ইউক্রেন যুদ্ধের নতুন মোড়: তেল নিয়ে বিশ্ব রাজনীতির নতুন খেলা!
রাশিয়ার তেল স্থাপনাগুলোতে যদি ইউক্রেনের হামলা অব্যাহত থাকে এবং আরও তীব্র হয়, তাহলে মস্কো বিশ্ববাজারে তার জ্বালানি রপ্তানি সক্ষমতার বড় একটি অংশ হারাতে পারে। ফলে এটি শুধু যুদ্ধ পরিচালনায় নয়, বৈশ্বিক বাজারেও গভীর অভিঘাত ফেলতে পারে। রাশিয়ার রাজস্বের সবচেয়ে বড় উৎস যখন জ্বালানি খাত, তখন এই খাতের ধস তাদের যুদ্ধযন্ত্রকে অকেজো-ও করে দিতে পারে। অন্তত তেমনটাই প্রত্যাশা করছে কিয়েভ।
এমনটা হলে ভারত, তুরস্ক এমনকি চীনও তখন জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে বৈচিত্র্য আনতে বাধ্য হবে। কিন্তু সমস্যার জায়গা হলো—বিকল্প জোগানদাতারা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই ইরান ও ভেনেজুয়েলাকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে। ইরান নতুন ইসরায়েলি হামলার আশঙ্কার মধ্যে আছে, আর ভেনেজুয়েলার উপকূলে মোতায়েন শক্তিশালী মার্কিন নৌবহর যেন একপ্রকার হুঁশিয়ারি দিচ্ছে—কারাকাসের বিরোধী-আমেরিকান সরকারের তখত উল্টে ফেলা হতে পারে।
এমন এক প্রেক্ষাপটে, মহাদেশীয় শিলাস্তর থেকে তেল ও গ্যাস উত্তোলনের নতুন প্রযুক্তির কারণে জ্বালানি বাজারে শক্তিধর হয়ে ওঠা আমেরিকা নিজেই তার বাজার সম্প্রসারণ করতে চাইবে। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোকে যেমন অস্ত্র কিনতে বাধ্য করা হয়েছে, তেমনি এখন রাশিয়ার তেলের পরিবর্তে আমেরিকান তেল কেনার চাপও বাড়তে পারে। ফলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বা প্রেসিডেন্ট পুতিনের—ব্যক্তিগত নেতৃত্বের ইচ্ছার বাইরে গিয়েও ভূ-রাজনীতির সমীকরণ এক নতুন দিকে মোড় নিচ্ছে।
এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে এই যুদ্ধ ছিল মূলত এক ব্যয়বহুল বোঝা—ঐতিহাসিক ইউরোপীয় মিত্রদের রক্ষার জন্য নেওয়া একটি পদক্ষেপ, কিন্তু আমেরিকার কৌশলগত অগ্রাধিকার তালিকার বাইরে থাকা এক সংঘাত। কিন্তু তেলের সমীকরণ যুদ্ধটিকে মার্কিন জ্বালানি শিল্পের জন্য সোনার খনি বানাতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের তেল শিল্প তখন ইউক্রেনকে সমর্থন দেওয়ার পক্ষে স্বার্থ খুঁজে পাবে, কারণ তাতে রাশিয়ার জ্বালানি খাতকে দুর্বল করা সম্ভব হবে। এ ধরনের অর্থনৈতিক স্বার্থই হতে পারে যুদ্ধের প্রকৃত টার্নিং পয়েন্ট।
এর মানে হতে পারে, কিয়েভ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও উন্নত ও বড় পরিসরে সামরিক সহায়তা পাবে, যা যুদ্ধের গতিপথ পাল্টে দিতে পারে। একই সঙ্গে রাশিয়ার অর্থনীতি ধসে পড়তে পারে, আর চীনের সামনে কঠিন প্রশ্ন উঠে আসবে—সে কি রাশিয়াকে আঁকড়ে ধরে নিজের দুর্বল অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলবে, নাকি মস্কোকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেবে? যদিও চীন-রাশিয়া সম্পর্ক ভেঙে যাবে, এমন সম্ভাবনা কম। তবে নতুন পরিস্থিতি সম্পর্কটিকে চাপের মুখে ফেলবে, টানাপোড়েন বাড়াবে।
চীন উদ্ভাবনী এবং বিকল্প খোঁজার ক্ষেত্রে পারদর্শী। তারা হয়তো তৃতীয় বা চতুর্থ পথও খুঁজে বের করতে পারে। কিন্তু এই সন্ধিক্ষণ উভয় দেশকেই নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে।
প্রভাব শুধু রাশিয়া-চীনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইরান ও ভেনেজুয়েলাও বড় সংকটে পড়বে। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার সরকার ইতিমধ্যেই বেসামাল অবস্থায় রয়েছে, আর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মস্কোর মতো অভিভাবকের দুরবস্থা তাদের পতন আরও ত্বরান্বিত করতে পারে।
এই বাড়তি চাপই হয়তো ব্যাখ্যা করে সাম্প্রতিক রুশ উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডকে—ন্যাটোর আকাশসীমা লঙ্ঘনকারী ড্রোন ও যুদ্ধবিমান, ইউরোপজুড়ে হাইব্রিড হামলা, সাইবার আক্রমণ। এসব হয়তো একধরনের বার্তা—ইউক্রেন যেন দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা কমায়। নইলে মস্কো ন্যাটোর সঙ্গে আরও বড় সংঘাতে নামতে প্রস্তুত।
ইউরোপ বা ন্যাটো কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তারা কি প্রতিরক্ষা জোরদার করবে, নাকি দ্বিধায় ভুগবে? তবে যেভাবেই হোক, ইউক্রেন যুদ্ধ এখন এমন এক সংকটময় অধ্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে সামনে দুটি পথ—রাশিয়ার মোকাবিলা করা অথবা পিছু হটা। একই সঙ্গে চীনের রাজনৈতিক জায়গা সংকুচিত হচ্ছে, তাদের কূটনৈতিক চাল দেওয়ার সুযোগ কমে আসছে, অন্তত এই যুদ্ধের ক্ষেত্রে।
এটি রাশিয়ার কৌশলগত দুর্বলতাও প্রকাশ করছে। তবে মস্কো এটিকে ব্যবহার করতে পারে ভিন্ন কায়দায়—ন্যাটোর ভেতরের দ্বিধাগ্রস্ত দেশগুলোকে লক্ষ্য করে হাইব্রিড আক্রমণ চালাতে। যেমন ইতালি—ইউরোপীয় ইউনিয়নের তিন বৃহৎ অর্থনীতির একটি, যেখানে খোলাখুলি রুশপন্থী দুটি দল আছে: সরকারে থাকা লিগ আর বিরোধী জোটের ফাইভ স্টার মুভমেন্ট। ইতালিতে সম্প্রতি বড় আকারে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভ হয়েছে, আর বাস্তবতা হলো—অনেক ক্ষেত্রেই ইতালির ফিলিস্তিনপন্থীরা একইসঙ্গে রাশিয়াপন্থীও বটে।
