কী হবে...যদি পৃথিবী থেকে সব বিলিয়নেয়ারদের সরিয়ে দেওয়া হয়?
টেসলার কর্ণধার ইলন মাস্ক। তিনি হয়তো শীঘ্রই ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ১ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ কোটি ডলারের বেতন পেতে যাচ্ছেন; এরপর তিনি শুধু বর্তমান বিশ্বের শীর্ষ ধনীই থাকবেন না, বরং ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হিসেবে নাম লেখাবেন।
তার এই পে-প্যাকেজের খবরটি যখন আলোচনায়, ঠিক তখনই পশ্চিমা বিশ্বে দানা বাঁধছে এক ভিন্ন বিতর্ক—'বিলিয়নেয়ারদের কি আদৌ আমাদের দরকার আছে? নাকি তাদের সম্পদের লাগাম টেনে ধরা উচিত?'
ধরুন, পৃথিবী থেকে সব বিলিয়নেয়ারকে সরিয়ে দেওয়া হলো। কিংবা নিয়ম করা হলো, ১০০ কোটি ডলারের বেশি সম্পদ কারও থাকবে না। বাড়তি সব সম্পদ সাধারণ মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হলো। তাহলে কেমন হতো এই পৃথিবী? আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর কি আদৌ কোনও উন্নতি হতো, নাকি আমরা বিশ্বের সেরা বিনিয়োগকারী ও উদ্ভাবকদের হারাতাম?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই দ্বারস্থ হওয়া হয়েছে বিশ্বের শীর্ষ কয়েকজন অর্থনীতিবিদ ও সমাজকর্মীর।
বর্তমানে অতিধনীদের সম্পদের পাহাড় নজিরবিহীন উচ্চতায় পৌঁছেছে। ফোর্বস ম্যাগাজিনের তথ্য বলছে, বিশ্বে এখন রেকর্ড ৩ হাজার ২৮ জন বিলিয়নেয়ার রয়েছেন। তাদের মোট সম্পদের পরিমাণ ১৬ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার। ইলন মাস্কের পে-প্যাকেজ চূড়ান্ত হলে তিনি বাকিদের আরও যোজন যোজন পেছনে ফেলে দেবেন।
বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের সময় ধনী-দরিদ্রের যে ব্যবধান ছিল, বর্তমান পরিস্থিতি যেন তার চেয়েও প্রকট।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৮৩ কোটি ১০ লাখ মানুষ চরম দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করছেন। মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় সমন্বয় করে দৈনিক ৩ ডলার আয়ের নিচে থাকাকে এই সীমানায় ধরা হয়েছে।
যদি বিশ্বের সব বিলিয়নেয়ারের কাছে মাত্র ১০০ কোটি (১ বিলিয়ন) ডলার রেখে বাকি সম্পদ নিয়ে নেওয়া হয়, তবে সেই অর্থ দিয়ে আগামী ১৯৬ বছর বিশ্বের চরম দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের দারিদ্র্য বিমোচনের ব্যয়ের হিসাব বিশ্লেষণ করে এমনটিই দেখা যাচ্ছে।
বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করেন, বিলিয়নেয়ারদের এই বিপুল সম্পদ বিশ্বের রাজনীতি, গণমাধ্যম এমনকি মানুষের চিন্তাধারাকেও প্রভাবিত করে। সবকিছুই অতিধনীদের স্বার্থের অনুকূলে চলে যায়।
যদিও এর ভিন্ন মতও আছে। কেউ কেউ মনে করেন, এই বিপুল সম্পদ বিশ্ব অর্থনীতির জন্যই ইতিবাচক। এতে উদ্ভাবক ও নির্মাতারা নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে অর্থায়নের সুযোগ পান, যা শেষ পর্যন্ত বিশ্বের এগিয়ে চলায় ভূমিকা রাখে।
উদ্ভাবন কি থমকে যাবে?
