শক্তিশালী হয়ে উঠছে ইউয়ান, ডলারের আধিপত্যে ভাগ বসাতে শুরু করেছে চীন
চীনের নেতারা এক ঐতিহাসিক সুযোগ দেখতে পাচ্ছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের খামখেয়ালি বাণিজ্য নীতি, বিপুল রাজস্ব ঘাটতি ও যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপের হুমকি—এসব কারণে ডলারের বড় ধরনের ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। জানুয়ারি থেকে বাণিজ্য মানের ভিত্তিতে ডলারের দাম কমেছে ৭ শতাংশ। ১৯৭৩ সালের পর কোনো বছরের শুরুতে ডলারের এত বড় দরপতন হয়নি।
অন্যদিকে নভেম্বরে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর চীনের কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত মুদ্রা ইউয়ানের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও দলে দলে আসছেন। ডলারের বিকল্প খুঁজছে, এমন অনেক দেশের সরকারও একই পথে হাঁটছে।
ইউয়ান নিয়ে এই তুমুল আগ্রহ অবশ্য নতুন নয়। ইউয়ানকে আন্তর্জাতিক মুদ্রায় পরিণত করার আকাঙ্ক্ষাও চীনের পুরনো। এই লক্ষ্যে দেশটি প্রথম উদ্যোগ নেয় ২০০৯ সালে; সে সময় মূলধন নিয়ন্ত্রণের কিছু নিয়ম শিথিল করা হয়েছিল। কিন্তু ২০১৫ সালে সেই উদ্যোগের বেদনাদায়ক সমাপ্তি ঘটে। ওই সময় শেয়ার বাজারে ধস ও মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বেরিয়ে যায়। এর পরপরই মূলধন প্রবাহের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়, যা ইউয়ানের উদীয়মান যাত্রাকে থামিয়ে দেয়।
তবে এবার চীনের কর্মকর্তারা নিশ্চিত করতে চান, যেন এই অগ্রগতি টেকসই হয় এবং মূলধন প্রবাহের ওপর তাদের কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে।
চীনের নেতারা মনে করছেন, ইউয়ান বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতা পেলে তাদের রপ্তানিকারকদের ডলারের দামের ওঠানামা থেকে রক্ষা পাবেন; পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক নিষেধাজ্ঞার হুমকিও ভোঁতা হয়ে যাবে।
কিছু কর্মকর্তা আশা করছেন, বিদেশি সংস্থা ও বিনিয়োগকারীরা চীনের রাষ্ট্রীয় কঠোর নিয়ন্ত্রণকে উপেক্ষা করবেন এবং একসময় হয়তো একে সুবিধাজনক হিসেবেই দেখবেন। গত কয়েক বছরে বছরগুলোতে তারা চমকপ্রদ সাফল্য পেয়েছেন। আন্তর্জাতিক লেনদেনের চালান ও বৈদেশিক ঋণে ইউয়ানের ব্যবহার বেড়েছে। এর সাথে পাল্লা দিয়ে ডলার-বহির্ভূত আর্থিক অবকাঠামোর চোখে পড়ার মতো সম্প্রসারণ ঘটেছে। তবে কর্মকর্তারা বুঝতে পারছেন, বিদেশিদের ইউয়ান ব্যবহার করতে এবং ইউয়ানভিত্তিক সম্পদে বিনিয়োগে উৎসাহিত করার জন্য এখন আরও বড় প্রণোদনা প্রয়োজন।
তাহলে এখন পর্যন্ত চীনের অর্জন কতটুকু? যেকোনো মানদণ্ডেই ইউয়ানের মর্যাদা এখনও কম। বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের অবদান প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হলেও, আন্তর্জাতিক লেনদেনের মাত্র ৪ শতাংশ চীনের মুদ্রায় হয়ে থাকে (যেখানে ডলারের হিস্যা ৫০ শতাংশ)।
বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইউয়ানভিত্তিক সম্পদের পরিমাণ মাত্র ২ শতাংশ (যেখানে ডলার-ভিত্তিক সম্পদের পরিমাণ ৫৮ শতাংশ)।
এই অসামঞ্জস্যের জন্য মূলত দেশ থেকে অর্থ বেরিয়ে যাওয়া ও প্রবেশের ওপর চীনের কঠোর নিয়ন্ত্রণকে দায়ী করা হয়। অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, এই নিয়ন্ত্রণ বলবত থাকলে ইউয়ানকে আন্তর্জাতিক মুদ্রায় পরিণত করা অসম্ভব।
কিন্তু আমেরিকা বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার পরও ডলারের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে কয়েক দশক সময় লেগেছিল। সেই সময়ের নিরিখে দেখলে, চীনের অগ্রগতি বিস্ময়কর দ্রুত। আন্তর্জাতিক লেনদেনে হিস্যা ২০২২ সাল থেকে দ্বিগুণ হয়েছে। এর প্রধান কারণ দেশের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন। চীনের নিজস্ব বাণিজ্যে ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ানো ছিল গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
