ইরানের যুদ্ধের প্রতিক্রিয়াকে ভুলভাবে হিসাব করেছিলেন ট্রাম্প ও তার উপদেষ্টারা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর সামরিক অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেবেন কি না—এ নিয়ে যখন ভাবছিলেন, তখন গত ১৮ ফেব্রুয়ারি এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য যুদ্ধ তেলের সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটাবে বা জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করবে—এমন কোনো করছেন না তিনি।
তিনি বলেন, গত বছরের জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের বিরুদ্ধে হামলার সময়ও জ্বালানি বাজারে বড় কোনো প্রভাব পড়েনি। "তেলের দাম সামান্য বেড়েছিল, তারপর আবার নেমে গিয়েছিল," বলেন তিনি। ট্রাম্পের আরও কয়েকজন উপদেষ্টা ব্যক্তিগত আলোচনায় একই ধরনের মত প্রকাশ করেছিলেন। তারা এই সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দেননি যে, দ্বিতীয়বারের মতো যুদ্ধ শুরু হলে ইরান বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে চাইবে, এবং প্রায় ২০ শতাংশ বৈশ্বিক তেল পরিবহনের নৌপথ– হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে অর্থনৈতিক যুদ্ধ শুরু করতে পারে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সেইসব ভুল সমীকরণের বাস্তব চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইরান হুমকি দিয়েছে যে তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক তেলবাহী জাহাজে হামলা চালাবে। অথচ জ্বালানি নিয়ে পারস্য উপসাগর থেকে বের হওয়ার পথে সব জাহাজকেই এই কৌশলগত নৌপথ অতিক্রম করতে হয়।
ইরানের এই হুমকির পর উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল প্রায় থেমে গেছে, তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে পেট্রোলের দাম বাড়ার কারণে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় ট্রাম্প প্রশাসন হঠাৎ করেই নানা পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছে।
এই ঘটনাটি দেখিয়ে দিয়েছে যে সংঘাতের প্রতিক্রিয়ায় ইরান কীভাবে আচরণ করবে—সে বিষয়ে ট্রাম্প ও তার উপদেষ্টারা কতটা ভুল হিসাব করেছিলেন। তেহরান এই যুদ্ধকে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে এবং সে কারণে তাদের প্রতিক্রিয়াও অনেক বেশি আক্রমণাত্মক হয়েছে।
গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের তুলনায় এবার ইরান অনেক বেশি তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। তারা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, বিভিন্ন আরব দেশের শহর এবং ইসরায়েলের জনবহুল এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ব্যাপক হামলা চালিয়েছে।
পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদেরও তাৎক্ষণিকভাবে পরিকল্পনা বদলাতে হয়েছে—মধ্যপ্রাচ্যের দূতাবাসগুলো থেকে লোকজন সরিয়ে নেওয়া থেকে শুরু করে—জ্বালানির দাম কমানোর সম্ভাব্য নীতিমালা তৈরির মতো পদক্ষেপ নিতে হয়েছে।
মঙ্গলবার ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা আইনপ্রণেতাদের একটি গোপন ব্রিফিং দেন। ব্রিফিং শেষে কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস্টোফার এস. মার্ফি সামাজিক মাধ্যমে বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি মোকাবিলার কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই এবং "কীভাবে এটিকে নিরাপদভাবে আবার খুলে দেওয়া যাবে তাও তারা জানে না।"
এমনকী ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেও কিছু কর্মকর্তা যুদ্ধ শেষ করার জন্য স্পষ্ট কৌশলের অভাব নিয়ে ক্রমেই হতাশ হয়ে পড়ছেন। তবে তারা সরাসরি প্রেসিডেন্টের কাছে সেই হতাশা প্রকাশ করতে সতর্ক থাকছেন, কারণ ট্রাম্প বারবার দাবি করছেন যে সামরিক অভিযান পুরোপুরি সফল।
ট্রাম্প সর্বোচ্চ পর্যায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন—যেমন ইরানকে এমন একজন নেতা নিয়োগ দিতে বাধ্য করা, যিনি তার নির্দেশ মেনে চলবেন। অন্যদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ তুলনামূলকভাবে সীমিত কৌশলগত লক্ষ্য তুলে ধরেছেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দ্রুত যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার একটি পথ তৈরি করতে পারে।
হোয়াইট হাউসের প্রেসসচিব ক্যারোলিন লেভিট বলেছেন, যুদ্ধ শুরুর আগে প্রশাসনের একটি "দৃঢ় পরিকল্পনা" ছিল এবং যুদ্ধ শেষ হলে তেলের দাম কমে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, "তেলের বাজারে ইরানি শাসকগোষ্ঠীর ইচ্ছাকৃত বিঘ্ন সাময়িক। যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের জন্য যে সন্ত্রাসী হুমকি তারা তৈরি করেছে—তা নির্মূল করার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনের জন্য এটি প্রয়োজনীয়।"