বিলিয়নেয়ারদের অস্তিত্ব বিলীন করে দেওয়ার ধারণাটি একেবারেই অবাস্তব। আর কল্পনার জগতে যদি এমনটা ঘটেও, তবে তা উন্নত অর্থনীতির জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে।
পশ্চিমা বিশ্বের অধিকাংশ বিলিয়নেয়ারই তাদের বিপুল সম্পদ গড়েছেন বিভিন্ন পণ্য বা সেবা তৈরির মাধ্যমে। সাধারণ মানুষ নিজেদের প্রয়োজনে স্বেচ্ছায় সেসব পণ্য বা সেবা কিনেই তাদের ধনী বানিয়েছে।
'বিলিয়নেয়ার' বলতে তাদেরই বোঝায়, যাদের সম্পদের পরিমাণ ১০০ কোটি ডলারের বেশি। তবে মনে রাখা দরকার, এই সম্পদ মূলত বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার, মেধা স্বত্ব (আইপি), জমি বা অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তির আকারে থাকে। এই সম্পদ অনেকটাই তাত্ত্বিক। তাদের ব্যাংকে কাড়ি কাড়ি টাকা জমা থাকে না, কিংবা তারা টাকার পাহাড়ে ঘুমান না।
অ্যাডাম স্মিথ ইনস্টিটিউটের পাবলিক অ্যাফেয়ার্স ডিরেক্টর ম্যাক্সওয়েল মারলোর মতে, বিলিয়নেয়ারদের বিলুপ্ত করার চিন্তা সমাজের জন্য ভয়াবহ।
তিনি বলেন, এনভিডিয়ার কথাই ধরুন। প্রতিষ্ঠানটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বিপ্লবের নেতৃত্ব দিচ্ছে, কর্মীদেরও শেয়ার দিচ্ছে। আবার স্পেসএক্স সবার জন্য স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থা উন্মুক্ত করে দিয়েছে, যার সুফল আমরা সবাই ভোগ করছি।
'আবার মুদ্রার উল্টো পিঠটা দেখুন। যদি বিলিয়নেয়ারদের অস্তিত্ব না থাকে, তবে এসব অসাধারণ মানুষের সমস্যা সমাধানের আগ্রহও থাকবে না। এতে আমরাই প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হব, সমস্যাগুলো সমস্যাই থেকে যাবে,' বলেন তিনি।
সম্পদ যদি সুষম বণ্টন হতো?
বিলিয়নেয়ারদের ওপর কর আরোপ জরুরি। তবে গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রেক্ষাপট থেকে আসল প্রশ্ন হলো—এই কর কোথায় দেওয়া উচিত?
প্রথমত, বিষয়টিকে রবিন হুডের মতো ধনীদের সম্পদ লুটে গরিবদের বিলিয়ে দেওয়ার গল্পের মতো ভাবলে চলবে না। দ্বিতীয়ত, বিলিয়নেয়াররা কেবল যে দেশে বসবাস করেন, সেখানেই যদি কর দেন, তবে কি ন্যায়বিচার হয়? কারণ, তাদের সম্পদ তো শুধু সেখানে তৈরি হয়নি।
সম্পদ কেবল বিনিয়োগের মাধ্যমেই তৈরি হয় না; এর জন্য প্রয়োজন কাঁচামাল ও শ্রম। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে এর বড় অংশই আসে গ্লোবাল সাউথ বা অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে। তাই নিয়ম অনুযায়ী, যেখান থেকে সম্পদ আহরণ করা হচ্ছে, করের টাকার একটি অংশ সেখানেই ফিরে যাওয়া উচিত।
বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্প শহরের উদাহরণ দেওয়া যাক। এটি একটি চমৎকার শহর, সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রার মানও অনেক উন্নত। কিন্তু এই সমৃদ্ধির ভিত্তি হলো ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর হীরা। অথচ কঙ্গোর মানুষের ভাগ্যের চাকা ঘোরেনি। আমাদের প্রশ্ন তুলতে হবে—কেন এই বৈষম্য? এটি কোনো দয়া-দাক্ষিণ্যের বিষয় নয়; বরং বিশ্ব অর্থনীতিকে ঢেলে সাজিয়ে ন্যায্য ব্যবস্থা গড়ে তোলাই মূল কথা।
গত ৩০ থেকে ৪০ বছরে বৈষম্য জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। অথচ অতীতে অতিরিক্ত সম্পদের ওপর ৯৭ থেকে ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত কর আরোপের নজির ছিল। তখন বিশ্বজুড়ে একটি অলিখিত ঐকমত্য ছিল যে গুটিকয় মানুষের হাতে অঢেল সম্পদ কুক্ষিগত থাকাটা 'অস্বাস্থ্যকর'। মনে করা হতো, এই অর্থ স্বাস্থ্য, জনকল্যাণ ও শিক্ষার কাজে ব্যয় হওয়াই উত্তম।
বর্তমানে অর্থনৈতিক সংকটের মুহূর্তে সরকারগুলো কৃচ্ছ্রসাধনের পথ বেছে নেয়। আর এর পুরো বোঝাটাই গিয়ে চাপে দরিদ্র ও মধ্যবিত্তের ঘাড়ে। এই প্রবণতাটি বেশ নতুন।
গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ট্যাক্স জাস্টিসের নির্বাহী সমন্বয়ক দেরেজে আলেমায়েহু বলেন, 'শুধু বিলিয়নেয়ারদের ওপর নতুন কর চাপালেই হবে না, প্রয়োজন কাঠামোগত পরিবর্তন। যে কাঠামো বৈষম্য জিইয়ে রাখে, তা যদি বহাল থাকে, তবে আমরা অস্তিত্বের সংকটে পড়ব। কারণ, বিপুল সম্পদের মালিক এসব ব্যক্তি তখন অনেক সরকারের চেয়েও বেশি ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠেন।'
তিনি আরও বলেন, 'সম্পদ এখন গুটিকয় মানুষের হাতে পুঞ্জীভূত হয়ে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নিচ্ছে। বিশ্বজুড়েই এমন একটি 'অলিগার্কিক' ব্যবস্থা গেড়ে বসছে। গ্লোবাল সাউথ বা অনুন্নত দেশগুলোও এর বাইরে নয়, অথচ এসব সম্পদের উৎস সেখানেই।'
সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এমডিজির আওতায় কলেরা নির্মূলের বিষয়টি উদাহরণ হিসেবে টানেন দেরেজে আলেমায়েহু। তিনি বলেন, 'কলেরার টিকার দাম মাত্র ২ ডলার। ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যার সঙ্গে এই অর্থ গুণ করলেই রোগটি পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে অঙ্কটা এভাবে মেলে না। মানুষের জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন না হলে তাঁরা ঝুঁকির মুখেই থেকে যান। সম্পদ পুনর্বণ্টনের বিষয়টিও ঠিক তেমনই। কেবল অর্থ সহায়তা দিলেই হবে না, কাঠামো বদলাতে হবে।'
নীতিমালা কি বদলাতে হবে?
