ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: ইউক্রেন ও পশ্চিমকে সতর্কবার্তা পাঠালেন পুতিন
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ওরেশনিক হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের মূল লক্ষ্য ছিল ইউক্রেনকে ভয় দেখানো এবং যুদ্ধের অবসান নিয়ে আলোচনার এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রকে রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতার বার্তা দেওয়া—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
পুতিন বারবার ওরেশনিকের গতি ও ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা নিয়ে দম্ভ করে বক্তব্য দিয়েছেন। রাশিয়া প্রথমবার ২০২৪ সালের নভেম্বরে ইউক্রেনে এই ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এরপর থেকে অস্ত্রটি সংরক্ষিত অবস্থায় ছিল।
পশ্চিম ইউক্রেনে এই ওরেশনিক হামলা এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন গত এক সপ্তাহে রাশিয়া একাধিক ধাক্কা খেয়েছে। গত শনিবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পুতিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করতে মার্কিন বিশেষ বাহিনী পাঠান। এর কয়েক দিন পর, বুধবার উত্তর আটলান্টিকে মার্কিন বাহিনী রাশিয়ার পতাকাবাহী একটি তেলবাহী জাহাজ জব্দ করে।
এর আগে, গত মঙ্গলবার ব্রিটেন ও ফ্রান্স যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে ইউক্রেনে সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা ঘোষণা করে। জবাবে মস্কো জানায়, বিদেশি সেনাদের তারা বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করবে।
অস্ট্রিয়ার ইউনিভার্সিটি অব ইনসব্রুকের রাশিয়া বিশেষজ্ঞ গেরহার্ড ম্যাঙ্গট বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেন ও ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা কূটনৈতিক আলোচনায় মস্কো একপাশে পড়ে যাওয়ায় হতাশ। পাশাপাশি কিয়েভের ইউরোপীয় মিত্রদের সম্ভাব্য সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা নিয়ে তারা 'বিশেষভাবে ক্ষুব্ধ'। তার মতে, ওরেশনিকের ব্যবহারকে এই প্রেক্ষাপট থেকেই দেখা উচিত।
ম্যাঙ্গট টেলিফোনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, 'এটি রুশ সেনাবাহিনীর সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয়দের জন্য একটি সংকেত।'
তিনি বলেন, মস্কো এই বার্তা দিতে চায় যে 'রাশিয়ার সামরিক অস্ত্রাগারের বিষয়টি মাথায় রেখে তাদের গুরুত্ব সহকারে নিতে হবে এবং আলোচনার ক্ষেত্রে ইউরোপীয় দেশগুলো ও ট্রাম্পের উচিত রুশ অবস্থানের প্রতি ন্যূনতম সম্মান দেখানো।'
'ধ্বংস অত্যাবশ্যকীয় লক্ষ্য নয়'
ওরেশনিক পারমাণবিক ও প্রচলিত—উভয় ধরনের ওয়ারহেড বহনে সক্ষম। তবে সাম্প্রতিক হামলায় কোনো পারমাণবিক উপাদান ব্যবহারের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
ইউক্রেনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, ক্ষেপণাস্ত্রটি পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর লভিভের একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে আঘাত হানে। তার ধারণা, এতে নিষ্ক্রিয় বা 'ডামি' ওয়ারহেড ছিল—যেমনটি ২০২৪ সালে করা হয়েছিল, যখন রাশিয়া যুদ্ধক্ষেত্রে প্রথমবার এই অস্ত্রের পরীক্ষা চালায়।
রুশ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস প্রজেক্টের পরিচালক পাভেল পোডভিগ রয়টার্সকে বলেন, 'মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে রাশিয়া ওরেশনিককে মূলত সংকেত দেওয়ার কাজে ব্যবহার করছে, তাই ধ্বংস করাই এর প্রধান লক্ষ্য নয়।'
