চীনে গোপন প্রশিক্ষণ নিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে লড়ছেন রুশ সেনারা
গত বছরের শেষের দিকে প্রায় ২০০ রুশ সেনাকে গোপনে প্রশিক্ষণ দিয়েছে চীনের সশস্ত্র বাহিনী। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের অনেকেই ইউক্রেনে ফিরে গিয়ে যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। তিনটি ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থা এবং সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের হাতে আসা নথিপত্র থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সর্বাত্মক আগ্রাসন শুরুর পর চীন ও রাশিয়া বেশ কয়েকটি যৌথ সামরিক মহড়া করেছে। তবে বেইজিং বারবার দাবি করে আসছে যে এই সংঘাতে তারা নিরপেক্ষ অবস্থানে রয়েছে এবং নিজেদের মধ্যস্থতাকারী হিসেবেই তুলে ধরছে।
কিন্তু বাস্তবে চিত্র ভিন্ন। মূলত ড্রোন ব্যবহারের ওপর আয়োজিত এই গোপন প্রশিক্ষণ সেশনের কথা একটি রুশ-চীনা চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে। ২০২৫ সালের ২ জুলাই বেইজিংয়ে দুই দেশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা এই চুক্তিতে সই করেছিলেন। চুক্তিটি দুই ভাষাতেই লেখা হয়েছিল।
ওই চুক্তিতে বলা হয়েছিল, বেইজিং এবং পূর্বাঞ্চলীয় শহর নানজিংসহ বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় প্রায় ২০০ রুশ সেনাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, চুক্তির পর প্রায় ওই পরিমাণ রুশ সেনাই চীনে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। চুক্তিতে আরও বলা হয়েছিল যে চীনা সেনারাও রাশিয়ার সামরিক স্থাপনাগুলোতে প্রশিক্ষণ নেবেন।
একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, রুশ সামরিক সদস্যদের সরাসরি অভিযান এবং কৌশলগত পর্যায়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর তারা ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। এর অর্থ হলো, আগে যা ধারণা করা হয়েছিল, এই যুদ্ধে চীন তার চেয়েও অনেক বেশি মাত্রায় জড়িত।
তবে এই বিষয়ে জানতে চাইলে রাশিয়া ও চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
অবশ্য চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রয়টার্সকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, 'ইউক্রেন সংকটে চীন সব সময় একটি বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে এবং শান্তি আলোচনা এগিয়ে নিতে কাজ করেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও এর সাক্ষী। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উচিত ইচ্ছাকৃতভাবে সংঘাত উসকে না দেওয়া বা অন্যের ঘাড়ে দোষ না চাপানো।'
ইউরোপীয় দেশগুলো রাশিয়াকে একটি বড় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখে। তাই তারা রাশিয়া এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার চীনের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতার দিকে সতর্ক নজর রাখছে।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের কয়েক দিন আগে দুই দেশ 'সীমাহীন' কৌশলগত অংশীদারত্বের ঘোষণা দিয়েছিল। তারা নিজেদের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে সামরিক মহড়া করার প্রতিশ্রুতিও দেয়। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পশ্চিমা বিশ্ব যখন রাশিয়াকে একঘরে করার চেষ্টা করছিল, তখন চীন তাদের তেল, গ্যাস ও কয়লা কিনে মস্কোকে টিকে থাকার লাইফলাইন জুগিয়েছিল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাই-প্রোফাইল বেইজিং সফরের এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে আতিথ্য দিয়েছেন চীনের নেতা শি জিনপিং।
ড্রোন যুদ্ধের কৌশল
ইউক্রেন যুদ্ধে ড্রোন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। উভয় পক্ষই শত শত মাইল দূরে থাকা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে দূরপাল্লার ড্রোন ব্যবহার করছে। আর যুদ্ধক্ষেত্রে ছোট ছোট ড্রোন আকাশ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ফার্স্ট পারসন ভিউ (এফপিভি) প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাইলটরা দূর থেকে এসব বিস্ফোরকভর্তি ড্রোন নিয়ন্ত্রণ করছেন, যা সাঁজোয়া যান বা পদাতিক বাহিনীর চলাচলের ক্ষেত্রে বিপদ ডেকে আনছে।
গত সেপ্টেম্বরে রয়টার্স এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, রাশিয়ার একটি আক্রমণকারী ড্রোন প্রস্তুতকারক কোম্পানিকে কারিগরি সহায়তা দিয়েছেন চীনের বেসরকারি কোম্পানির বিশেষজ্ঞরা। সে সময় চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল যে তারা এই সহযোগিতার বিষয়ে কিছু জানে না। ওই প্রতিবেদনে নাম আসা দুটি কোম্পানির ওপর গত মাসে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ইইউ।
