গাজা শান্তি চুক্তি এখন ‘চূড়ান্ত পর্যায়ে’ রয়েছে: ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, গাজায় যুদ্ধ শেষ করার তার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা এখন 'চূড়ান্ত পর্যায়ে' রয়েছে। রোববার (২৮ সেপ্টেম্বর) এক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা জানান। ট্রাম্পের দাবি, এই সমঝোতা হলে মধ্যপ্রাচ্যে আরও বড় পরিসরে শান্তির পথ খুলে যেতে পারে।
ট্রাম্প এক্সিওসকে বলেন, 'সবাই মিলেমিশে একটি চুক্তি করার চেষ্টা করছে, তবে আমাদের সেটা সম্পন্ন করতেই হবে।'
তিনি আরও বলেন, 'আরব দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করা দারুণ ছিল। হামাসও তাদের সঙ্গে যাচ্ছে। তারা আরব বিশ্বের প্রতি অনেক সম্মান দেখায়। আরব বিশ্ব শান্তি চায়, ইসরায়েল শান্তি চায়, এবং বিবি (নেতানিয়াহু) শান্তি চায়।'
ট্রাম্পের পরিকল্পনার লক্ষ্য শুধুমাত্র গাজায় যুদ্ধ শেষ করা নয়। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে পুরো অঞ্চলে শান্তি ফেরানোর চেষ্টা শুরু হবে।
তিনি যোগ করেন, 'যদি আমরা এটা সফল করি, তা হবে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এটি মধ্যপ্রাচ্যে বাস্তবসম্মত শান্তির প্রথম সুযোগ। তবে আগে আমাদের এটি সম্পন্ন করতে হবে।'
হোয়াইট হাউসের দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জারেড কুশনার নিউইয়র্কে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে দেখা করবেন। বৈঠকের সঙ্গে পরিচিত এক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এই বৈঠকের লক্ষ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে বাকি থাকা মতবিরোধ দূর করা।
ট্রাম্প সোমবার হোয়াইট হাউসে নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করবেন। এক্সিওসকে তিনি বলেছেন, নেতানিয়াহু তার পরিকল্পনার সঙ্গে একমত হয়েছেন। তবে ইসরায়েল সরকার এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি।
কিছু আরব ও মুসলিম দেশও এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কাজ করছে। সূত্র জানায়, গত পাঁচ দিনে ইসরায়েল ও আরব দেশগুলো আলোচনায় চুক্তির খসড়ায় পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে দুইটি প্রধান মতবিরোধ রয়েছে—একটি হলো হামাসকে নিরস্ত্র করার ধারা, যা ইসরায়েল আরও কঠোর ও বাধ্যতামূলক করতে চায়, আরেকটি হলো ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ভূমিকা।
এদিকে, নেতানিয়াহু গাজায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কোনো অংশগ্রহণের তীব্র বিরোধী। রোববার ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এটি তার জন্য 'রেড লাইন'। তিনি আরও বলেন, পরিকল্পনার বিষয়ে আলোচনাগুলো চলছে এবং চুক্তি এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প তার ২১-দফা পরিকল্পনা আরব ও মুসলিম দেশগুলোর নেতাদের সামনে উপস্থাপন করেছেন। পরিকল্পনাটি উইটকফ ও কুশনার তৈরি করেছেন। এটি গত বছরের বিভিন্ন প্রস্তাবের সংমিশ্রণ, যা মার্কিন, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এসেছে। কিছু আলোচনা বাইডেন প্রশাসনের সময় শুরু হলেও তা কার্যকর পরিকল্পনায় রূপ নিতে পারেনি। শেষ কয়েক মাসে কুশনার উইটকফ ও সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের সঙ্গে কাজ করে এই পরিকল্পনাকে এগিয়ে নিয়েছেন।
হামাস রোববার জানিয়েছে, তারা কাতার ও মিশরীয় মধ্যস্থতাকারীদের কাছ থেকে নতুন কোনো প্রস্তাব পায়নি। হামাস বলেছে, তিন সপ্তাহ আগে তাদের নেতাদের ওপর হত্যাচেষ্টার পর আলোচনাগুলো স্থগিত রয়েছে। বিবৃতিতে হামাস জানিয়েছে, 'আমরা যে কোনো প্রস্তাব পেলে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে দায়িত্বশীলভাবে তা বিবেচনা করতে প্রস্তুত।'
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কাতার ও অন্যান্য আরব ও মুসলিম দেশ সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হামাস নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। কর্মকর্তারা বলেন, আরব দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছে, তারা মনে করে হামাস প্রস্তাবে সম্মত হওয়ার জন্য প্রস্তুত হবে।
চুক্তির মূল বিষয়গুলো হলো:
- যুদ্ধবিরতির ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বাকি সব জিম্মি মুক্তি।
- স্থায়ী যুদ্ধবিরতি।
- ধীরে ধীরে গাজা অঞ্চল থেকে ইসরায়েলের সরে আসা।
- ইসরায়েলি হত্যা মামলায় আজীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত প্রায় ২৫০ ফিলিস্তিনি বন্দি ও ৭ অক্টোবরের পর থেকে গাজায় আটক প্রায় ২ হাজার ফিলিস্তিনির মুক্তি।
- গাজায় হামাস ছাড়া নতুন শাসন ব্যবস্থা, যাতে আন্তর্জাতিক ও আরব বোর্ডের সঙ্গে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি থাকবে, এবং নীতিগতভাবে নিরপেক্ষ ফিলিস্তিনিদের 'টেকনোক্রেটিক' সরকার থাকবে।
- নিরাপত্তা বাহিনী, যাতে ফিলিস্তিনি ছাড়াও আরব ও মুসলিম দেশগুলোর সেনা থাকবে।
- আরব ও মুসলিম দেশগুলো থেকে নতুন প্রশাসনের জন্য তহবিল এবং গাজা পুনর্গঠন ও উন্নয়নের জন্য অর্থ সরবরাহ।
- গাজায় নতুন শাসন ব্যবস্থায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের আংশিক অংশগ্রহণ।
- হামাসকে নিরস্ত্র করা ও গাজা থেকে সমস্ত ভারী অস্ত্র ও সুরঙ্গ ধ্বংস করা।
- যারা সহিংসতা ত্যাগ করে হামাসে থাকবে, তাদের ক্ষমা এবং যারা সহিংসতা করবে না তাদের নিরাপদ প্রস্থানের সুযোগ।
- পশ্চিম তীর বা গাজার কোনো অংশে ইসরায়েলের অনধিকার দখল বা সংযুক্তি হবে না।
- ইসরায়েল ভবিষ্যতে কাতারে আবার হামলা করবে না।
- ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের পর ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের বাস্তব সম্ভাবনার পথ তৈরি।
