যুদ্ধবিমান আর লাল গালিচায় পুতিনকে ট্রাম্পের অভ্যর্থনা

শুক্রবার আলাস্কায় বিকেলের দিকে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের প্রেসিডেন্ট বিমান থেকে নেমে আসেন। একটি সামরিক ঘাঁটির ইস্পাত-রঙা বিশাল চত্বর জুড়ে পাতা ছিল লাল গালিচা, যা ধরে তারা এগিয়ে যান।
এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো মার্কিন মাটিতে পা রাখেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। চারটি আমেরিকান যুদ্ধবিমানের একটি বিশেষ দল তাকে আকাশপথে নিয়ে আসেন। লাল গালিচার প্রান্তে তার জন্য অপেক্ষা করছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। পুতিন তার দিকে এগিয়ে গেলেন। এদিকে সফল আয়োজক ট্রাম্প এই মুহূর্তের নাটকীয়তা এবং সবার মনোযোগ আকর্ষণ করার বিষয়টি বেশ উপভোগ করছিলেন বলেই মনে হলো।
আর তাই পুতিন তার কাছে পৌঁছানোর আগেই তিনি একবার, দুইবার, তিনবার হাততালি দিলেন।
লাল গালিচায় এই উষ্ণ অভ্যর্থনা একটি বড় প্রশ্নের উত্তর দেয়নি—তারা দুজন ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে কোনো শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবে কি না। অবশ্য ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে ছাড়া কোনো চুক্তি সম্ভবও নয়। তাছাড়া তাকে এই বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এমনকি যখন ট্রাম্প ও পুতিন আলোচনার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন, তখনও রুশ বাহিনী তার দেশে হামলা চালিয়ে যাচ্ছিল।
কিন্তু এই অভ্যর্থনা একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে। আর তা হলো, পুতিনের জন্য একটি যোগ্য সংবর্ধনা আয়োজনকে ট্রাম্প কতটা গুরুত্ব দিয়েছিলেন। পুতিন এমন একজন নেতা, যাকে ইউক্রেনে আগ্রাসন চালানোর জন্য পশ্চিমা বিশ্বের বেশিরভাগ দেশই এড়িয়ে চলে। এই আগ্রাসনে লাখ লাখ মানুষ নিহত হন।
লাল গালিচা ধরে হাঁটার সময় ট্রাম্প সামনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তিনি দুহাত প্রসারিত করে এমনভাবে ইশারা করছিলেন, যেন পাশের মঞ্চ এবং অপেক্ষারত সাংবাদিকদের বিশাল বহরের আকার নিয়ে গর্ব করছেন। মনে হচ্ছিল, ট্রাম্প মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আমেরিকার সবচেয়ে দৃশ্যমান (এবং সবচেয়ে ভীতিকর) শক্তির দিকগুলো প্রদর্শন করতে চাইছেন। যেন হতে যাচ্ছে এক সামরিক শক্তি প্রদর্শনী।
অপেক্ষারত মঞ্চের দিকে হেঁটে যাওয়ার সময় দুজনেই থামলেন। তাদের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল একটি বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান। পুতিন বারবার উপরের দিকে তাকাচ্ছিলেন। এই স্টিলথ বোমারু বিমানগুলো ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালাতে সক্ষম। যেমনটা গত জুনে মার্কিন বাহিনী ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালানোর সময় ব্যবহার করেছিল। বিমানটি তীক্ষ্ণ শব্দে আকাশ চিরে উড়ে গেল, যা ছিল মার্কিন শক্তির এক বার্তা এবং নিচের জমকালো আয়োজনের আড়ালে এক কঠিন বাস্তবতার ছোঁয়া।