তিনি আরও বলেন, 'এটি সম্ভবত উত্তেজনা বাড়ানোর সংকল্পের একটি সাধারণ সংকেত। আমার ধারণা, পশ্চিমারা বিষয়টিকে এভাবেই দেখবে।'
ন্যাটো সদস্য পোল্যান্ডের সীমান্ত থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার (৪০ মাইল) দূরে এই হামলার ঘটনায় পশ্চিমারা দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায়। ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির নেতারা একে 'উত্তেজনা বৃদ্ধিকারী ও অগ্রহণযোগ্য' বলে অভিহিত করেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাস বলেন, এটি 'ইউক্রেনের বিরুদ্ধে স্পষ্ট উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি একটি সতর্কবার্তা'।
ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের কারণ সম্পর্কে রাশিয়ার বিবৃতি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ
গত মাসের শেষ দিকে নভগোরোড অঞ্চলে পুতিনের একটি বাসভবন লক্ষ্য করে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার জবাবে ওরেশনিক উৎক্ষেপণ করা হয়েছে—রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এমন আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন রাশিয়া বিশেষজ্ঞ ম্যাঙ্গট। ইউক্রেন এ ধরনের কোনো হামলার কথা অস্বীকার করেছে এবং শান্তি আলোচনা ব্যাহত করতে মস্কোর বিরুদ্ধে মিথ্যাচারের অভিযোগ তুলেছে।
একাধিক উচ্চপর্যায়ের রুশ যুদ্ধ ব্লগারও এই হামলাকে প্রতিশোধমূলক হিসেবে তুলে ধরার সমালোচনা করেছেন। ইউরি বারানচিক নামে একজন ব্লগার লিখেছেন, মস্কো যদি কিয়েভে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির বাংকারে ক্ষেপণাস্ত্রটি নিক্ষেপ করত, তবে তা 'আরও বিশ্বাসযোগ্য দেখাত'।
অস্ট্রেলীয় সামরিক বিশ্লেষক মিক রায়ান এই অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনাকে রাশিয়ার সাম্প্রতিক ব্যর্থতার সঙ্গে যুক্ত করেছেন, বিশেষ করে ভেনেজুয়েলা ইস্যুকে সামনে এনে।
তিনি বলেন, এর মূল উদ্দেশ্য ছিল 'রাশিয়া যে একটি পারমাণবিক শক্তিধর বিশ্বশক্তি—তা প্রদর্শন করা'। তার ভাষায়, 'এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র—ইউক্রেন ও পশ্চিমের বিরুদ্ধে পুতিনের মানসিক যুদ্ধের একটি হাতিয়ার। এটি ব্যাপক বস্তুগত ধ্বংসের অস্ত্র নয়।'
রাশিয়ার কট্টরপন্থী নেতা দিমিত্রি মেদভেদেভ, যিনি বর্তমানে পুতিনের নিরাপত্তা পরিষদের ডেপুটি চেয়ারম্যান, একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে মাদুরোকে আটক, যুক্তরাষ্ট্রের তেলবাহী জাহাজ জব্দ এবং রাশিয়ার ওপর আরও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন। তার মতে, এসব ঘটনায় বছরের শুরুটা বেশ 'ঝড়ো' হয়ে উঠেছে।
ওয়াশিংটনের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এখন একটি পাগলাগারদে পরিণত হয়েছে। ওরেশনিক হামলাকে তিনি তুলনা করেন 'হ্যালোপেরিডল ইনজেকশন'-এর সঙ্গে—যা একটি মানসিক রোগের ওষুধ।
প্রখ্যাত রুশ যুদ্ধ ব্লগার ও সাবেক সেনাসদস্য 'ফাইটারবম্বার' বলেন, তার মতে ওরেশনিকের ব্যবহার ছিল শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে বার্তা দেওয়ার কৌশল, এবং মস্কো এটি ঘনঘন ব্যবহার করবে না।
তিনি জানান, কিছু ওরেশনিক সিস্টেম বেলারুশে স্থানান্তর করা হয়েছে এবং রাশিয়ার নিজস্ব ভাণ্ডারেও কিছু রয়েছে। তবে তিনি ইঙ্গিত দেন, এই নতুন ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত অসীম নয়।
তিনি লেখেন, 'সবকিছু বিবেচনায় নিলে ধরে নেওয়া যায়, বছরে দুই বা তিনবার এমন শক্তি প্রদর্শনের সক্ষমতা আমাদের রয়েছে।'
তিনি আশা প্রকাশ করেন, আপাতত আর কোনো উৎক্ষেপণের প্রয়োজন হবে না। পরিশেষে তিনি লেখেন, 'বার্তা পাঠানো হয়েছে, এবং তারা তা শুনতে পেয়েছে।'
