ইরান যুদ্ধ পুতিনের জন্য ‘শাপে বর’, আবার কঠিন পরিস্থিতিতেও ফেলেছে তাকে
'আমরা এই যুদ্ধ শুরু করিনি। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অধীনে আমরাই এর ইতি টানছি।'
গত ২ মার্চ মার্কিনীদের উদ্দেশে এমনই বার্তা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথ। রাশিয়া-বিশেষজ্ঞদের কানে এই সুর অত্যন্ত পরিচিত। কয়েক বছর আগে ইউক্রেন আক্রমণের পর ভ্লাদিমির পুতিনও ঠিক একই সুরে রুশদের বলেছিলেন, 'এই তথাকথিত যুদ্ধ আমরা শুরু করিনি। বরং আমরাই এটা শেষ করার চেষ্টা করছি।'
পুতিনের মুখের বুলি ইংরেজি ভাষায় ফিরতে দেখেই সম্ভবত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সংঘাতে সংযত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে রাশিয়া। অবশ্য দীর্ঘদিনের মিত্র ইরানকে সাহায্য করার মতো ক্ষমতাও খুব সম্ভব এই মুহূর্তে রাশিয়ার নেই। তবে সেই সুযোগ থাকলেও পুতিন তা কতটা চাইতেন, সেটা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। কারণ পুতিনের কাছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করাটাই সম্ভবত এখন সবথেকে বেশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো, এখন ইরানের আয়াতুল্লাহ খামেনি—যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপে মাত্র দু-মাসের ব্যবধানে দুই বন্ধুকে হারালেন পুতিন। তা সত্ত্বেও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট মেপে পা ফেলছেন।
খামেনির মৃত্যুর পর পুতিনের প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল বেশ সীমিত—ক্রেমলিনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি সংক্ষিপ্ত শোকবার্তা। সেখানে এই ঘটনাকে 'মানবিক নৈতিকতা ও আন্তর্জাতিক আইনের নিষ্ঠুর লঙ্ঘন' বলা হলেও দায়ী কারোর নামোল্লেখ করা হয়নি। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চিরাচরিত আক্রমণাত্মক মেজাজে বিবৃতি দিলেও ক্রেমলিন কার্যত দূরত্ব বজায় রেখেছে।
পুতিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, 'এটা আমাদের যুদ্ধ নয়। শুনতে নিষ্ঠুর মনে হলেও এটাই বাস্তব যে, আমাদের নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতেই আমরা দায়বদ্ধ।'
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের সামরিক সম্পর্ক বিশেষ কাজে আসেনি। এ পর্যন্ত সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সহায়তা হলো কিছু গোয়েন্দা তথ্য আদানপ্রদান। খবরে দাবি করা হয়েছে, ইরানের ড্রোন ও মিসাইল হামলার টার্গেট বাছাই করতে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছে রাশিয়া।
আমেরিকান কর্মকর্তাদের দাবি, বেশ কিছু আমেরিকান যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমানসহ অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামের অবস্থান তেহরানকে জানিয়েছে মস্কো। ইরানের প্রতি রাশিয়ার এই ধারাবাহিক সমর্থন বা দুই সরকারের মধ্যে গোপন যোগাযোগ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে পিট হেগসেথ বলেছেন, তিনি এ নিয়ে চিন্তিত নন।
রাশিয়ার দেওয়া সামরিক সরঞ্জাম খুব সম্ভব বিশেষ কাজে আসেনি। গত দশকের মাঝামাঝি সময়ে ইরানকে এস-৩০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়েছিল মস্কো। পরে প্রশিক্ষণ বিমান, আক্রমণকারী হেলিকপ্টার, সাঁজোয়া যান ও ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্রও বিক্রি করা হয়।
সম্প্রতি ইরানের কাছে কাঁধে বহনযোগ্য মিসাইল ভেরবা বিক্রির চুক্তি করে রাশিয়া। এ মিসাইল ড্রোন বা কম উচ্চতায় ওড়া বিমান ধ্বংস করতে সক্ষম। গত ডিসেম্বরের চুক্তি অনুযায়ী, তিন বছরে ৫০০টি ভেরবা ইউনিট ও ২ হাজার ৫০০টি মিসাইলের জন্য তেহরানের প্রায় ৫৮০ মিলিয়ন দেওয়ার কথা ছিল। তবে সেই সরঞ্জাম আদৌ ইরানে পৌঁছেছে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