আলাস্কার এলমেনডর্ফ-রিচার্ডসন যৌথ ঘাঁটিতে এই আয়োজন হয়, যা স্বল্প সময়ে আয়োজিত এই বৈঠকের জন্য তাড়াহুড়ো করে বেছে নেওয়া হয়। ট্রাম্প ও পুতিন নীল রঙের একটি মঞ্চে উঠলেন, যেখানে লেখা ছিল 'আলাস্কা ২০২৫'। তবে এই লেখাটি দিয়ে কেউই কী অর্জন করতে চান, তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না। এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলাসহ বেশ কয়েকদিন ধরে হঠাৎ হঠাৎ সংবাদমাধ্যমের সামনে আসার পর ট্রাম্প এদিন চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলেন।
সাংবাদিকরা চিৎকার করে প্রশ্ন করতে শুরু করলেন। গোলমালের মধ্যে একটি পরিষ্কার এবং জোরালো প্রশ্ন ভেসে এল।
এবিসি নিউজের একজন সাংবাদিক চিৎকার করে বললেন, "প্রেসিডেন্ট পুতিন, আপনি কি বেসামরিক মানুষ হত্যা বন্ধ করবেন?" রাশিয়ায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করা পুতিন এ ধরনের প্রশ্ন শুনতে অভ্যস্ত নন। তার মুখে ফুটে উঠল বিরক্তি আর ব্যঙ্গের এক মিশ্র অভিব্যক্তি এবং তিনি কানের কাছে হাত নিয়ে এমন ভঙ্গি করলেন, যেন তিনি শুনতে পাচ্ছেন না। (উল্লেখ্য, পুতিন ইংরেজি বলতে পারেন)।
এই মুহূর্তে ট্রাম্প তার অতিথিকে মঞ্চের পাশ দিয়ে অপেক্ষারত রাষ্ট্রপতির লিমজিনের দিকে নিয়ে গেলেন। তারা কয়েকটি এফ-২২ যুদ্ধবিমানের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেন, যেগুলো এই ঘাঁটি থেকেই রুশ আগ্রাসনের হুমকি মোকাবেলায় ব্যবহৃত হয়। এরপর তারা দুজনই মার্কিন প্রেসিডেন্টের 'দ্য বিস্ট' নামে পরিচিত বিশেষ সাঁজোয়া গাড়িতে উঠে বসলেন এবং কয়েক মিনিটের জন্য একান্তে কথা বললেন। এটি ছিল একটি অস্বাভাবিক ঘটনা, যা সাধারণ প্রটোকলের অংশ ছিল না। তবে আজকাল ট্রাম্প যা বলেন, সেটাই যেন প্রটোকল। পুতিনের নিজের লিমজিনটি টারমাকে ইঞ্জিন চালু অবস্থায় খালি পড়ে রইল।
ঘাঁটির ভেতরের একটি কক্ষে তারা দুজন একটি নীল ব্যানারের সামনে বসলেন, যেখানে লেখা ছিল 'শান্তির খোঁজে'। এটি একটি অস্পষ্ট বিষয় ছিল, কারণ ট্রাম্প নিজেও সতর্ক করেছেন যে আলোচনার শেষে হয়তো এমন কোনো চুক্তি নাও হতে পারে।
নিজেদের পররাষ্ট্র নীতি উপদেষ্টাদের পাশে নিয়ে দুই নেতা চুপচাপ বসেন। পুতিন বসেন পা ছড়িয়ে এবং হাত গুটিয়ে। রুশ নেতার ধূসর চোখ ছিল নিচের দিকে, কেবল সাংবাদিকরা সামনে ধাক্কাধাক্কি শুরু করলে তিনি মুখ তুলে তাকাচ্ছিলেন। অন্যদিকে ট্রাম্প ক্যামেরা, সাংবাদিক আর আলোর সারির দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন।
এটি এমন একটি দৃশ্য যা তিনি অগণিতবার দেখেছেন। কিন্তু এই মুহূর্তে, এই অনুষ্ঠানের মূল প্রযোজক হয়েও প্রেসিডেন্টের কিছুই বলার নেই যেন। তিনি এই যুদ্ধ শেষ করার একটি ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে এমন একজন নেতার সাথে আলোচনায় যিনি ইউক্রেনের ভূখণ্ডকে নিজের বলে মনে করেন । এমনকি যুদ্ধ থামানোর আলোচনার দিনেও ইউক্রেনীয়দের ওপর রুশ বাহিনীর বোমাবর্ষণ ছিল অব্যাহত। আলোচনা শুরুর সময় প্রেসিডেন্ট তার স্বভাববিরুদ্ধভাবে চুপচাপই রইলেন।