‘জ্বালানির জন্য কাঠ কাটারও কেউ নেই’: ইউক্রেন যুদ্ধে প্রায় পুরুষশূন্য রাশিয়ার যে গ্রাম
রাশিয়ার সুদূর পূর্বে অবস্থিত জেলেপল্লী সেদাঙ্কায় জীবনযাপন অত্যন্ত কঠিন। বছরের বেশিরভাগ সময় তীব্র শীতের সঙ্গে লড়াই করে এখানে টিকে থাকতে হয় বাসিন্দাদের।
শীতের মাসগুলোতে তাপমাত্রা নিয়মিত মাইনাস ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে গেলেও গ্রামটির অধিকাংশ বাড়িতে পানির সরবরাহ ব্যবস্থার পাশাপাশি ঘরের ভেতরে টয়লেট কিংবা 'সেন্ট্রাল হিটিং' (ঘর গরম রাখার মতো মৌলিক সুবিধা) ব্যবস্থা নেই। ফলে প্রতিদিনের জীবন হয়ে ওঠে আরও দুর্বিষহ।
বন-তুন্দ্রা ও জলাভূমিতে ঘেরা এই গ্রাম থেকে জেলা সদরে পৌঁছানোও সহজ নয়। মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত নদীপথে নৌকা বা ট্র্যাকযুক্ত যানবাহন ছাড়া যাতায়াত কার্যত অসম্ভব। আর শীতকালে ভরসা কেবল স্নোমোবাইল বা হেলিকপ্টার।
স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ খুবই সীমিত। গ্রামবাসীদের বেশিরভাগই মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন এবং নিজেদের খাবার নিজেরাই ফলান।
তবে সম্প্রতি গ্রামটিতে আরেকটি বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সেদাঙ্কার ১৮ থেকে ৫৫ বছর বয়সী প্রায় সব পুরুষই গ্রাম ছেড়েছেন। তারা ইউক্রেনে রাশিয়ার চলমান যুদ্ধে যোগ দিয়েছেন।
'জ্বালানির জন্য কাঠ কাটারও কেউ নেই'
নিরাপত্তার স্বার্থে নাম পরিবর্তন করা গ্রামবাসী নাতালিয়া বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, 'এটা হৃদয়বিদারক—আমাদের অনেক মানুষ মারা গেছে।'
তিনি আরও বলেন, 'আমার বোনের স্বামী আর চাচাতো ভাইয়েরা ফ্রন্ট লাইনে আছে। প্রায় প্রতিটি পরিবার থেকেই কেউ না কেউ যুদ্ধ করছে।'
কামচাটকা উপদ্বীপর উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে ওখোতস্ক সাগরর কাছে অবস্থিত সেদাঙ্কা থেকে ইউক্রেনের রণক্ষেত্রের দূরত্ব থেকে ৭ হাজার কিলোমিটারেও বেশি। মজার বিষয় হলো, সাগরের ওপারে আমেরিকান শহর অ্যাঙ্করেজর দূরত্ব এর প্রায় অর্ধেক।
মোট ২৫৮ জন জনসংখ্যার এই গ্রাম থেকে ৩৯ জন পুরুষ যুদ্ধে যোগ দিতে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তিতে সই করেছেন। তাদের মধ্যে ১২ জন নিহত হয়েছেন এবং আরও সাতজন নিখোঁজ রয়েছেন।
২০২৪ সালের মার্চে আঞ্চলিক গভর্নর গ্রামটি পরিদর্শনে এলে একদল নারী ক্রেমলিনের ভাষা ব্যবহার করে তাকে বলেছিলেন, 'আমাদের সব পুরুষই 'বিশেষ সামরিক অভিযানে' চলে গেছে।'
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত সেই কথোপকথনে তারা আরও বলেন, 'শীতকালে আমাদের চুলা জ্বালানোর জন্য কাঠ কাটার মতোও কেউ নেই।'
বিবিসি, রুশ স্বাধীন সংবাদমাধ্যম মেডিজোনা এবং স্বেচ্ছাসেবী গবেষকদের যাচাই করা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এখন পর্যন্ত ৪০ হাজার ২০১ জন রুশ সেনা নিহত হয়েছেন।
বিবিসির বিশ্লেষণে অনুমান করা হচ্ছে, চলতি বছর মোট মৃতের সংখ্যা ৮০ হাজারে পৌঁছাতে পারে। ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসন শুরুর পর থেকে ২০২৫ সাল রাশিয়ার জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর হতে পারে।
