রাশিয়াকে পশ্চিম সম্মান করলে ইউক্রেনের পর আর কোনো যুদ্ধ হবে না: পুতিন
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, রাশিয়াকে যদি যথাযথ সম্মান দেখানো হয়, তবে ইউক্রেনের পর আর কোনো যুদ্ধ হবে না। একই সঙ্গে মস্কো ইউরোপীয় দেশগুলোতে হামলার পরিকল্পনা করছে—এমন দাবিকে তিনি 'বাজে কথা' বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা ধরে চলা এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে বিবিসির স্টিভ রোজেনবার্গের প্রশ্নের জবাবে পুতিন এই মন্তব্য করেন। রোজেনবার্গ জানতে চেয়েছিলেন, নতুন করে কোনো 'বিশেষ সামরিক অভিযান' (ইউক্রেন অভিযানের রুশ নাম) চালানো হবে কি না।
উত্তরে পুতিন জোর দিয়ে বলেন, 'যদি আপনারা আমাদের সম্মান করেন, আমাদের স্বার্থের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন—যেমনটা আমরা সবসময় আপনাদের প্রতি দেখানোর চেষ্টা করেছি—তবে আর কোনো অভিযান হবে না।'
এর আগে চলতি মাসের শুরুতে পুতিন বলেছিলেন, ইউরোপের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর কোনো পরিকল্পনা রাশিয়ার নেই। তবে ইউরোপ চাইলে রাশিয়া 'এই মুহূর্তেই' প্রস্তুত।
বিবিসির রুশ সম্পাদকের প্রশ্নের উত্তরে পুতিন ভবিষ্যতে আর কোনো রুশ আগ্রাসন না হওয়ার জন্য আরেকটি শর্ত জুড়ে দেন। তিনি বলেন, 'যদি ন্যাটোর পূর্বমুখী সম্প্রসারণের মাধ্যমে আপনারা আমাদের সঙ্গে প্রতারণা না করেন, যেমনটা অতীতে করেছেন, তবেই আর যুদ্ধ হবে না।'
পুতিন দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছেন যে, ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের আগে পশ্চিমা নেতারা মিখাইল গর্বাচেভকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ন্যাটো তা রক্ষা করেনি। যদিও গর্বাচেভ পরে এমন প্রতিশ্রুতির কথা অস্বীকার করেছিলেন।
মস্কোর একটি হলে আয়োজিত এই 'ডাইরেক্ট লাইন' অনুষ্ঠানে সাধারণ মানুষ ও সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন পুতিন। এ সময় তিনি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, প্রবৃদ্ধির পতন এবং আগামী ১ জানুয়ারি থেকে ভ্যাট ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২২ শতাংশ করার মতো অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো নিয়েও কথা বলেন।
বড় পর্দায় সাধারণ মানুষের কিছু সমালোচনামূলক মন্তব্যও দেখা যায়, যেখানে একজন লিখেছেন— 'সবকিছুর এই পাগলাটে দাম বাড়া বন্ধ করুন!'
তবে ক্রেমলিন বরাবরের মতোই অর্থনীতির সক্ষমতা তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। পুতিন যখন কথা বলছিলেন, তখনই রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার কমিয়ে ১৬ শতাংশ করার ঘোষণা দেয়।
প্রায় চার বছর ধরে চলা ইউক্রেন যুদ্ধ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। পুতিন আবারও দাবি করেন, তিনি ইউক্রেন যুদ্ধ 'শান্তিপূর্ণভাবে' শেষ করতে 'প্রস্তুত ও ইচ্ছুক'। তবে আপসের কোনো লক্ষণ তিনি দেখাননি। তিনি ২০২৪ সালের জুনে দেওয়া তার শর্তগুলোর পুনরাবৃত্তি করেন। এর মধ্যে রয়েছে—রাশিয়া আংশিক দখল করা চারটি অঞ্চল থেকে ইউক্রেনীয় সেনাদের প্রত্যাহার এবং কিয়েভকে ন্যাটোর সদস্য হওয়ার প্রচেষ্টা বাদ দেওয়া।
পুতিন দাবি করেন, ইউক্রেনের ফ্রন্ট লাইনে রুশ বাহিনী এগিয়ে যাচ্ছে। গত সপ্তাহে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির কুপিয়ানস্ক সফরের বিষয়টিকেও তিনি উপহাস করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে পুতিন ইউক্রেনে নতুন নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন। তিনি প্রস্তাব দেন, ভোটগ্রহণ চলাকালে তিনি ইউক্রেনে বোমা হামলা বন্ধ রাখবেন। এনবিসির সাংবাদিক কেইর সিমন্স ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যানের দায়ভার নিয়ে প্রশ্ন করলে পুতিন ট্রাম্পের 'আন্তরিক' প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন। তবে তিনি বলেন, রাশিয়া নয়, পশ্চিমারাই চুক্তিতে বাধা দিচ্ছে।
তিনি বলেন, 'বল এখন আমাদের পশ্চিমা প্রতিপক্ষের কোর্টে। মূলত কিয়েভ সরকারের নেতা এবং তাদের ইউরোপীয় পৃষ্ঠপোষকদের হাতে।'
বিবিসির সাংবাদিককে তিনি বলেন, 'আমরা আপনাদের সঙ্গে—যুক্তরাজ্য, ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। তবে তা হতে হবে সমানে সমান এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে।'
অনুষ্ঠানের শেষের দিকে বন্ধুত্ব, ধর্ম ও প্রেম নিয়ে দ্রুত কিছু প্রশ্নের উত্তর দেন পুতিন। তিনি জানান, তিনি 'প্রথম দর্শনে প্রেমে' বিশ্বাস করেন এবং বর্তমানে তিনি নিজেও প্রেমে পড়েছিলেন। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি রুশ প্রেসিডেন্ট।