বর্তমানে চীনের পণ্য ও সেবা বাণিজ্যের ৩০ শতাংশের বেশি নিজস্ব মুদ্রায় সম্পন্ন হয় (যা ২০১৯ সালে ছিল ১৪ শতাংশ)। আর্থিক প্রবাহসহ মোট আন্তঃসীমান্ত আয়ের ৫০ শতাংশের বেশি এখন ইউয়ানে নিষ্পত্তি করা হয়, যা ২০১০ সালে ১ শতাংশেরও কম ছিল।
বেইজিংভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ট্রিভিয়াম চায়না-র ডিনি ম্যাকম্যাহন মনে করেন, চীনের নীতিনির্ধারকরা শেষপর্যন্ত যা চান, তা হলো দেশের ভেতরে ও বাইরে ইউয়ানের একটি স্থিতিশীল প্রবাহ তৈরি করা। এর ফলে দেশের বাইরে ইউয়ানের ব্যবহার বাড়বে, পাশাপাশি বিদেশিদের জন্য এই মুদ্রা পাওয়া সহজ হবে। মে মাসে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো বড় ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে, বাণিজ্য সহায়ক ঋণের অন্তত ৪০ শতাংশ ইউয়ানে দিতে হবে। ইউয়ানের প্রবাহ বাড়াতে কর্মকর্তারা বাণিজ্যিক অংশীদারদের চীনের মুদ্রা গ্রহণে উৎসাহিত করতে চান। এর জন্য একটি বড় আকর্ষণ হলো তাদেরকে ইউয়ানে ঋণ দেয়া।
মে মাসে প্রকাশিত ফেডারেল রিজার্ভের অর্থনীতিবিদদের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২২ সালে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর চীনের ব্যাংকগুলো তাদের নতুন বৈদেশিক ঋণের প্রায় পুরোটাই ডলারের পরিবর্তে ইউয়ানে দিতে শুরু করে (এর আগে মাত্র ১৫ শতাংশ ঋণ ইউয়ানে দেওয়া হতো)। ফলে বকেয়া ইউয়ান ঋণের পরিমাণ তিনগুণ বেড়ে গেছে।
চীন সরকার তার নিজস্ব ব্যালেন্স-শিটের ক্ষেত্রেও একই কৌশল নিচ্ছে। ইউয়ানের আন্তর্জাতিকীকরণের উদ্যোগ শুরুর পর থেকে চীন ৩২টি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাথে ৪.৫ ট্রিলিয়ন ইউয়ান (৬৩০ বিলিয়ন ডলার) মূল্যের মুদ্রা বিনিময় চুক্তি করেছে, যা আইএমএফের সমতুল্য একটি বৈশ্বিক আর্থিক নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করেছে। এই সুবিধার সামান্য অংশই এখন পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, সংকটকালে দেশগুলোকে ইউয়ান পাওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া, যাতে তারা এই মুদ্রায় ঋণ নিতে ও কেনাকাটা করতে আস্থা পায়।
এসবের পাশাপাশি চীন নিজেদের আর্থিক লেনদেনের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাকেও গুছিয়ে নিয়েছে। এর ফলে দেশটি এখন ডলার ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে বিভিন্ন উপায়ে অন্যদের সাথে লেনদেন করতে পারে। এসবের মধ্যে রয়েছে ডিজিটাল ইউয়ান ও ব্যাংক-বহির্ভূত ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা (যেমন এশিয়ায় জনপ্রিয় অ্যাপগুলোর কিউআর কোড)। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সিআইপিএস-এর উদ্ভাবন, যা পশ্চিমা বিশ্বের ব্যাংক-মেসেজিং ব্যবস্থা সুইফট-এর মতোই।
আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক আটলান্টিক কাউন্সিলের জশ লিপস্কি বলেন, চীনের ব্যাংকগুলো যেহেতু সুইফটের বাইরে লেনদেন করতে পারে এবং করছে, তাই আন্তর্জাতিক লেনদেনে ইউয়ানের ভূমিকা সম্ভবত প্রকৃত হিসাবের চেয়ে কম দেখানো হচ্ছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ বেড়ে সারা বিশ্বে ১ হাজার ৭০০-র বেশি ব্যাংক সিআইপিএসে যুক্ত হয়েছে। ২০২৪ সালে লেনদেনের পরিমাণ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্রুতগতিতে বেড়েছে; ৪৩ শতাংশ বেড়ে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭৫ ট্রিলিয়ন ইউয়ান (২৪ ট্রিলিয়ন ডলার)। ৩৩টি দেশে ইউয়ানে লেনদেন নিষ্পত্তির জন্য ক্লিয়ারিং ব্যাংক স্থাপন করা হয়েছে (যার প্রায় সবগুলোই চীনা প্রতিষ্ঠান দ্বারা পরিচালিত)। তুরস্ক ও মরিশাসের মতো কয়েকটি দেশের ব্যাংক এ বছর এতে যোগ দিয়েছে। উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে সিআইপিএস নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের জন্য চীন জুনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে কাজ শুরু করেছে।