গ্লোবাল ইনস্টিটিউট ফর সাসটেইনেবল প্রসপারিটির প্রেসিডেন্ট ফাদেল কাবুব বলেন, আজ যদি আমরা সব বিলিয়নেয়ারকে সরিয়েও দিই, আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, পরের সপ্তাহেই নতুন একদল বিলিয়নেয়ার তৈরি হয়ে যাবে।
বিলিয়নেয়ারদের এই উত্থান আসলে নীতিগত ব্যর্থতার ফল। তাদের অস্তিত্ব থাকাটাই অযৌক্তিক। অথচ ব্যবস্থাটাই এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে সম্পদ গুটিকয় মানুষের হাতেই পুঞ্জীভূত হয়। এই ব্যবস্থা সাম্য, স্থায়িত্ব কিংবা পরিবেশগত ন্যায়বিচারের জন্য তৈরি হয়নি; বরং এটি বিলিয়নেয়ারদের স্বার্থ রক্ষার্থেই টিকে আছে।
আমার অনেক প্রগতিশীল সহকর্মী সম্পদ পুনর্বণ্টনের কথা বলেন। তারা বলেন, বিলিয়নেয়ারদের ওপর কর বসিয়ে সেই টাকায় স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশ সংস্কার ও অন্যান্য জনকল্যাণমূলক কাজ করা হোক। কিন্তু এতে মূল সমস্যাটি আড়ালেই থেকে যায়।
মদ বা সিগারেটের ওপর কর বসিয়ে স্বাস্থ্যসেবার খরচ মেটানোর বিষয়টি ভাবুন। এখানে যুক্তিটা একটু অদ্ভুত। অর্থাৎ, মানুষ যত বেশি ধূমপান করবে বা মদ পান করবে, সরকারের রাজস্ব আয় তত বেশি হবে।
বিলিয়নেয়ারদের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। তাদের আমরা যত বেশি সম্পদ গড়তে দেব, করের ওই 'ছোট্ট অংশ' থেকে আমাদের আয় তত বেশি হবে। এর মানে দাঁড়ায়, জনকল্যাণমূলক কাজের টাকার জন্য আমরা পরোক্ষভাবে এই বিলিয়নেয়ারদের অনুমতির অপেক্ষায় থাকি।
আমরা যদি সত্যিই বিলিয়নেয়ারমুক্ত পৃথিবী চাই, তবে আইনের মাধ্যমেই তাদের রাশ টানতে হবে। এটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয় যে পশ্চিমা দেশগুলোর 'অ্যান্টিট্রাস্ট' বা একচেটিয়া ব্যবসা রোধের আইনগুলো শত বছরের পুরোনো। মূলত সেকেলে এসব আইনই বিলিয়নেয়ারদের বাড়বাড়ন্তের সুযোগ করে দিয়েছে।
আমাদের এখন যুগোপযোগী আইন দরকার। ব্যয় বা খরচের সিদ্ধান্তের সঙ্গে কর ও নীতিমালার বিষয়টিকে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। তবেই আমরা এমন একটি ন্যায়সংগত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়তে পারব, যা সাধারণ মানুষের মূল্যবোধকে ধারণ করবে।
গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ কি বদলাবে?