অন্যদিকে ইউক্রেন যুদ্ধে ড্রোন ও গোলাবারুদ জুগিয়ে রাশিয়াকে সাহায্য করেছে ইরান। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সই হওয়া কৌশলগত চুক্তি অনুসারে, দুই দেশ গোয়েন্দা তথ্য আদানপ্রদানে সম্মত হলেও একে অপরকে সামরিক সুরক্ষা দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা রাখেনি। নজরদারি ও বিক্ষোভ দমনের প্রযুক্তিও আদানপ্রদান করেছে দেশ দুটি।
গত জুনের ১২ দিনের যুদ্ধ ও চলতি মাসের ধারাবাহিক ইসরায়েলি ও মার্কিন হামলায় রুশ সরঞ্জামসহ ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বড় অংশই ধ্বংস হয়ে গেছে। আকাশপথে আমেরিকা বা ইসরায়েলের হামলা রোখার ক্ষমতা ইরানের খুব কম। এ পর্যন্ত একটিও শত্রুবিমান তারা গুলি করে নামাতে পারেনি।
গত ৪ মার্চ একটি রুশ নির্মিত ইয়াক-১৩০ প্রশিক্ষণ বিমানকে সহজেই ধ্বংস করে ইসরায়েলি এফ-৩৫। প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহৃত এই উড়োজাহাজটিকে যুদ্ধের প্রয়োজনে লড়াই করতে নামিয়েছিল ইরান।
এই পরিস্থিতিতে আমেরিকাকে চটিয়ে তেহরানকে নতুন করে মিসাইল বা গোলাবারুদ জোগানোর ইচ্ছে নেই পুতিনের। তাছাড়া ইউক্রেন যুদ্ধের চাপের মধ্যে ইরানকে দেওয়ার মতো বাড়তি রসদও মস্কোর ভাঁড়ারে বিশেষ নেই।
তবে যুদ্ধের প্রভাবে রাশিয়ার লাভ-ক্ষতির অঙ্কটা মিশ্র। জ্বালানির দাম বাড়ায় আর্থিক দিক থেকে লাভবান হচ্ছে মস্কো। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রুশ তেলের দাম বিশ্ববাজারের তুলনায় সাধারণত কম থাকে। কিন্তু ডিসেম্বরে যে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৫০ ডলারের নিচে ছিল, চলতি সপ্তাহে তা বেড়ে প্রায় ৯০ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ হওয়া এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের আশঙ্কায় তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি। ২০২৬ সালের রুশ বাজেটে তেলের যে দাম (ব্যারেলপ্রতি ৫৯ ডলার) ধরা হয়েছিল, বর্তমান বাজারদর তার তুলনায় অনেক বেশি। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারের অস্থিরতা কমাতে গত ৫ মার্চ ভারতকে রুশ তেল কেনার ক্ষেত্রে ৩০ দিনের বিশেষ ছাড় দিয়েছে আমেরিকা।
তেলের এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি রাশিয়ার ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতিকে কিছুটা চাঙা করবে। এ বছরের জানুয়ারিতে তেল ও গ্যাস থেকে রাশিয়ার আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গিয়েছিল। ফলে রুশ বাজেটের ক্রমবর্ধমান ঘাটতি সামাল দিতে এই পরিস্থিতি পুতিনকে কিছুটা স্বস্তি দেবে।
এমনকি কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) অনকাঠামোয় ইরানের হামলা থেকেও লাভ হতে পারে পুতিনের। কারণ ইউরোপের মোট এলএনজি চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ মেটায় কাতার। তবে এতে রাশিয়ার অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি ও কাঠামোগত সমস্যাগুলো মিটবে না।
সামরিক দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, ইরান যুদ্ধ রাশিয়ার জন্য এক প্রকার 'শাপে বর'। এই যুদ্ধের ফলে আমেরিকার অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত কমে আসছে। এর ফলে ইউক্রেনের কাছে বেচার মতো রসদও কমবে ওয়াশিংটনের কাছে।
তবে সব মিলিয়ে এ পরিস্থিতি রাশিয়ার জন্য কৌশলগতভানে ক্ষতিকর। কারণ মস্কো যে তার মিত্রদের রক্ষা করতে অক্ষম বা অনিচ্ছুক, এই ঘটনা তা ফের প্রমাণ করল। বরং ইরানকে উৎসাহ জোগানোর বদলে মস্কো তাদের সংযত করারই চেষ্টা করছে।
৬ মার্চ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে কথা বলেন পুতিন। সেখানে তিনি সংঘাত থামানোর আহ্বান জানান। এর কয়েক ঘণ্টা পরেই প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে ক্ষমা চেয়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দেন পেজেশকিয়ান। যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্পের 'আত্মসমর্পণের'-এর দাবি তিনি সরাসরি নস্যাৎ করে দিয়েছেন।
এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে পুতিন চাইছেন যুদ্ধ থামুক। বরং আমেরিকা এই যুদ্ধে দীর্ঘদিন আটকে থাকলে তারই লাভ। আসলে রাশিয়ার কাছে ইরান কোনো চিরস্থায়ী বা শক্তিশালী মিত্র নয়; বরং দীর্ঘদিনের বৈরিতা ভুলে তারা এখন স্রেফ 'স্বার্থের কারবারি'।
পুতিনের দাবার বোর্ডে ইরান হলো পশ্চিমা দুনিয়ার সঙ্গে দর কষাকষির একটি 'ঘুঁটি' মাত্র। তেহরানকে একদিকে হাতে রাখা এবং অন্যদিকে সেই সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে ইউক্রেন ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে লড়াইয়ে বাড়তি সুবিধা আদায় করাই সম্ভবত এখন পুতিনের মূল কৌশল।
ভিয়েনার গবেষণা সংস্থা রি:রাশিয়া-র সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ার ইরান-নীতি আসলে আমেরিকা ও ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটেই নির্ধারিত হচ্ছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পেজেশকিয়ানের সঙ্গে কৌশলগত চুক্তি সই করলেও ইরানের কাছে অত্যাধুনিক এস-৪০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেচতে রাজি হননি পুতিন। অথচ এই প্রযুক্তি তিনি তুরস্ককে দিয়েছেন, এমনকি সৌদি আরবের কাছেও বিক্রির প্রস্তাব রেখেছেন।
ইরানকে এস-৪০০ না দেওয়া আসলে ট্রাম্পের প্রতি রাশিয়ার একটি সৌজন্যমূলক বার্তা। কারণ আমেরিকা ও ইসরায়েলের আশঙ্কা ছিল, ইরানের হাতে এই প্রযুক্তি থাকলে ভবিষ্যতে তাদের পরমাণু কেন্দ্রে হামলা করা অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়বে।
১২ দিনের যুদ্ধের পর রুশ-মার্কিন উত্তেজনা যখন ফের তুঙ্গে, তখন ইরানকে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সহায়তার আশ্বাস দেয় রাশিয়া। এমনকি তেহরানকে সু-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির ইঙ্গিতও দেওয়া হয়। এর এক সপ্তাহ পরেই পাল্টা হুঁশিয়ারি দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। জানান, ইউক্রেনকে টমাহক মিসাইল দেবে আমেরিকা।
পরিস্থিতি জটিল হলেও গত বছরের ১৬ অক্টোবর ট্রাম্প ও পুতিনের ফোনালাপের পর দুই পক্ষই নিজেদের হুমকি থেকে পিছু হটে। ইউক্রেন ইস্যুতে ওয়াশিংটনের সহানুভূতি পেতেই পুতিন এখন এই সংযমের পথ বেছে নিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। গত ৫ মার্চ ট্রাম্পও এই দুই সংঘাতকে এক সুতোয় বেঁধে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে বলেছেন, ইরানে আমেরিকার হামলার পর জেলেনস্কির হাতের 'তুরুপের তাস আরও কমেছে'; তাই রাশিয়ার সঙ্গে দ্রুত একটা সমঝোতায় আসাই তার জন্য মঙ্গল।
তবে ইরানকে দাবার ঘুঁটি হিসেবে টিকিয়ে রাখতে হলে তেহরানের বর্তমান সরকার টিকে থাকা মস্কোর জন্য জরুরি। আর এখানেই পুতিনের দুশ্চিন্তার কারণ।
বছরের পর বছর ধরে ইরানকে 'সার্বভৌমত্বের' আদর্শ উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে ক্রেমলিন। নিষেধাজ্ঞা ও বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েও কীভাবে টিকে থাকা যায়, ইরান যেন তারই পথপ্রদর্শক।
রাশিয়ার ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা পশ্চিমা দুনিয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াটি কার্যত ইরানি ধাঁচেই তৈরি। এমনকি ক্রেমলিনের বর্তমান আদর্শ ও রুশ অর্থোডক্স গির্জার ক্রমবর্ধমান সামরিকায়নও ইরানের ধর্মতাত্ত্বিক মৌলবাদের পথেই হাঁটছে।
বর্তমানে ক্রেমলিনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রচারমাধ্যমগুলো ইরানের এ অভিজ্ঞতাকে রাশিয়ার প্রেক্ষাপটে বিচার করতে শুরু করেছে। সম্প্রতি এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে রাশিয়ার আইনসভা দুমা-র এক সদস্য দাবি করেন, খামেনির মতো পরিণতি এড়াতে পুতিনের এখন বিদেশ সফর বন্ধ করা উচিত। এমনকি একক ক্ষমতার বদলে 'যৌথ নেতৃত্ব' প্রতিষ্ঠার পক্ষেও কথা বলেন তিনি। এ ধরনের প্রস্তাব যে পুতিনের কাছে একেবারেই প্রীতিকর নয়, তা বলাই বাহুল্য।
