কী এই 'দনবাস', কেন এ অঞ্চলের দখল নিতে এতটা মরিয়া পুতিন?
যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইউক্রেন—এই তিন পক্ষ সচরাচর কোনো বিষয়েই একমত হতে পারে না। তবে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর এই প্রথম দেশ তিনটির প্রতিনিধিরা সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে এক ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে বসেন। সেখানে একটি বিষয়ে অন্তত তারা সবাই একমত হয়েছেন; আর তা হলো—সংকট সমাধানের পথে এখন একমাত্র বাধা কেবল একটি ইস্যু।
সেই অমীমাংসিত বিষয়টি হলো ইউক্রেনের ভূখণ্ড, বিশেষ করে দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় 'দনবাস' এলাকা। তবে বৈঠকে যোগ দেওয়ার আগে তিন পক্ষের প্রতিনিধিদের দেওয়া বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই সমস্যার সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা আপাতত খুবই কম।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, 'সবকিছুর মূলে রয়েছে আমাদের দেশের পূর্বাঞ্চল, মূল লড়াইটা আসলে আমাদের ভূখণ্ড নিয়ে।' কিয়েভের নিয়ন্ত্রণে থাকা দনবাসের অংশগুলো ছেড়ে দেওয়ার জন্য রাশিয়া দীর্ঘ দিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছিল। জেলেনস্কি সরাসরি সেই দাবি নাকচ করে দিয়েছেন।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছানোর কথা বললেও জেলেনস্কি গত বৃহস্পতিবার আবারও স্পষ্ট করেছেন, ইউক্রেন তাদের ভূখণ্ডের কোনো অংশই রাশিয়ার হাতে ছেড়ে দিতে প্রস্তুত নয়।
অন্যদিকে, ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে বৈঠকের পর ক্রেমলিনের উপদেষ্টা ইউরি উশাকভও জানিয়ে দিয়েছেন, রাশিয়া এ বিষয়ে কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, 'আঞ্চলিক ইস্যু' সমাধান না হওয়া পর্যন্ত কোনো দীর্ঘমেয়াদী সমঝোতা সম্ভব নয়। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত রাশিয়া 'রণক্ষেত্রে' তাদের লক্ষ্য অর্জন অব্যাহত রাখবে বলেও হুমকি দিয়েছেন তিনি।
তবে ইউক্রেনের বর্তমান যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা দনবাস আসলে কী? কেন এই অঞ্চলটি দখল করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন? দনবাসের গুরুত্ব এবং এর পেছনের ইতিহাস নিয়ে একটি বিশ্লেষণ।
ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় দুই প্রদেশ দোনেৎস্ক ও লুহানস্ককে একত্রে বলা হয় 'দনবাস'। খনিজ কয়লায় সমৃদ্ধ এই অঞ্চলটি একসময় ছিল ইউক্রেনের শিল্পের প্রাণকেন্দ্র। বড় বড় ইস্পাত কারখানা এবং শিল্পকারখানার কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের বড় ক্ষেত্র ছিল এটি।
নদী ও কৃত্রিম খালের মাধ্যমে এই অঞ্চলের সঙ্গে আজভ সাগরের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। শিল্প ছাড়াও কৃষিকাজে দনবাস বেশ উর্বর। সেই সঙ্গে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে খনিজ সম্পদের মজুদ।
পুতিন কেন দনবাস চান?
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কখনোই আড়াল করেননি যে তিনি ইউক্রেনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে মানতে নারাজ। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর ইউক্রেন যে সার্বভৌমত্ব পেয়েছিল, পুতিন বারবারই তাকে অস্বীকার করে আসছেন।
পুতিনের দাবি, ইউক্রেন এবং ইউক্রেনীয়রা আদতে 'ঐতিহাসিক রাশিয়ার' অংশ। কোনো প্রমাণ ছাড়াই তিনি বারবার অভিযোগ করেছেন যে, কিয়েভ কর্তৃপক্ষ ইউক্রেনের রুশ ভাষাভাষী মানুষের ওপর 'গণহত্যা' চালাচ্ছে। মূলত এই যুক্তিতেই তিনি দেশটিতে সামরিক অভিযান শুরু করেন।
ঐতিহাসিকভাবে দনবাস হলো ইউক্রেনের সবচেয়ে বেশি রুশ প্রভাবিত অঞ্চল। এখানকার বড় একটি অংশ রুশ ভাষায় কথা বলে। ২০১৪ সালে ইউক্রেনকে অস্থিতিশীল করা এবং দখলের যে লক্ষ্য পুতিন নিয়েছিলেন, তার শুরুটাও হয়েছিল এই দনবাস থেকেই।
সংঘাতের শুরু যেভাবে
২০১৪ সালে রাশিয়ার বিশেষ বাহিনী কোনো ধরনের পরিচয়চিহ্ন ছাড়াই ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপদ্বীপ ক্রিমিয়া দখল করে নেয়। এরপর সেটি অবৈধভাবে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
একই সময়ে দনবাস অঞ্চলে রুশপন্থি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে মদত দিতে শুরু করে মস্কো। রাশিয়ার সহায়তায় বিচ্ছিন্নতাবাদীরা লুহানস্ক ও দোনেৎস্কের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। তখন ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী মানসিকভাবে ও সামরিকভাবে এই পরিস্থিতির জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না। সেই থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাত এখন এক পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপ নিয়েছে।