গত বছর এমব্রিজ নামক একটি ডিজিটাল মুদ্রা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কয়েক বিলিয়ন ডলারের লেনদেন হয়েছে। এই নেটওয়ার্কটি চীন অন্যান্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাথে মিলে তৈরি করেছে। জানুয়ারিতে একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, অর্থনৈতিকভাবে এই লেনদেনের পরিমাণ এখনও নগণ্য হলেও এটি 'ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের একটি সীমা ইতোমধ্যে অতিক্রম করেছে'। ব্যাংকগুলোকে এমব্রিজের ব্যবহার বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে চীনের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো। এর আকর্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যেমন, আগস্টে জিনজিয়াংয়ের একটি প্রতিষ্ঠান এমব্রিজ ব্যবহার করে তাদের বিদেশি শেয়ারহোল্ডারদের অর্থ দেয়। উল্লেখ্য, এই অঞ্চলে জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহারের অভিযোগে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
এরপর কী? গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে আত্মনির্ভরশীলতার জন্য চীন সরকার অভ্যন্তরীণ নীতির দিকে ঝুঁকলেও এখন তাদের আর্থিক বাজারে বিদেশিদের প্রবেশাধিকার আরও বাড়াতে হবে। দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে (অনশোর মার্কেট) বিদেশিদের জন্য লেনদেনযোগ্য আর্থিক চুক্তির সংখ্যা এ বছর দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে; পাশাপাশি দেশীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য বাড়ানো হয়েছে বিদেশে বিনিয়োগের কোটাও।
আগামী মাসগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ডলারের ওপর আস্থা কমে যাওয়া এবং সহায়ক সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিবেশ চীনের এই প্রচেষ্টাকে আরও বেগবান করবে। শেয়ারবাজারের ঊর্ধ্বগতি বিদেশিদের ইউয়ানভিত্তিক সম্পদ ধরে রাখতে আর্থিক প্রণোদনা দিয়েছে। সুদহার হ্রাস ও মূল্যস্ফীতি কমে যাওয়ায় অফশোর বাজারে (চীনের বাইরের বাজার) ইউয়ানে ঋণ নেওয়ার খরচ ২ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, যা ২০১৩ সালের পর সর্বনিম্ন। বিদেশি প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন কোম্পানি এ বছর রেকর্ড পরিমাণ 'ডিম সাম' ইউয়ান বন্ড ইস্যু করার পথে রয়েছে।
চীনের পরবর্তী নিরাপদ পদক্ষেপ হলো বন্ধু দেশগুলোর জন্য তার অভ্যন্তরীণ বাজার খুলে দেওয়া। জুলাইয়ে হাঙ্গেরি প্রায় ৫ বিলিয়ন ইউয়ানের 'পান্ডা বন্ড' ইস্যু করেছে। ৮ সেপ্টেম্বর ফিনান্সিয়াল টাইমস জানায়, রাশিয়ার জ্বালানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইউয়ানে বন্ড ছাড়ার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কেনিয়া শিগগিরই চীনের কাছে থাকা তাদের ডলারের ঋণকে ইউয়ানে রূপান্তর করতে পারে। এদিকে ব্রাজিল নতুন বন্ড ছাড়ার কথা ভাবছে; পাকিস্তানি কর্মকর্তারা সম্ভাব্য ঋণদাতাদের আকৃষ্ট করতে বেইজিং সফর করেছেন।
এতসব তৎপরতার পরও চীনা কর্মকর্তারা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছেন। জুনে এক ভাষণে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর প্যান গংশেং ঘোষণা দেন, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা 'বহুমেরুকেন্দ্রিক' হয়ে উঠছে; ভবিষ্যতে ডলারকে ইউয়ানের মতো অন্যান্য মুদ্রার সাথে প্রতিযোগিতা করতে হবে। চীনের আশা, এই প্রতিযোগিতার ফলে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে দেশটিকে কম বেগ পেতে হবে এবং তারা মূলধন প্রবাহ ও বিনিময় হার উদারীকরণের চাপও প্রতিরোধ করতে পারবে। শেষপর্যন্ত হয়তো ইউয়ান 'চীনা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত বৈশ্বিক মুদ্রা হয়ে উঠবে।
