কেন আজকাল বিলিয়নেয়ারদের কথা এত বেশি শোনা যায়?
ইদানীং সবার ক্ষোভ যেন ওই বিলিয়নেয়ার বা শতকোটিপতিদের ওপর। সাধারণ মানুষ যখন নিত্যপণ্যের দাম আর চিকিৎসার খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন অতি-ধনীরা তাদের বিলাসবহুল সুপার ইয়টে চেপে ঘুরছে। তারা যাতায়াত করছে ব্যক্তিগত বিমানে। ইলন মাস্ক হয়তো বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নেয়ার হতে চলেছেন। আবার নিউ ইয়র্কের নির্বাচনে জোহরান মামদানিকে হারাতে এই ধনীরা অঢেল টাকা ঢেলেছেন। সাধারণ মানুষের চেয়ে 'থ্রি কমা ক্লাব' বা এই শতকোটিপতিদের করের হারও অনেক কম।
একটি নতুন জরিপে দেখা গেছে, ৬৭ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন বিলিয়নেয়াররা সমাজকে অন্যায্য করে তুলছেন। গত এক বছরের তুলনায় এই হার আট পয়েন্ট বেড়েছে।
বিলিয়নেয়ারবিরোধী এই মনোভাব এখন তুঙ্গে। এর পেছনের কারণ বুঝতে 'টুডে, এক্সপ্লেইনড' পডকাস্টের উপস্থাপক নোয়েল কিং কথা বলেছেন ইভান ওসনসের সঙ্গে। ইভান 'নিউ ইয়র্কার' পত্রিকার লেখক। তিনি অতি-ধনীদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন এবং তাদের নিয়ে 'দ্য হ্যাভস অ্যান্ড হ্যাভ-ইয়টস' নামে একটি বইও লিখেছেন।
বিলিয়নেয়ারদের সঙ্গে মেলামেশার ভালো ও খারাপ দিক নিয়ে ইভান কথা বলেছেন। তার মতে, ভালো দিক হলো তাদের জীবনযাপন খুবই লোভনীয়। তাদের খাবার বা পানীয়ের স্বাদ অতুলনীয়। কিন্তু খারাপ দিক হলো, তাদের দেখে দেশের গণতান্ত্রিক সুস্থতা নিয়ে মনে প্রশ্ন জাগে। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বিষয়টি একই সঙ্গে রোমাঞ্চকর এবং ভয়ের।
বিলিয়নেয়ার বলতেই অনেকে অপরাহ উইনফ্রের কথা ভাবেন। কিন্তু তিনি সাধারণ উদাহরণ নন। গড়পড়তা বিলিয়নেয়ার দেখতে অনেকটা ইলন মাস্কের মতো। অর্থাৎ পঞ্চাশোর্ধ কোনো পুরুষ, যিনি প্রযুক্তি, উত্তরাধিকার বা বিশাল সব সংখ্যার সমন্বয়ে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন।
বর্তমান সময়ের লক্ষণীয় বিষয় হলো, এখন ছোটখাটো বিলিয়নেয়ার থেকে বিশাল বিলিয়নেয়ার হওয়া খুব সহজ হয়ে গেছে। মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এখন 'সেন্টিবিলিয়নেয়ার' বা ১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি সম্পদের মালিক দেখা যাচ্ছে। দশ বছর আগেও বিশ্বে এমন কেউ ছিল না। আজ এমন ডজনখানেক মানুষ আছেন। যেমন ইলন মাস্ক। দশ বছর আগে তার সম্পদ ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল না। আজ তার সম্পদ প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার। সংখ্যার এই বৃদ্ধি আকাশছোঁয়া।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ৩,০০০ এর বেশি বিলিয়নেয়ার আছেন। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রেই এই বৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি। ১৯৯০ সালে দেশটিতে মাত্র ৬৬ জন বিলিয়নেয়ার ছিলেন। আজ সেই সংখ্যা প্রায় এক হাজারের কাছাকাছি।
সংখ্যার চেয়েও বিস্ময়কর হলো সম্পদের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ। আগে আমেরিকার ০.১ শতাংশ মানুষ দেশের ৭ শতাংশ সম্পদের মালিক ছিল। আজ তা বেড়ে ১৮ শতাংশ হয়েছে। এর মূল কারণ গত এক শতাব্দীতে নিয়মকানুন বদলে ফেলা হয়েছে। কর কমিয়ে তাদের সম্পদ বাড়াতে সাহায্য করা হয়েছে। এক হিসাবে দেখা যায়, শীর্ষ ৪০০ ধনীর গড় করের হার ৫০ বছর আগের তুলনায় অর্ধেক হয়ে গেছে। অথচ নিচের সারির ৯০ শতাংশ মানুষের করের হারে তেমন পরিবর্তন হয়নি।
টাকা কামানো বা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়ার পর কর ব্যবস্থা তাদের সুবিধা দেয়। ফলে টাকা তাদের কাছেই থেকে যায়। এখন প্রশ্ন হলো, তারা এই টাকা খরচ করেন কীভাবে?