বিলিয়নেয়ারদের সরিয়ে দিলে গণমাধ্যমের কী হবে—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
প্রথমত, বিলিয়নেয়ারদের গণমাধ্যমের মালিক হওয়াটা নতুন কিছু নয়, এটি দীর্ঘদিনের চর্চা। কিন্তু এখন পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে তারা কেবল টাকার জোরে পুরো একটি মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম বা প্রতিষ্ঠান কিনে ফেলছেন। জেফ বেজোস (ওয়াশিংটন পোস্টের মালিক) বা ইলন মাস্কের (এক্স বা টুইটারের মালিক) কথাই ভাবুন।
স্বভাবতই, এর ফলে সাধারণ মানুষের কাছে কী তথ্য পৌঁছাবে এবং কে তা ঠিক করে দেবে—সেই সমীকরণ বদলে যায়।
দ্বিতীয়ত, অনেক সময় বিলিয়নেয়াররা দাবি করেন যে তারা সাংবাদিকতাকে বাঁচাতে সংবাদমাধ্যম কিনছেন। কিন্তু তাঁদের এই 'মহৎ উদ্দেশ্য' ততক্ষণই থাকে, যতক্ষণ তাদের নিজেদের স্বার্থে আঘাত না লাগে কিংবা যতক্ষণ তারা এর মধ্যে লাভ খুঁজে পান।
উদাহরণ হিসেবে মাস্কের কথা বলা যায়। তিনি সাংবাদিকতার জন্য বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি প্ল্যাটফর্ম (সাবেক টুইটার, বর্তমান এক্স) কিনে নিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিজের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে সেটিকে ব্যবহার করছেন এবং প্ল্যাটফর্মটির নিরপেক্ষতা নষ্ট করেছেন।
মনে রাখা জরুরি, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করা মানে আসলে তথ্যের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা। এ কারণেই দেখা যায়, সংবাদমাধ্যমের মালিকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্য বা সমালোচনা চোখে পড়ে না।
অঢেল সম্পদের লাগাম টানা কি সম্ভব?
পশ্চিমা বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, সম্পদ ও ক্ষমতা ক্রমশ গুটিকয় মানুষের হাতে কুক্ষিগত হচ্ছে। তবে আশার কথা হলো, সম্পদ পুঞ্জীভূত করার এই ধারার অবসান হয়তো আসন্ন।
ইতিহাস বলছে, সম্পদের এমন পাহাড় গড়ার ঘটনা নতুন নয়, আবার তা ভেঙে দেওয়ার নজিরও আছে। ১৯১০-এর দশকে জন ডি রকফেলার ছিলেন বিশ্বের শীর্ষ ধনী, অনেকটা আজকের যুগের টেক জায়ান্টদের মতো। যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাঁর একচেটিয়া ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য ভেঙে দিয়েছিল।
এরপর ১৯৪৪ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট অতিধনীদের আয়ের ওপর সর্বোচ্চ ৯৪ শতাংশ পর্যন্ত কর আরোপ করেছিলেন। রুজভেল্টের 'নিউ ডিল' কর্মসূচির অর্থায়নও এসেছিল এভাবেই, যা যুক্তরাষ্ট্রকে ১৯৩০-এর দশকের ভয়াবহ মহামন্দা (গ্রেট ডিপ্রেশন) থেকে টেনে তুলতে ভূমিকা রেখেছিল।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পানামা পেপারস এবং লাক্সলিকসের মতো ঘটনা ধনাঢ্যদের গোপন সম্পদের তথ্য ফাঁস করে দিয়েছে। এতে মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক অসন্তোষ ও ক্ষোভ বেড়েছে। ফ্রান্সে এখন বিলিয়নেয়ার ও কোটিপতিদের ওপর কর আরোপের প্রস্তাবটি জোরালো রাজনৈতিক সমর্থন পাচ্ছে।
জি-২০ সম্মেলনে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা অতিধনীদের ওপর কর আরোপের বিষয়টিকে এজেন্ডার শীর্ষে রেখেছেন। এখন আর প্রশ্ন এটা নয় যে অতিধনীদের ওপর কর বসানো যাবে কি না; বরং প্রশ্ন হলো—কবে থেকে তা কার্যকর হবে।
তবে এই লড়াইয়ে জেতা সহজ হবে না। একটা সময় আয়কর ব্যবস্থাকে 'মার্ক্সবাদী' আখ্যা দিয়ে বিরোধিতা করা হতো, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অতিধনীদের সম্পদের কিছু অংশ যদি পুনর্বণ্টন করা যায়, তবে পশ্চিমা বিশ্বে ডানপন্থীদের ছড়ানো 'সম্পদ ফুরিয়ে যাওয়ার' ভীতিও দুর্বল হয়ে পড়বে।
মূলত প্রগতিশীলরা সম্পদ পুনর্বণ্টনের দাবিতে অতীতে খুব একটা জোর দিতে পারেননি। এই সুযোগেই ডানপন্থী ও ধনকুবেররা জোট বেঁধে অভিবাসীবিরোধী মনোভাব ও বিদেশি-বিদ্বেষকে সামনে নিয়ে এসেছে।
