রাজ পরিবারকে অপমানের অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি পেলেন থাইল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রা

থাইল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিতর্কিত ধনকুবের থাকসিন সিনাওয়াত্রাকে রাজতন্ত্র অবমাননার অভিযোগ থেকে খালাস দিয়েছেন ব্যাংককের একটি আদালত।
দশ বছর আগে দক্ষিণ কোরিয়ার এক সংবাদপত্রে দেয়া সাক্ষাৎকারকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে এ মামলা হয়েছিল। দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ ১৫ বছরের কারাদণ্ড হতে পারত তার।
থাইল্যান্ডের আইন অনুযায়ী রাজপরিবারকে অবমাননা বা হুমকি দেওয়া গুরুতর অপরাধ। তবে সমালোচকরা বলেন, এ আইন প্রায়ই ভিন্নমতাবলম্বী বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
রায় ঘোষণার পর থাকসিনের আইনজীবী উইন্যাত চারমন্ট্রি সাংবাদিকদের জানান, আদালতে রায় শোনার পর তিনি হাসিমুখে আইনজীবীদের ধন্যবাদ জানান এবং বলেন, এখন তিনি দেশের জন্য কাজ করতে পারবেন।
থাকসিনের বিরুদ্ধে এই মামলা প্রথম দায়ের হয় ২০১৬ সালে সামরিক সরকারের আমলে, তখন তিনি নির্বাসনে ছিলেন। গত বছর দেশে ফেরার পর মামলা পুনরায় চালু করা হয়।
সাক্ষাৎকারে থাকসিন বলেছিলেন, তার বোন ইয়িংলাককে অপসারণ করা ২০১৪ সালের সামরিক অভ্যুত্থান 'প্রাসাদের কিছু মানুষ' ও রাজা-পরামর্শ কাউন্সিলের সদস্যদের ইন্ধনে ঘটেছে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। তবে আইন অনুযায়ী সরাসরি রাজা, রানি, উত্তরাধিকারী বা রিজেন্টকে অপমান করলেই অপরাধ গণ্য হয়। ফলে বিচারকরা বলেন, তিনি কারও নাম উল্লেখ না করায় অভিযোগ টিকবে না।
থাইল্যান্ডে এ আইন অতিরিক্তভাবে প্রয়োগের নজির রয়েছে। কখনও রাজপরিবারের কুকুর বা অতীত শতকের কোনও রাজার সমালোচনার কারণেও মামলা হয়েছে। সম্প্রতি করোনাকালীন বাজেট নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক ব্যানার রাজপ্রতিমার পাশে ঝোলানোর অপরাধে এক তরুণীকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এই আইন ক্রমেই রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। অনেকেই মনে করেন, থাকসিনের বিরুদ্ধেও একই কৌশল ব্যবহার হচ্ছিল।
রায়টি এমন সময়ে এলো, যখন থাকসিনের মেয়ে পায়থংতার্ন সিনাওয়াত্রা—যিনি দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে তরুণ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন—আদালতে স্থগিত অবস্থায় রয়েছেন। সংবিধান আদালতের রায়ে তিনি পদ হারাতে পারেন বলে শঙ্কা রয়েছে।
২০০৬ সালের অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দীর্ঘ ১৫ বছরের নির্বাসন শেষে ২০২৩ সালে দেশে ফেরেন থাকসিন। তখনই ধারণা করা হয়েছিল, রক্ষণশীল শক্তি ও তার মধ্যে কোনও সমঝোতা হয়েছে। ফলে তার দল ফিউ থাই নির্বাচনে দ্বিতীয় হলেও সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়।
যদিও থাকসিন সবসময় সমঝোতার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, বাস্তবে তিনি এখনও দলের প্রধান অর্থ যোগানদাতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে বিবেচিত হন। তার পছন্দের প্রার্থী স্রেত্থা থাভিসিনকে আদালত অযোগ্য ঘোষণা করার পর কন্যা পায়থংতার্ন প্রধানমন্ত্রী হন।
'বাবার মেয়ে' হিসেবে পরিচিত পায়থংতার্ন প্রকাশ্যে বলেন, বাবার পরামর্শ তিনি নেবেন। ক্ষমতা নেয়ার পর থাকসিন 'থাইল্যান্ডের ভিশন' ঘোষণা করেন, যেখানে ক্যাসিনো বৈধকরণের মতো বিতর্কিত প্রস্তাব ছিল। পরে তা সরকারি নীতিতেও যুক্ত হয়।
তবে বিরোধীরা অভিযোগ তোলে, দেশ এখন 'দ্বৈত নেতৃত্বে' চলছে। হুন সেনের সঙ্গে থাকসিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও সীমান্ত ইস্যুতে সরকারের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এরই মধ্যে হুন সেন ফাঁস করা একটি ফোনালাপে পায়থংতার্নকে সেনাপ্রধানকে সমালোচনা করতে শোনা যায়। এই ঘটনায় সংবিধান আদালত তাকে আপাতত স্থগিত করেছে।
থাইল্যান্ডের রাজপরিবার ও সেনাবাহিনীর ঘনিষ্ঠ ক্ষমতাশালী মহল এখন কী ভূমিকা নেবে, তার ওপরই নির্ভর করছে থাকসিন ও তার কন্যার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।