রানিকে হত্যা করতে উসকে দেয় তারই সন্তানদের; সিংহাসন দখলে পিঁপড়েদের অভিনব এক কৌশল উন্মোচন বিজ্ঞানীদের
রূপকথা ও পৌরাণিক কাহিনির পরতে পরতে মিশে আছে পারিবারিক সহিংসতার নানা গল্প। প্রায়শই দেখা যায় নিষ্ঠুর অভিভাবক, কখনও মরিয়া বাবা-মা বা ঈর্ষান্বিত সৎমায়েরা শিশুদের ক্ষতি বা হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। গল্পের সেই শিশুরা কখনো রাপুনজেলের মতো টাওয়ারে বন্দী, নাহয় স্নো হোয়াইটের মতো বিষাক্ত আপেলের শিকার। আবার কখনো হ্যানসেল-গ্রেটেলের মতো পরিত্যক্ত হয়ে জঙ্গলে ডাইনির খপ্পরে পড়ে যায়, যে কি না তাদের রাতের খাবার বানানোর ফন্দি আঁটে!
লোককাহিনী বা রূপকথায় পারিবারিক ষড়যন্ত্রের এমন নানান গল্প শোনা গেলেও, সন্তানদের ষড়যন্ত্রে মাকে হত্যা করানোর মতো ঘটনা প্রায় নেই বললেই চলে। তবে কখনও কখনও প্রকৃতির ঘটনাগুলোই যেন আমাদের কল্পনার জগৎকেও হার মানায়।
সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা পিঁপড়ের এমন এক অদ্ভুত রহস্য উন্মোচন করেছেন, যা যেন শেক্সপিয়রের কোনো নাটককেও হার মানায়।
'কারেন্ট বায়োলজি' জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বিজ্ঞানীরা জানান, প্রাণীজগতে এমন জটিল ও নির্মম কৌশল এর আগে কখনও দেখা যায়নি। একটি পিঁপড়ের কলোনির রানি, মা পিপঁড়েকে হত্যা করছে তার নিজেরই সন্তানরা!
তবে পর্দার আড়ালে অপেক্ষা করছে আসল শত্রু—অন্য প্রজাতির এক আক্রমণকারী রানি। প্রথমে নিজেকে আড়াল করে, এরপর রাসায়নিকের সাহায্যে বাকি পিঁপড়েদের বিভ্রান্ত করে কলোনির বর্তমান রানির বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয় সে। কয়েক দিনের মধ্যেই তারা নিজেদের রানিকে বহিরাগত শত্রু ভেবে হত্যা করে এবং তার সিংহাসন সেই বহিরাগত রানি দখলে নিয়ে নেয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, আক্রমণকারী রানি প্রথমে সেই কলোনির কোনো একজন পিঁপড়েকে ধরে তার শরীরের গন্ধ নিজের গায়ে মেখে নেয়। এর ফলে সে সহজেই বাসার সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে যায় এবং কলোনির ভেতরে বিনা বাধায় ঢুকে পড়ে।
এরপর শুরু হয় আসল ষড়যন্ত্র। অনুপ্রবেশকারী রানি কলোনির মূল রানিকে খুঁজে বের করে তার গায়ে ফরমিক অ্যাসিডযুক্ত এক ধরনের বিষাক্ত তরল স্প্রে করে দেয়। এই রাসায়নিকের গন্ধে কলোনির পিপঁড়েরা এতটাই উত্তেজিত ও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে যে, তারা নিজেদের রানিকেই শত্রু ভাবতে শুরু করে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা সম্মিলিতভাবে রানির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কয়েক দিন ধরে এই আক্রমণ চলতে থাকে এবং অবশেষে তাদের হাতেই তাদের মায়ের মৃত্যু হয়।
'কারেন্ট বায়োলজি' জার্নালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পিঁপড়ের কলোনিতে রানিকে হত্যা করার ঘটনা একেবারে নতুন নয়। সাধারণত একটি কলোনিতে একাধিক রানি জন্মালে বা কোনো রানির প্রজনন ক্ষমতা শেষ হয়ে গেলে এমন ঘটনা ঘটে।
কিন্তু এক্ষেত্রে বহিরাগত কোনো রানির চক্রান্তে পিপঁড়েদের নিজেদের রানির হত্যাকারী হয়ে ওঠার ঘটনা এর আগে কখনো বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি।
জাপানের কিউশু ইউনিভার্সিটির গবেষক এবং এই গবেষণার প্রধান লেখক ড. কেইজো তাকাসুকা সিএনএনকে বলেন, 'জীববিজ্ঞানে এভাবে মেয়েদের দিয়ে তাদের জন্মদাত্রী মাকে হত্যা করতে প্ররোচিত করার ঘটনা এর আগে কখনো জানা ছিল না।'
নতুন এই গবেষণার জন্য টোকিওর দুই নাগরিক বিজ্ঞানী—সহ-লেখক তাকু শিমাদা এবং ইউজি তানাকা দুটি পিঁপড়ের কলোনি তৈরি করেন এবং সেখানে পরজীবী রানিকে প্রবেশ করান। শিমাদা একটি এল. ফ্লাভাস (L. flavus) কলোনিতে এল. ওরিয়েন্টালিস রানিকে পর্যবেক্ষণ করেন এবং তানাকা একটি এল. জাপোনিকাস (L. japonicus) কলোনিতে এল. আম্ব্রেটাস রানির আক্রমণ রেকর্ড করেন।
তাকাসুকা জানান, দুটি পরীক্ষাতেই বিজ্ঞানীরা প্রথমে আক্রমণকারী রানিকে কলোনির পিঁপড়ে ও কোকুনের (পিঁপড়ের ডিম) সঙ্গে রেখেছিলেন, যাতে সে বাসার সদস্যদের গন্ধ নিজের শরীরে মাখিয়ে নিতে পারে। এর ফলে সেও সেই কলোনির সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং আক্রমণের শিকার হওয়া থেকে বেঁচে যায়। এরপর বিজ্ঞানীরা রানিটিকে কলোনির মধ্যে ছেড়ে দেন।
আসল রানির মৃত্যুর পর অনুপ্রবেশকারী রানি ডিম পাড়তে শুরু করে এবং কলোনির পিপঁড়েরাই তার সন্তানদের লালন-পালন করতে থাকে। সময়ের সাথে সাথে, তার নিজের সন্তানের সংখ্যা হাজারে পৌঁছায় এবং ধীরে ধীরে তারা পুরো কলোনি দখল করে নেয়, যতক্ষণ না মূল প্রজাতির আর কোনো সদস্য অবশিষ্ট থাকে। এভাবেই নতুন রানির বংশধরদের আধিপত্য শুরু হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার পতঙ্গবিজ্ঞানী ড. জেসিকা পার্সেল, যিনি এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, বলেন, 'আমরা অনেক দিন ধরেই এমন কিছুর সন্দেহ করছিলাম, কিন্তু বিষয়টি কখনো প্রমাণিত হয়নি। রাসায়নিকের মাধ্যমে এমন কাজ করানো সত্যিই বিস্ময়কর।'
পিঁপড়ের মতো আরও কিছু কীটপতঙ্গ তাদের বাসায় প্রচুর খাদ্য সঞ্চয় করে রাখে, যা অন্য পরজীবী প্রাণীদের জন্য বেশ লোভনীয়। কিছু পরজীবী পিঁপড়ে অন্য বাসা থেকে বাচ্চা অপহরণ করে দাস বানায়, কিন্তু নিজের সন্তানদের দিয়েই রানিকে হত্যা করানোর এই কৌশল একেবারেই নতুন।
