কোনো সমাধান ছাড়াই শেষ হলো রাশিয়া-ইউক্রেন শান্তি আলোচনা
ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধের অবসান খুঁজতে জেনেভায় রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিপক্ষীয় আলোচনা কোনো দৃশ্যমান সমাধান ছাড়াই শেষ হয়েছে। মঙ্গলবার গভীর রাত পর্যন্ত বৈঠক চললেও বুধবার তা মাত্র দুই ঘণ্টা স্থায়ী ছিল।
মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ আশাবাদ ব্যক্ত করলেও রাশিয়ার প্রধান আলোচক ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি আলোচনা 'জটিল' ছিল বলে ইঙ্গিত দেন।
মূল আলোচনা শেষে ক্রেমলিনের আলোচক ভ্লাদিমির মেদিনস্কি ভেন্যুতে ফিরে ইউক্রেনীয় পক্ষের সঙ্গে প্রায় দেড় ঘণ্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। এ বৈঠকের বিস্তারিত জানা যায়নি।
ইউক্রেনীয় এক কূটনৈতিক সূত্র জানায়, ফ্রন্ট লাইনের অবস্থান ও যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের মতো 'সামরিক কিছু বিষয়ে' কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট বলেন, উভয় পক্ষের মধ্যে 'অর্থবহ অগ্রগতি হয়েছে'। পাশাপাশি 'শান্তি চুক্তির লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়ার' বিষয়ে সমঝোতার কথাও জানান তিনি।
তবে ভূখণ্ড বা অঞ্চলসংক্রান্ত প্রশ্নে কোনো সমঝোতা হয়নি। এ ক্ষেত্রে মস্কো ও কিয়েভের অবস্থান এখনো অনেক বিপরীত।
পূর্ব ডনবাস অঞ্চল (দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক নিয়ে গঠিত) নিয়ে রাশিয়া পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের দাবিতে অনড়, যা ইউক্রেনের কাছে অগ্রহণযোগ্য।
আলোচনা চ্যালেঞ্জিং ছিল স্বীকার করে মেদিনস্কি বলেন, আলোচনা 'কাজের মতোই' হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, 'শিগগিরই' আরেকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
জেলেনস্কিও দুই পক্ষের অবস্থানের পার্থক্যের কথা উল্লেখ করে আলোচনাকে 'সহজ নয়' বলে বর্ণনা করেন।
ইউক্রেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রুস্তেম উমেরভ বলেন, আলোচনা 'গঠনমূলক ও নিবিড়' ছিল। অগ্রগতি হলেও 'এই পর্যায়ে' বিস্তারিত প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
উমেরভের ভাষ্য, 'এটি একটি জটিল কাজ, যার জন্য সব পক্ষের ঐকমত্য এবং পর্যাপ্ত সময়ের প্রয়োজন।'
আলোচনা শেষ হওয়ার আগে জেলেনস্কি অভিযোগ করেন, রাশিয়া 'আলোচনা দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করছে, যা ইতোমধ্যেই চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারত'।
ফেব্রুয়ারির শুরুতে আবুধাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষ শেষবার বৈঠকে বসে। সেই বৈঠকের ফলেই কয়েক মাস পর প্রথম বন্দী বিনিময় সম্ভব হয়। বুধবার জেলেনস্কি ইঙ্গিত দেন, আরেকটি বন্দী বিনিময় আসন্ন হতে পারে।
যুদ্ধ অবসানে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার নেতৃত্ব দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দুই পক্ষের অচলাবস্থা নিয়ে তিনি অধৈর্য হয়ে উঠছেন বলেও ইঙ্গিত মিলছে।
সোমবার ট্রাম্প বলেছিলেন, ইউক্রেনের 'দ্রুত আলোচনার টেবিলে আসা উচিত'। জেলেনস্কি এ মনোভাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, তার দেশকেই কেন ছাড় দিতে বলা হবে, তা 'ন্যায্য নয়'।
রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের চার বছর পরও মস্কোর দাবি ও কিয়েভের 'ন্যায়সঙ্গত শান্তির' ধারণার মধ্যে বিশাল দূরত্ব রয়ে গেছে।
কিয়েভ দীর্ঘদিন ধরেই পূর্ব ডনবাসের ওপর রাশিয়ার দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছে। ইউক্রেনের মতে, এর অর্থ হবে সার্বভৌম ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়া। ওই অঞ্চলে দোনেৎস্কের সুরক্ষিত শহর ও দীর্ঘ প্রতিরক্ষা লাইন রয়েছে।
অনেক ইউক্রেনীয়ের আশঙ্কা, ভূখণ্ড ছেড়ে দিলে ভবিষ্যতে রাশিয়ার আরেকটি আগ্রাসনের ঝুঁকি বাড়বে। জেলেনস্কি ১৯৩৮ সালের মিউনিখ চুক্তির সঙ্গে এর তুলনা টেনেছেন।
মঙ্গলবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে জেলেনস্কি বলেন, ডনবাস হস্তান্তরের যেকোনো পরিকল্পনা গণভোটে দিলে ইউক্রেনীয়রা তা প্রত্যাখ্যান করবে।
ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট পশ্চিমা মিত্রদের কাছ থেকে জোরালো নিরাপত্তা নিশ্চয়তা আদায়ের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, যাতে রাশিয়া পুনরায় আক্রমণ না করে।
আলোচনার আরেকটি জটিল বিষয় জাপোরিঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ইউরোপের বৃহত্তম এই কেন্দ্রটি ২০২২ সালের মার্চ থেকে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে। ইউক্রেন চায়, মস্কো এটি ফেরত দিক।
জেলেনস্কি এর আগে বলেছিলেন, কিয়েভ আমেরিকানদের সঙ্গে যৌথভাবে কেন্দ্রটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তবে এ প্রস্তাবে মস্কোর সম্মতি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালির কর্মকর্তারা জেনেভায় উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের ফাঁকে তারা ইউক্রেনীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেন।
ইউরোপীয় প্রতিনিধিরা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত হতে হিমশিম খাচ্ছেন। জেলেনস্কির ভাষ্য, যেকোনো চূড়ান্ত চুক্তির জন্য ইউরোপীয় অংশগ্রহণ 'অপরিহার্য'।
বুধবার 'পিয়ার্স মরগান আনসেন্সরড'-এ জেলেনস্কি বলেন, সুইজারল্যান্ডে আরও আলোচনা হবে। তার ভাষায়, সামরিক দিক থেকে অগ্রগতি হলেও 'রাজনৈতিক দিক থেকে এটি আরও কঠিন'।
সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক তিনি 'বুঝতে পারেন না'। জেলেনস্কির ভাষ্য, 'আমার জন্য এটি খুবই বেদনাদায়ক যে পুতিনের প্রতি তার মনোভাব মাঝে মাঝে... পুতিন যা পাওয়ার যোগ্য, তার চেয়েও বেশি ভালো।'
আগামী মঙ্গলবার ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের চতুর্থ বার্ষিকী পূর্ণ হবে।
যুদ্ধের ফলে হাজার হাজার সামরিক ও বেসামরিক মানুষ হতাহত হয়েছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছে লাখ লাখ ইউক্রেনীয়। প্রতিদিনের বিমান হামলায় অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা বাড়ছে।
মঙ্গলবার রাতে রাশিয়ার আর্টিলারি ও বিমান হামলায় চারজন নিহত ও ৩০ জন আহত হন। বিদ্যুৎ অবকাঠামোও হামলার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে। এতে লাখ লাখ মানুষ আলো ও উষ্ণতা ছাড়াই তীব্র শীতের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
