ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জেট ফুয়েলের দাম আকাশছোঁয়া, বাড়তে পারে বিমানভাড়া
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ায় জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, আগামী কয়েক মাসে তেল ও গ্যাসভিত্তিক বিভিন্ন জ্বালানি পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। সরবরাহ সংকটের কারণে এই মূল্যবৃদ্ধি ঘটবে বলে মনে করা হচ্ছে। এর প্রভাব পড়তে পারে উড়োজাহাজের ভাড়ায়ও, ইতোমধ্যে কয়েকটি এয়ারলাইন সম্ভাব্য ভাড়া বাড়ানোর সতর্কবার্তা দিয়েছে। এতে যাত্রীদের ভ্রমণ চাহিদা সাময়িকভাবে কমে যেতে পারে, কারণ অনেকেই টিকেটের দাম কমার অপেক্ষা করবেন অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে।
অস্ট্রেলিয়ার কোয়ান্টাস এয়ারওয়েজ, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এয়ারলাইনস (এসএএস) এবং এয়ার নিউজিল্যান্ড ইতোমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বিমানভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। এসব এয়ারলাইন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর জ্বালানির দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়াই এ সিদ্ধান্তের মূল কারণ।
ইরানে হামলার আগে জেট ফুয়েলের দাম যেখানে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে ছিল, তা এ সপ্তাহে বেড়ে ১৫০ থেকে ২০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে। ফলে অনেক এয়ারলাইন ২০২৬ সালের আর্থিক পরিকল্পনা নতুন করে বিবেচনা করতে বাধ্য হচ্ছে, কারণ জ্বালানি মূল্যের অনিশ্চয়তার কারণে আগামী মাসগুলোতে জীবাশ্ম জ্বালানির দাম কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা অনুমান করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইরান যুদ্ধের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে হরমুজ প্রণালি, যা পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ। এই প্রণালিকে একটি বড় 'চোকপয়েন্ট' হিসেবে ধরা হয়, কারণ উপসাগরীয় অঞ্চলে সীমিত কিছু পাইপলাইন ছাড়া জ্বালানি পরিবহনের বিকল্প পথ খুব কম। হরমুজ দিয়ে জীবাশ্ম জ্বালানি পরিবহন নাটকীয়ভাবে কমে যাওয়ায়—যা ইতিহাসের অন্যতম বড় তেল সরবরাহ বিঘ্ন বলে ধরা হচ্ছে—সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তেল ও গ্যাসের দাম দ্রুত বেড়েছে।
স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এয়ারলাইনস (এসএএস)-এর একজন মুখপাত্র বার্তাসংস্থা রয়টার্স-কে বলেন, "এ ধরনের বড় মূল্যবৃদ্ধির পরিস্থিতিতে স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য কার্যক্রম বজায় রাখতে আমাদের প্রতিক্রিয়া জানানো প্রয়োজন।" তিনি জানান, এয়ারলাইনটি সাময়িকভাবে ভাড়া সমন্বয় করেছে।
তবে সব এয়ারলাইন সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। যেমন এশিয়া ও ইউরোপের কিছু এয়ারলাইন— লুফথানসা এবং রায়ানএয়ার—জ্বালানি 'হেজিং' পদ্ধতি ব্যবহার করে; যার ফলে তাদের জ্বালানির একটি অংশ নির্দিষ্ট দামে আগেই নিশ্চিত করা থাকে। কিন্তু কিছু প্রতিষ্ঠান আশঙ্কা করছে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সেই হেজ করা জ্বালানিও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
উদাহরণ হিসেবে ফিনএয়ার তাদের প্রথম প্রান্তিকের জন্য ৮০ শতাংশের বেশি জ্বালানি ক্রয় আগেই হেজ করেছিল। এখন তারা আশঙ্কা করছে, সংঘাত চলতে থাকলে সেই জ্বালানি সরবরাহই হয়তো পাওয়া যাবে না। ইতোমধ্যে বড় কিছু জেট ফুয়েল উৎপাদক—যেমন কুয়েত—সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে উৎপাদন ও রপ্তানি কমাতে বাধ্য হয়েছে।
বিমানভাড়া বাড়ার আরেকটি কারণ হলো চলমান সংঘাতের কারণে বেশকিছু আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যাওয়া, যার ফলে এশিয়া-ইউরোপের অনেক রুটে প্রভাব পড়েছে। অনেক এয়ারলাইনকে যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছাতে বিকল্প ফ্লাইটপথ চালু করতে হয়েছে। পাইলটদেরও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে উড়তে হচ্ছে, ফলে জনপ্রিয় কিছু রুটে চাপ দ্রুত বেড়েছে।
একটি গবেষণা নোটে ডয়চে ব্যাংক-এর বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, "শিগগির কোনো সমাধান না এলে বিশ্বের বিভিন্ন এয়ারলাইন হাজার হাজার উড়োজাহাজ সাময়িকভাবে গ্রাউন্ডেড করতে বাধ্য হতে পারে এবং আর্থিকভাবে দুর্বল কিছু প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম বন্ধ করতেও পারে।"
এদিকে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের মতো কিছু প্রতিষ্ঠান মনে করছে, স্বল্পমেয়াদে তারা বর্তমান টিকিট মূল্য ধরে রাখতে পারবে, যতক্ষণ না সংঘাতের মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। তবে অনিশ্চয়তার কারণে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ ইতোমধ্যে কিছু রুট কমিয়ে দিয়েছে, যেমন আবু ধাবিতে তাদের মৌসুমি ফ্লাইট।
এই অনিশ্চয়তার কারণে এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন এয়ারলাইনের শেয়ারের দামও পড়ে যাচ্ছে। বিনিয়োগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান মর্নিংস্টার-এর এশিয়া অঞ্চলের ইকুইটি রিসার্চ পরিচালক লরেইন তান বলেন, "এখন এয়ারলাইনগুলোর জন্য বড় সমস্যা হলো ভ্রমণের চাহিদা কমে যেতে পারে, কারণ ছুটি কাটাতে যারা আকাশপথে ভ্রমণ করেন তাদের খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান অনিশ্চিত পরিস্থিতির কারণে ব্যবসায়িক ভ্রমণও সীমিত করতে শুরু করতে পারে।"
সোমবার ফ্লোরিডায় এক দলীয় সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, "আমরা অনেক দিক থেকেই ইতোমধ্যে জয়ী হয়েছি, কিন্তু এখনো যথেষ্ট জয় আসেনি।" তিনি ইরান যুদ্ধের প্রসঙ্গে বলেন, "এই দীর্ঘদিনের বিপদ একেবারে শেষ করতে আমরা চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের লক্ষ্যে আরও দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি।"
ট্রাম্পের এই বক্তব্য এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া তার মিশ্র বার্তার কারণে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে, কারণ ইরান যুদ্ধ শেষ করার কোনো স্পষ্ট সময়সীমা বা সম্ভাব্য সময় এখনো স্পষ্ট নয়।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে, যার ফলে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে আগ্রাসন কখন শেষ হবে—এ অনিশ্চয়তার কারণে বিভিন্ন শিল্পখাতের শেয়ারবাজারেও বড় পতন দেখা যাচ্ছে।
তাই এই মুহূর্তে অনেক এয়ারলাইন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও, আগামী মাসগুলোতে বিমানভাড়া উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