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের এই প্রতিবেদনের তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের এক ডজন কর্মকর্তার সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে, যারা আলোচনাগুলো ব্যক্তিগত পর্যায়ের হওয়ায়, নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদমাধ্যমটির সঙ্গে কথা বলেছেন।
'সাহস দেখান'
মঙ্গলবার পেন্টাগনের সংবাদ সম্মেলনে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ স্বীকার করেন যে প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে ইরানের তীব্র প্রতিক্রিয়া পেন্টাগনকে কিছুটা বিস্মিত করেছে। তবে তিনি দাবি করেন, ইরানের এই পদক্ষেপ উল্টো তাদেরই ক্ষতি করছে।
তিনি বলেন, "ঠিক এভাবেই তারা প্রতিক্রিয়া দেখাবে—এটা আমরা নিশ্চিতভাবে বলিনি, তবে সম্ভাবনা ছিল। আমার মনে হয় এটি (ইরানি) শাসকগোষ্ঠীর মরিয়া দশার বহিঃপ্রকাশ।"
অন্যদিকে ট্রাম্প তেলের সরবরাহে ব্যাঘাত নিয়ে ক্রমেই বিরক্তি প্রকাশ করছেন। ফক্স নিউজ-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তেলবাহী জাহাজের নাবিকদের উচিত "সাহস দেখানো" এবং হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে যাত্রা চালিয়ে যাওয়া।
যুদ্ধ শুরুর আগে কিছু সামরিক উপদেষ্টা সতর্ক করেছিলেন যে ইরান মার্কিন আক্রমণের জবাবে পাল্টা আক্রমণাত্মক অভিযান চালাতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলাকে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখবে। তবে অন্যান্য কিছু উপদেষ্টা মনে করেছিলেন যে, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা করলে তুলনামূলক বাস্তববাদী নতুন নেতৃত্ব ক্ষমতায় এসে যুদ্ধের ইতি টানবেন।
যুদ্ধ শুরু হলে তেলের দাম বাড়তে পারে—এমন ঝুঁকি সম্পর্কে ব্রিফিং দেওয়ার সময় ট্রাম্প ইরানের পাল্টা আক্রমণের সম্ভাবনাটি স্বীকার করেছিলেন। তবে তিনি এটিকে স্বল্পমেয়াদি সমস্যা মনে করছিলেন এবং ইরানি শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করার লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দেন। তিনি জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট এবং অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টকে জ্বালানির সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধি মোকাবিলার বিকল্প পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেন।
কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর ৪৮ ঘণ্টারও বেশি সময় পার হওয়ার আগে তিনি এসব পরিকল্পনা প্রকাশ্যে উল্লেখ করেননি। এসব পরিকল্পনার মধ্যে ছিল যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সহায়তায় রাজনৈতিক ঝুঁকি বিমা এবং প্রয়োজন হলে মার্কিন নৌবাহিনীর পাহারায় তেলবাহী জাহাজকে নিরাপত্তা দেওয়া। তবে এখনো নৌবাহিনীকে কোনো এসকর্ট মিশনে অংশ নিতে দেখা যায়নি।
এরপরেও মঙ্গলবার সামাজিক মাধ্যমে একটি ভুল পোস্ট করে বাজারে রীতিমতো বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করেন মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট। তিনি লিখেছিলেন, মার্কিন নৌবাহিনী সফলভাবে একটি তেলবাহী জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে পার করে দিয়েছে।
ওই পোস্টে শেয়ারবাজারে উত্থান ঘটে এবং তেলবাজারে আশ্বস্ত ভাব তৈরি হয়। কিন্তু পরে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান যে এমন কোনো এসকর্ট দেওয়া হয়নি। তখন রাইট পোস্টটি মুছে ফেলতে বাধ্য হন। এরপর আবার বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, জাহাজ চলাচল পুনরায় চালুর প্রচেষ্টা আরও জটিল হয়ে পড়েছে, কারণ গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী ইরান প্রণালিতে মাইন বসানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। যদিও সেই পরিকল্পনা প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল, তবুও তা ট্রাম্প প্রশাসনকে উদ্বিগ্ন করে তোলে।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মার্কিন সামরিক বাহিনী জানায়, হরমুজ প্রণালির কাছে ইরানের ১৬টি মাইনলেয়ার জাহাজে তারা হামলা চালিয়েছে।
তবে যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা বাড়ায়, ওয়াশিংটনে রিপাবলিকান রাজনীতিকরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। তেলের দাম বাড়লে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে আমেরিকার ভোটারদের কাছে তাদের অর্থনৈতিক এজেন্ডা তুলে ধরাই কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
ট্রাম্প প্রকাশ্যে এবং ব্যক্তিগতভাবে দাবি করেছেন যে, ভেনিজুয়েলার তেল ইরান যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া ঘাটতি পূরণে সাহায্য করতে পারে। মঙ্গলবার তার প্রশাসন টেক্সাসের একটি নতুন তেল শোধনাগার প্রকল্প ঘোষণাও করেছে, যা কর্মকর্তাদের মতে তেলের সরবরাহ বাড়াতে সহায়তা করবে এবং ইরান যাতে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি তেলের বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে না পারে তা নিশ্চিত করবে।