জেলেনস্কি বারবার একটি বিষয়েই জোর দিচ্ছেন—দেশের অখণ্ডতা নিয়ে কোনো আপস করা হবে না। জনমত জরিপগুলো বলছে, ইউক্রেনের সাধারণ মানুষও তাদের ভূখণ্ড রাশিয়ার হাতে ছেড়ে দেওয়ার বিপক্ষে। এর বাইরে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ীও সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে অন্য কোনো দেশের ভূখণ্ড দখল করে নেওয়া সম্পূর্ণ অবৈধ।
তবে যুদ্ধের ভয়াবহ রক্তক্ষয় থামাতে কিয়েভ এবং তাদের ইউরোপীয় মিত্ররা আপাতত একটি বিকল্প পথ খুঁজছে। সেটি হলো—যুদ্ধের বর্তমান অবস্থাকে মেনে নিয়ে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছানো। এর অর্থ হলো, এখন যে পক্ষ যে অবস্থানে আছে, সেখানে লড়াই থামিয়ে দেওয়া। এতে ইউক্রেনকে আপাতত তাদের হারানো ভূখণ্ড উদ্ধারের আশা ত্যাগ করতে হতে পারে।
দনবাসের বাকি অংশ হারানো ইউক্রেনের জন্য হবে এক বিশাল নিরাপত্তা ঝুঁকি। কারণ, এই অঞ্চলটি ইউক্রেনের 'প্রতিরক্ষা দুর্গ' হিসেবে পরিচিত। এখানকার শিল্পশহর, উন্নত রেলপথ ও সড়কপথগুলো ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর রসদ সরবরাহের মূল ভিত্তি বা মেরুদণ্ড।
কিয়েভ দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে এই এলাকাটিকে সুরক্ষিত করার জন্য বিপুল বিনিয়োগ ও কাজ করেছে। তাই দনবাস হাতছাড়া হওয়া মানে পুরো পূর্ব ইউক্রেন রুশ বাহিনীর জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাওয়া।
আলোচনার টেবিলে কী আছে?
আবুধাবিতে চলমান ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের বিস্তারিত এখনো আড়ালেই রয়েছে। তবে জেলেনস্কি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে সেখানে সংকটের বিভিন্ন সমাধান নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
গত ডিসেম্বরে জেলেনস্কি জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবটি হলো—দনবাসের যে অংশগুলো এখনো ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেখানে একটি 'মুক্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল' গঠন করা। বিনিময়ে ওই এলাকাগুলো থেকে ইউক্রেন তাদের সেনা সরিয়ে নেবে এবং তার বদলে তাদের নিরাপত্তার শক্ত নিশ্চয়তা দেওয়া হবে।
তবে ওয়াশিংটন এই প্রস্তাব নিয়ে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ খোলেনি। অন্যদিকে, রাশিয়ার পক্ষ থেকেও নমনীয় হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ক্রেমলিনের উপদেষ্টা উশাকভের বক্তব্য অনুযায়ী, ভূখণ্ডগত দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত মস্কো কোনো চুক্তিতে আসার পক্ষে নয়।
তবে এসবকিছুর মাঝে রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনের অঞ্চলগুলোতে মানুষের জীবন কেমন কাটছে? আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, সংবাদমাধ্যম সিএনএন এবং দখলদারিত্ব থেকে পালিয়ে আসা ব্যক্তিদের ভাষ্যমতে, রুশ অধিকৃত এলাকায় চলছে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন।
সেখানে নির্বিচারে সাধারণ মানুষকে আটক, গুম, নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার মতো অসংখ্য অভিযোগ উঠেছে রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে। কেড়ে নেওয়া হয়েছে নাগরিকদের নূন্যতম অধিকারও। যদিও ক্রেমলিন এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে, তবে এর সপক্ষে রয়েছে জোরালো প্রমাণ।
গত নভেম্বরে প্রকাশিত জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রুশ কর্তৃপক্ষ দখলকৃত এলাকায় সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো চরমভাবে ক্ষুণ্ন করছে। তারা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের তোয়াক্কা করছে না বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অধিকৃত দনবাসের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তাদের ওপর নানামুখী চাপ সৃষ্টি করছে রুশ কর্তৃপক্ষ। টিকে থাকার জন্য তাদের জোর করে রাশিয়ার পাসপোর্ট নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। যারা এই পাসপোর্ট নিতে অস্বীকার করছেন, তারা ঘরবাড়ি হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছেন।
সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে শিক্ষা ব্যবস্থায়। অভিযোগ রয়েছে, স্কুল ও বিশেষ 'পুনঃশিক্ষা ক্যাম্পে' ইউক্রেনীয় শিশুদের রুশ আদর্শে 'মগজ ধোলাই' করা হচ্ছে। কেউ যদি রাশিয়ার এই শাসনের বিরুদ্ধে সামান্য প্রতিবাদও করে, তবে তার ওপর নেমে আসছে চরম সহিংসতা।
