ফোন নম্বর ছাড়াই মেসেজ-কলের সুবিধা, হোয়াটসঅ্যাপ-সিগন্যালকে টেক্কা দিতে মাস্ক আনছেন ‘এক্সচ্যাট’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) মেসেজিং ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা করছেন ইলন মাস্ক। 'এক্সচ্যাট' নামে নতুন একটি ফিচার আনার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি, যা হোয়াটসঅ্যাপ ও সিগন্যালের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। এক্সকে একটি 'এভরিথিং অ্যাপ' বা সব কাজের অ্যাপে রূপান্তরের অংশ হিসেবে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শুরুতে ফিচারটি কেবল নির্দিষ্ট প্রিমিয়াম সাবস্ক্রাইবারদের জন্য 'বেটা মোড' বা পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়েছিল। তবে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এটি সাধারণ ব্যবহারকারীসহ সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।
বর্তমানে আইওএস (আইফোন/আইপ্যাড) এবং ওয়েব ব্রাউজার ব্যবহারকারীরা এক্সচ্যাট ব্যবহার করতে পারছেন। তবে অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীদের জন্য এটি এখনও পুরোপুরি চালু হয়নি; শীঘ্রই এটি সবার কাছে পৌঁছাবে বলে জানা গেছে। এটি আলাদা কোনো অ্যাপ হিসেবে নয়, বরং এক্স অ্যাপের 'ডিরেক্ট মেসেজ' ট্যাবের সঙ্গেই বিল্ট-ইন বা গভীরভাবে যুক্ত করা হয়েছে। অ্যাপ আপডেট করলেই নতুন 'চ্যাট' ফিচারগুলো দেখা যাবে।
এক্সচ্যাটে কী কী থাকছে?
এক্সচ্যাটে নিরাপত্তা ও গোপনীয়তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে যুক্ত করা হচ্ছে 'বিটকয়েন স্টাইল' এনক্রিপশন, নির্দিষ্ট সময় পর মুছে যাওয়া বা 'ডিজঅ্যাপিয়ারিং মেসেজ' এবং ক্রস-প্লাটফর্ম অডিও-ভিডিও কলের সুবিধা। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এসব সুবিধা পেতে ব্যবহারকারীদের কোনো ফোন নম্বর যুক্ত করতে হবে না।
বর্তমানে নির্দিষ্ট কিছু পেইড সাবস্ক্রাইবারদের জন্য ফিচারটি 'বেটা মোড' বা পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ৪ ডিজিটের পাসকোড দিয়ে এখানকার এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপটেড চ্যাটগুলো সুরক্ষিত রাখা যাবে।
ইলন মাস্কের ভাষ্যমতে, এক্সচ্যাট আলাদা কোনো অ্যাপ হিসেবে নয়, বরং এক্সের মূল কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থাকবে। এখানে ফাইল শেয়ারিং এবং সম্ভবত পেমেন্ট বা অর্থ লেনদেনের সুবিধাও থাকবে।
হোয়াটসঅ্যাপ: জনপ্রিয়তা বনাম নিরাপত্তা
বিশ্বজুড়ে ২০০ কোটির বেশি মানুষ মেটার মালিকানাধীন হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করেন। এতে মেসেজ ও কলের জন্য ডিফল্টভাবে 'এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন' চালু থাকে। অর্থাৎ, মেটা চাইলেও ব্যবহারকারীদের কথোপকথন পড়তে পারে না।
তবে হোয়াটসঅ্যাপ 'মেটাডেটা' সংগ্রহ করে। আপনি কার সঙ্গে, কতবার এবং কখন যোগাযোগ করছেন—এসব তথ্য তাদের কাছে থাকে। মেসেজের বিষয়বস্তু গোপন থাকলেও ব্যবহারের ধরণ কোম্পানির কাছে দৃশ্যমান। অধিকাংশ ব্যবহারকারীর জন্য হোয়াটসঅ্যাপ সুবিধা ও নিরাপত্তার একটি ভালো ভারসাম্য বজায় রাখে।
সিগন্যাল: গোপনীয়তার মাপকাঠি
সিগন্যালকে বর্তমানে সবচেয়ে নিরাপদ ও মূলধারার মেসেজিং অ্যাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং এর মূল ভিত্তিই হলো গোপনীয়তা।
সিগন্যালও ডিফল্টভাবে এনক্রিপশন ব্যবহার করে এবং তারা খুব নগণ্য পরিমাণ মেটাডেটা সংরক্ষণ করে। সিগন্যাল ব্যবহারকারীর মেসেজ, কন্টাক্ট লিস্ট বা ব্যবহারের ধরণ দেখতে পায় না। যারা সর্বোচ্চ গোপনীয়তা চান, তাদের জন্য সিগন্যালই সেরা পছন্দ। তবে হোয়াটসঅ্যাপের তুলনায় এর ব্যবহারকারী কম।
এক্সচ্যাটের এনক্রিপশন নিয়ে ধোঁয়াশা
ইলন মাস্ক এক্সচ্যাটে এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশনের কথা বললেও, এটি কীভাবে কাজ করবে তা নিয়ে বিস্তারিত জানাননি। সিগন্যাল বা হোয়াটসঅ্যাপের মতো এক্সচ্যাট তাদের এনক্রিপশন প্রোটোকল প্রকাশ করেনি এবং কোনো স্বাধীন নিরাপত্তা অডিটের মধ্য দিয়েও যায়নি। এছাড়া ব্যবহারকারীদের যোগাযোগের কতটুকু মেটাডেটা এক্স সংরক্ষণ করবে, তাও অস্পষ্ট। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের দ্বারা যাচাই না হওয়া পর্যন্ত গোপনীয়তা রক্ষায় এক্সচ্যাট কতটা কার্যকর, তা অজানা।
এনক্রিপশন আসলে কী সুরক্ষা দেয়?
এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন নিশ্চিত করে যে, কেবল প্রেরক এবং প্রাপকই মেসেজ পড়তে পারবেন। এমনকি সেবা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম বা সার্ভার হ্যাক হলেও হ্যাকাররা মেসেজের বিষয়বস্তু জানতে পারবে না। এটি নজরদারি থেকেও সুরক্ষা দেয়।
তবে এনক্রিপশন সবকিছু গোপন রাখতে পারে না। বেশিরভাগ প্ল্যাটফর্মই মেটাডেটা (কে, কখন, কার সঙ্গে কথা বলছে) দেখতে পায়। সিগন্যাল এই তথ্য সংগ্রহ সর্বনিম্ন রাখে, হোয়াটসঅ্যাপ কিছুটা বেশি রাখে। এক্সচ্যাট এ বিষয়ে কী নীতি অবলম্বন করবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
আস্থা রাখবেন কার ওপর?
যারা গোপনীয়তাকে সবার ওপরে স্থান দেন, তাদের জন্য সিগন্যালই সেরা। ব্যাপক ব্যবহার ও সুবিধার জন্য হোয়াটসঅ্যাপ এগিয়ে। এক্সচ্যাটের সম্ভাবনা থাকলেও তা এখনো পরীক্ষিত নয়। যদি স্বচ্ছ এনক্রিপশন মানদণ্ড এবং স্বাধীন অডিটের মাধ্যমে এক্সচ্যাট বাজারে আসে, তবেই এটি শক্তিশালী প্রতিযোগী হয়ে উঠতে পারে। অন্যথায়, এটি একটি 'প্রতিশ্রুতিশীল ধারণা' হিসেবেই থেকে যাবে।