আগে ধনীরা নিজেদের লুকিয়ে রাখতেন যাতে মানুষের রাগ বা কর কর্মকর্তাদের নজর না পড়ে। এখন দিন বদলেছে। ভেনিসে জেফ বেজোসের বিয়ে বা বিশাল সব সুপার ইয়ট সবার চোখের সামনেই থাকে। এসব ইয়ট মানুষের মালিকানাধীন সবচেয়ে দামি বস্তুগুলোর একটি। এর কোনো কোনোটির দাম প্রায় ৫০ কোটি ডলার।
টাকা খরচের অদ্ভুত সব পথ এখন বের করা হচ্ছে। আগে অনেক টাকা থাকলে প্রিয় শিল্পীর কনসার্টে সামনের সারির টিকিট কেনা যেত। এখন পপ তারকাদের ভাড়া করে বাড়ির উঠোনে গান গাওয়ানো হচ্ছে। ফু ফাইটার্সের মতো ব্যান্ডও এখন ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানে গান গায়।
টাকার অঙ্ক এত বড় হয়ে গেছে যে তারা খরচ করার জায়গা পাচ্ছেন না। মালদ্বীপের বালুকাময় চরে থ্রি-ডি প্রিন্টেড রেস্তোরাঁ বানিয়ে একরাতের ডিনার শেষে তা ধুয়ে মুছে ফেলার ঘটনাও ঘটছে। সব কেনা শেষ হয়ে গেলে তারা এখন এমন অভিজ্ঞতার পেছনেই ছোটেন।
ইদানীং বিলিয়নেয়ার প্রথা বাতিলের দাবিও উঠছে। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের সময় থেকেই এই ধারণা ছিল। তবে এখন তা আরও স্পষ্ট হয়েছে। বার্নি স্যান্ডার্স বা এলিজাবেথ ওয়ারেনরা সম্পদের ওপর কর বসানোর কথা বলছেন। নিউ ইয়র্কের জোহরান মামদানির প্রচারণাও ছিল এর বড় উদাহরণ।
কিছুদিন আগে গায়িকা বিলি আইলিশ এক পুরস্কার অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, 'তোমাদের ভালোবাসি, কিন্তু এখানে এমন কয়েকজন আছে যাদের টাকা আমার চেয়ে অনেক বেশি। আপনি যদি বিলিয়নেয়ার হন, তবে কেন আপনি বিলিয়নেয়ার? কাউকে ছোট করছি না, কিন্তু ওই টাকাগুলো দিয়ে দিন।'
জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে এমন কথাবার্তা এখন নিয়মিত হয়ে উঠছে। এর কারণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার এমন মিলন আগে দেখা যায়নি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শপথ অনুষ্ঠানে ধনীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। তার প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতেও বিলিয়নেয়ারদের বসানো হয়েছে। সরকার পরিচালনার চাবিকাঠি এখন বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের হাতে। গরিবদের ভর্তুকি কমিয়ে ধনীদের পকেট ভারী করার আইন পাস হচ্ছে।
এক দশক আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে শ্রেণি সংগ্রামের আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। এতদিন মানুষ এই বৈষম্য মেনে নিয়েছিল। তারা ভাবত, চেষ্টা করলে তারাও একদিন ধনী হতে পারবে। এটি ছিল আমেরিকার স্বপ্ন বা মিথ। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। ১৯৪০ সালে জন্মানো মানুষের বাবা-মায়ের চেয়ে বেশি আয়ের সম্ভাবনা ছিল ৯০ শতাংশ। এখনকার প্রজন্মের জন্য তা অর্ধেকেরও নিচে নেমে গেছে। ফলে সেই স্বপ্নের প্রতি মানুষের বিশ্বাস উঠে যাচ্ছে।
ইতিহাসবিদ রামসে ম্যাকমুলেন রোমান সাম্রাজ্যের পতনের কারণ হিসেবে বলেছিলেন—'অল্প কিছু মানুষের হাতে অনেক বেশি সম্পদ'। আমেরিকার গণতন্ত্রের ভিত্তি নিয়েও এখন একই শঙ্কা দেখা দিচ্ছে। তাই বিশাল সম্পদকে এখন আর সাফল্যের প্রতীক ভাবা হচ্ছে না, বরং বিপদের সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই মনোভাব এখন দ্রুত পাল্টাচ্ছে।