মৃতের সংখ্যা নির্ধারণে শোকবার্তাগুলো আমলে নেওয়া হয়েছে, যেখানে মৃত্যু বা দাফনের বছর হিসেবে ২০২৫ সালের উল্লেখ রয়েছে। তবে এসব তথ্যের সবগুলো এখনো পুরোপুরি যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হয়নি।
২০২৪ সালে নিশ্চিত মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৯ হাজার ৩৬২—যা ২০২২ ও ২০২৩ সালের সম্মিলিত মোট সংখ্যার প্রায় সমান। ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকেই মৃত্যুর হার দ্রুত বাড়তে শুরু করে।
মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করতে সরকারি প্রতিবেদন, প্রবেট ডেটা রেজিস্ট্রি (কারও মৃত্যুর পর মামলার সরকারি তালিকা), সংবাদপত্রের প্রতিবেদন, আত্মীয় বা ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, পাশাপাশি নতুন স্মৃতিসৌধ ও কবরের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে বিবিসি এখন পর্যন্ত যুদ্ধে নিহত ১ লাখ ৮৬ হাজার ১০২ জন রুশ সেনার নাম শনাক্ত করেছে।
তবে সাধারণভাবে ধারণা করা হয়, প্রকৃত মৃতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। কারণ, যুদ্ধক্ষেত্রের বহু মৃত্যুই আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হয় না।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশ্লেষণ মোট মৃত্যুর ৪৫ থেকে ৬৫ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। সে হিসাবে সম্ভাব্য রুশ মৃতের সংখ্যা ২ লাখ ৮৬ হাজার থেকে ৪ লাখ ১৩ হাজার ৫০০-এর মধ্যে হতে পারে।
অন্যদিকে ইউক্রেনও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
গত মাসে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ফরাসি সম্প্রচারমাধ্যম ফ্রান্স-২ কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, 'সরকারিভাবে' ৫৫ হাজার ইউক্রেনীয় যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, এর বাইরে 'বিপুল সংখ্যক মানুষ' সরকারিভাবে নিখোঁজ হিসেবে বিবেচিত হলেও এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা তিনি উল্লেখ করেননি।
বিবিসির ক্রস-রেফারেন্স করা তথ্য অনুযায়ী, ইউএ লসেস ওয়েবসাইটের মতো বিভিন্ন উৎসের ভিত্তিতে অনুমান করা যায়, ইউক্রেনীয়দের নিহতের সংখ্যা ২ লাখ পর্যন্ত হতে পারে।
যুদ্ধে নিহত অধিকাংশ রুশ সেনার নামের শেষে স্লাভিক পদবি রয়েছে।
তবে সাইবেরিয়া ও সুদূর প্রাচ্যের অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া সেদাঙ্কার মতো এলাকাগুলোর ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষতির হার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।
সেদাঙ্কায় মূলত কোরিয়াক ও ইতেলমেন সম্প্রদায়ের বসবাস। যুদ্ধকালীন বিধান অনুযায়ী, এসব ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীকে বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ বা মবিলাইজেশন থেকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
যুদ্ধবিরোধী কর্মী মারিয়া ভিউশকভা বলছেন, যুদ্ধে যোগদানে উৎসাহিত করতে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোকে 'জন্মযোদ্ধা' ও দক্ষ শুটার হিসেবে অতিরঞ্জিত করে তুলে ধরা হয়।
ভিউশকভা বলেন, 'অনেক আদিবাসী সম্প্রদায় তাদের পরিচয়ের অংশ হিসেবে এই ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করে। ক্রেমলিন যুদ্ধের জন্য লোক সংগ্রহে এই গর্বকেই কাজে লাগায়।'