প্রশিক্ষণ চুক্তি অনুযায়ী, রুশ সেনাদের ড্রোন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, আর্মি এভিয়েশন এবং সাঁজোয়া পদাতিক বাহিনীর বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা ছিল। চুক্তিতে দুই দেশেই এই সফরের বিষয়ে কোনো গণমাধ্যম কাভারেজ বা সংবাদ প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং তৃতীয় কোনো পক্ষকে এ বিষয়ে জানানো যাবে না বলেও উল্লেখ ছিল।
দুটি গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে, অন্তত ২০২৪ সাল থেকে চীনা সেনারা প্রশিক্ষণের জন্য রাশিয়ায় যাচ্ছেন। তবে চীনে গিয়ে রুশ বাহিনীর প্রশিক্ষণ নেওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম। তারা জানায়, ইউক্রেনে রাশিয়ার ব্যাপক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা রয়েছে ঠিকই, কিন্তু চীনের বিশাল ড্রোন শিল্পের কারিগরি জ্ঞান এবং ফ্লাইট সিমুলেটরের মতো উন্নত প্রশিক্ষণ পদ্ধতি রয়েছে, যা রাশিয়ার দরকার।
চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) কয়েক দশক ধরে কোনো বড় যুদ্ধে অংশ নেয়নি। তবে গত ২০ বছরে তারা দ্রুত নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে এখন মার্কিন সামরিক বাহিনীরও প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে।
গোয়েন্দা সংস্থা দুটি জানায়, চীনে যাওয়া রুশ বাহিনীর সদস্যদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিলেন সামরিক প্রশিক্ষক। এর মানে হলো, তারা চীনে যা শিখেছেন, তা রাশিয়ায় ফিরে গিয়ে অন্য সেনাদেরও শেখাতে পারবেন।
একটি গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে, চীনে প্রশিক্ষণ নেওয়া কয়েকজন রুশ সেনার পরিচয় তারা নিশ্চিত করেছে। ওই সেনারা পরে দখলকৃত ক্রিমিয়া ও জাপোরিঝিয়া অঞ্চলে সরাসরি ড্রোন হামলায় অংশ নিয়েছেন।
রাশিয়ার একটি সামরিক নথিতে ওই ব্যক্তিদের নাম ছিল, যারা চীনে প্রশিক্ষণের জন্য গিয়েছিলেন। তবে ইউক্রেন যুদ্ধে তাদের পরবর্তী অংশগ্রহণের বিষয়টি রয়টার্স স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
যেসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ
রয়টার্সের হাতে আসা রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ সামরিক প্রতিবেদনে রুশ সেনাদের চারটি প্রশিক্ষণ সেশনের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের একটি প্রতিবেদনে শিজিয়াঝুয়াংয়ে পিএলএ-এর গ্রাউন্ড ফোর্সেস আর্মি ইনফ্যান্ট্রি অ্যাকাডেমি শাখায় প্রায় ৫০ জন রুশ সেনার কম্বাইন্ড আর্মস ওয়ারফেয়ার (সমন্বিত যুদ্ধকৌশল) প্রশিক্ষণের কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এই কোর্সে সেনাদের লক্ষ্যবস্তু শনাক্তে ড্রোন ব্যবহার করে ৮২ এমএম মর্টার ছোড়ার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয় একটি প্রতিবেদনে একটি সামরিক স্থাপনায় আকাশ প্রতিরক্ষার প্রশিক্ষণের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার রাইফেল, জাল ছোড়ার যন্ত্র এবং ধেয়ে আসা ড্রোন প্রতিহত করতে কাউন্টার-ড্রোনের ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত ছিল। দুজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই স্থাপনাটি ঝেংঝু শহরে অবস্থিত।
এই সব সরঞ্জামই ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার রাইফেল ধেয়ে আসা ড্রোনের সিগন্যাল ব্যাহত বা বিচ্ছিন্ন করতে ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে ড্রোন কাছাকাছি এলে তার ওপর জাল ছুড়ে তা আটকে ফেলা হয়।
ইউক্রেন যুদ্ধে উভয় পক্ষই ফাইবার-অপ্টিক এরিয়াল ড্রোন ব্যবহার করছে। এসব ড্রোন খুব সূক্ষ্ম তার দিয়ে পাইলটের সঙ্গে যুক্ত থাকে, যা ইলেকট্রনিকভাবে জ্যাম বা বিকল করা যায় না। ফাইবার-অপ্টিক ড্রোন সাধারণত ১০ থেকে ২০ কিলোমিটার দূরত্বে কাজ করে, তবে কিছু কিছু ড্রোন ৪০ কিলোমিটার পর্যন্তও যেতে পারে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এক রুশ মেজরের লেখা তৃতীয় একটি প্রতিবেদনে ইবিনের পিএলএ ট্রেনিং সেন্টার ফর মিলিটারি এভিয়েশনের ফার্স্ট ব্রিগেডে রুশ সেনাদের ড্রোন প্রশিক্ষণের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এই কোর্সের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ফ্লাইট সিমুলেটরের ব্যবহার। এতে কয়েক ধরনের এফপিভি ড্রোন এবং আরও দুটি ভিন্ন ধরনের ড্রোন ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
চতুর্থ প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের নভেম্বরে আয়োজিত আরেকটি প্রশিক্ষণের উল্লেখ ছিল। এতে বিস্ফোরক প্রযুক্তি, মাইন তৈরি ও অপসারণের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এই প্রতিবেদনে ইউনিফর্ম পরা রুশ সেনাদের ছবি ছিল, যাদের সামরিক ইউনিফর্ম পরা চীনা প্রশিক্ষকেরা শেখাচ্ছিলেন।
