যখন একটি দেশের অধিকাংশ হ্রদ হারিয়ে যায়, তখন কী হয়?
আনাতোলিয়ার এক রুক্ষ বিকেল। ধুলোমাখা বাতাসে গরম হলকা। তার মাঝেই এক কংক্রিটের ঘাটে দাঁড়িয়ে আছেন নিমেত সেজেন এবং আলি এরিফে। তাদের সামনে শুধুই শুকনো কাঁটাঝোপ আর ঘাস। দূরে ঘাসের বুকে নীল রঙের দুটো অদ্ভুত জিনিস চোখে পড়ছে। ওগুলো আসলে পরিত্যক্ত নৌকা। অথচ কিছুদিন আগেও এখানে ছিল থইথই পানি।
তুরস্কের মারমারা হ্রদ। একসময় ১৭.২ বর্গমাইল জুড়ে ছিল এর বিস্তৃতি। সাদা পেলিকান, গাঙচিল আর ফ্লেমিঙ্গো মিলে প্রায় ২০ হাজার পাখির কলকাকলিতে মুখর থাকত এই এলাকা। পর্যটকরা আসত নৌকাভ্রমণে। কিন্তু ২০১১ সালে হ্রদটি শুকিয়ে যেতে শুরু করে। ২০২১ সালের মধ্যে এর ৯৮ শতাংশ পানিই উধাও হয়ে গেছে। ধ্বংস হয়ে গেছে এখানকার বাস্তুতন্ত্র।
নিমেত আর আলি এখানকার টেকেলিওলু গ্রামের বাসিন্দা। নিমেত একসময় এই হ্রদে মাছ ধরতেন। আলি এখানে সাঁতার শিখেছেন। ২০১৮ সালের পর তিনি আর এখানে সাঁতরাতে পারেননি। আলি বলেন, 'আমি সবসময় এই হ্রদকে মিস করি। গ্রামের নতুন বাচ্চারা তো সাঁতারই জানে না।'
মারমারা হ্রদ একা নয়। তুরস্কজুড়ে ১৮৬টি হ্রদ গত ৫০ বছরে শুকিয়ে গেছে। গত এক দশকে এই হার আরও বেড়েছে। জাতিসংঘের মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে তুরস্ক ভয়াবহ খরায় পড়তে পারে এবং দেশটির ৮৮ শতাংশ এলাকা মরুভূমি হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। পানি কমে যাওয়ায় কিছু হ্রদের নিচ থেকে প্রাচীন গির্জার ধ্বংসাবশেষও জেগে উঠেছে।
এই বিপর্যয়ের প্রধান কারণ মানুষ। কৃষিকাজ আর খনির জন্য বাঁধ দিয়ে হ্রদের পানি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। যেমন মারমারা হ্রদ শুকিয়ে গেছে মূলত গর্দেস বাঁধের কারণে। এই বাঁধ দিয়ে কৃষিজমিতে সেচ দেওয়া হতো। এখন হ্রদটি একেবারে শুকনো হাড়ের মতো। বৃষ্টিও হচ্ছে না। পানি শুকিয়ে যাওয়ায় মাটি লবণাক্ত হয়ে পড়ছে, আর বিষাক্ত ধুলো উড়ছে।
'দোয়া দেরনেগি' বা নেচার অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান ডিকল টুবা কিলিস বলেন, 'আমরা প্রচুর হ্রদ ও জলাভূমি হারিয়েছি। কৃষিতে এখন ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে থাকবে না। এটি একটি ভয়াবহ পানি সংকট।'
তুরস্কের বৃহত্তম হ্রদ 'লেক ভ্যান'-এর পানিও কমছে। সৈকত সরে যাচ্ছে, জেগে উঠছে পুরোনো আবর্জনা আর প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ। 'সল্ট লেক' বা লবণের হ্রদ শুকিয়ে পাখির কবরস্থানে পরিণত হয়েছে। সেখানে মৃত পাখির কঙ্কাল ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
এই সর্বনাশের বীজ বোনা হয়েছিল ১৯৫০-এর দশকে। তখন তুরস্ক উন্নয়নের নামে বাঁধ তৈরির জোয়ারে ভেসেছিল। গুডফরট্রাস্ট ডট অর্গ-এর প্রতিষ্ঠাতা উইগার ওজেসমি বলেন, 'সেচ প্রকল্পের জন্য প্রচুর বাঁধ আর খাল কাটা হয়েছিল। এটি সেই 'বাঁধ যুগের'ই উত্তরাধিকার।'
ডব্লিউডব্লিউএফ তুরস্কের এরেন আতাক জানান, তুরস্কের ৭৭ শতাংশ পানি কৃষিকাজে ব্যবহার করা হয়। আগে গম বা ডালের মতো কম পানির ফসল চাষ হতো। এখন ভুট্টা বা আখের মতো ফসল চাষ হয়, যাতে প্রচুর পানি লাগে। জেলেরা বলছেন, আগে যেখানে ডাল চাষ হতো, এখন তা কানাডা থেকে আমদানি করতে হয়।
কৃষকরা ভূগর্ভস্থ পানি তুলতে অবৈধ কূপ খনন করছেন। এতে জলাভূমি শুকিয়ে যাচ্ছে। খনির জন্যও প্রচুর পানি নষ্ট হচ্ছে। গত জুলাইয়ে সরকার জলপাই বাগান ও চারণভূমিতে খনির অনুমতি দিয়েছে। এরোল কেসিসি নামের এক বিশেষজ্ঞ বলেন, 'এক গ্রাম সোনা তুলতে হাজার হাজার লিটার পানি দূষিত করা হচ্ছে।'
শুধু তুরস্ক নয়, ২০২৩ সালের এক রিপোর্টে দেখা গেছে বিশ্বের ৫০ শতাংশ বড় হ্রদ ও জলাধারের পানি কমছে। কাস্পিয়ান সাগর থেকে শুরু করে আমেরিকার লেক মিড—সব জায়গাতেই একই দশা। পানি কমলে আশপাশের এলাকা শুষ্ক হয়ে যায়, আর তাতে পানি আরও দ্রুত বাষ্প হয়ে উড়ে যায়।
মারমারা হ্রদ শুকিয়ে যাওয়ায় স্থানীয় পশুপালন ও পর্যটন ধ্বংস হয়ে গেছে। মানুষ গ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছে। মাছের বাজারের সেই সাদা ভবনটি এখন প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের মতো দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তায় এখনো 'পানি এলাকা'র সাইনবোর্ড আছে, কিন্তু পানি নেই।
নিমেত আর আলি পাখির পর্যবেক্ষণের টাওয়ারে ওঠেন। সেখান থেকে তারা তাকিয়ে থাকেন সেই শূন্য, মৃত হ্রদের দিকে।
'আমার ভেতরটা মরে গেছে। আজ হ্রদগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে, এটা আমাদের সমস্যা। কাল এটা পুরো বিশ্বের সমস্যা হবে,' বলেন নিমেত।