সেদাঙ্কা থেকে যুদ্ধে যোগ দেওয়া ভ্লাদিমির আকিভ (৪৫) ছিলেন একজন শিকারি ও জেলে। তিনি ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে সেনাবাহিনীর সঙ্গে চুক্তিতে সই করেছিলেন। চার মাস পর তিনি যুদ্ধে নিহত হন।
২০২৪ সালের নভেম্বরে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় শোকাহতরা কেবল স্নোমোবাইলে করেই কবরস্থানে পৌঁছাতে পেরেছিলেন। আকিভের কফিনটি আনা হয়েছিল প্রশস্ত কাঠের স্লেজে করে।
অন্যান্য এলাকাতেও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী থেকে নিশ্চিত মৃত্যুর তালিকায় রয়েছেন ২০১ জন নেনেটস, ৯৬ জন চুকচি, ৭৭ জন খান্তি, ৩০ জন কোরিয়াক ও সাতজন ইনুইট।
১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী পুরুষদের অনুপাতে হিসাব করলে দেখা যায়, আনুমানিক ২ শতাংশ চুকচি, ১.৪ শতাংশ রুশ ইনুইট, ১.৩২ শতাংশ কোরিয়াক ও ০.৮ শতাংশ খান্তি মারা গেছেন।
বিবিসির বিশ্লেষণ দেখায়, নিহতদের ৬৭ শতাংশই গ্রাম ও ছোট শহরের বাসিন্দা—যেখানে জনসংখ্যা এক লাখের নিচে। অথচ রাশিয়ার মোট জনসংখ্যার ৪৮ শতাংশ এসব এলাকায় বসবাস করে।
বড় শহরগুলোতে ক্ষতির হার সবচেয়ে কম। মাথাপিছু মৃত্যুর হিসাবে মস্কোতে এই হার সর্বনিম্ন—প্রতি ১০ হাজার পুরুষের মধ্যে পাঁচজন, বা ০.০৫ শতাংশ।
পূর্ব সাইবেরিয়ার বুরিয়াতিয়া ও দক্ষিণ সাইবেরিয়ার তুভার মতো দরিদ্র অঞ্চলগুলোতে মৃত্যুর হার রাজধানীর তুলনায় যথাক্রমে ২৭ থেকে ৩৩ গুণ বেশি।
জনসংখ্যাবিদ আলেক্সি রাকশা বলেন, শহর ও গ্রামের মধ্যে এই ব্যবধানের মূল কারণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বেতন ও শিক্ষার পার্থক্য।
তিনি বলেন, এর ফলে দরিদ্র অঞ্চল ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের সেনারা সেনাবাহিনীতে এবং মৃতের তালিকায় সামগ্রিক জনসংখ্যার তুলনায় বেশি অংশ জুড়ে আছেন।
আরেক রুশ জনসংখ্যাবিদ বিবিসিকে বলেন, যেসব অঞ্চলে ক্ষতির হার বেশি, সেখানে পুরুষদের গড় আয়ু যুদ্ধে যোগ দেওয়ার আগেই তুলনামূলকভাবে কম ছিল।
তিনি বলেন, 'অনেকের ক্ষেত্রে এর পেছনের কারণ শুধু দারিদ্র্য নয়, বরং ভবিষ্যতের কোনো সম্ভাবনা না থাকাও—তাদের মনে হয় হারানোর কিছুই নেই।'
২০২৪ সালের শরতে সেদাঙ্কায় 'বিশেষ সামরিক অভিযানে অংশগ্রহণকারীদের' স্মরণে একটি স্মৃতিসৌধ উন্মোচন করা হয়।
গত বছর আঞ্চলিক সরকার গ্রামের পুরুষদের যুদ্ধে অংশগ্রহণের স্বীকৃতিস্বরূপ সেদাঙ্কাকে 'সামরিক বীরত্বের গ্রাম' হিসেবে সম্মানসূচক উপাধি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেনাদের পরিবারগুলোর জন্য সহায়তা কর্মসূচির আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল।
তবে গ্রামটি এখনো সেই সম্মানসূচক উপাধি পায়নি এবং প্রতিশ্রুত সহায়তার খুব সামান্যই বাস্তবায়িত হয়েছে।
গণমাধ্যমের ব্যাপক নজরে আসার পর চারজন চুক্তিভিত্তিক সেনার জরাজীর্ণ বাড়ির ছাদ মেরামত করা হয়েছে।
সোভিয়েত আমলে নির্মিত প্রতি পাঁচটি বাড়ির মধ্যে একটিকে রাষ্ট্র ঝুঁকিপূর্ণ বলে ঘোষণা করেছে।
গ্রামের একমাত্র স্কুলটিকেও কর্মকর্তারা জরুরি অবস্থায় থাকা বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন; এর কিছু দেয়াল ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
রাশিয়ার যুদ্ধে গ্রামের কর্মক্ষম পুরুষদের হারিয়ে এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
