুয়ারিতে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ট্রাম্প যুদ্ধ অবসানের উদ্যোগ নিচ্ছেন এবং ইউক্রেনকে কিছু ছাড় দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন।
তবে ট্রাম্প ও পুতিনের মধ্যে আগস্টে আলাস্কায় অনুষ্ঠিত শীর্ষ বৈঠকসহ একাধিক উচ্চপর্যায়ের আলোচনা এবং খসড়া শান্তি প্রস্তাব সত্ত্বেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে ভয়াবহ এই যুদ্ধের অবসান হয়নি।
জেলেনস্কি কী বলেছেন?
সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জেলেনস্কি— স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে বৈঠকের প্রসঙ্গে লিখেছেন, "এই বৈঠকগুলো যদি আরও আগে হতো, তাহলে অগ্রগতি আরও বেশি হতো।"
তিনি লেখেন, "অবশ্যই ভূখণ্ডের প্রশ্নে রাশিয়ার সঙ্গে আমাদের অবস্থান ভিন্ন। এটি স্বীকার করে খোলাখুলিভাবে আলোচনা করতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত কোনো না কোনো ধরনের সমঝোতা খুঁজে বের করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ প্রস্তাব করবে।"
জেলেনস্কি আরও বলেন, "নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, ভূখণ্ড এবং ইউক্রেন পুনর্গঠনের ক্ষতিপূরণ হিসেবে অর্থের প্রশ্নে স্পষ্ট উত্তর খুঁজে বের করতে আমরা সবকিছু করব। এই অর্থায়নের উৎস কোথা থেকে আসবে, সেটিও বুঝতে হবে।"
এর আগে ইউক্রেন ইঙ্গিত দিয়েছিল, পশ্চিমা বিশ্বের দৃঢ় নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিনিময়ে তারা ন্যাটোতে যোগদানের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনও কিয়েভের ন্যাটো সদস্যপদের বিরোধিতা করে আসছে।
জেলেনস্কি বলেন, "আমরা নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে আলোচনা করছি। যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে সেনাবাহিনী ও সাধারণ জনগণের স্পষ্টভাবে জানা প্রয়োজন—নিরাপত্তা নিশ্চয়তা কী হবে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।"
যদিও বার্লিনের আলোচনা থেকে ইউক্রেন ঠিক কী ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা পাবে এবং কোন কোন দেশ এতে অবদান রাখবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
