পচে যাওয়া মরদেহ দেখতে ২০০ বছর আগে প্যারিসে ভিড় করতেন পর্যটকরা!
উনিশ শতকের প্যারিসে ব্যয়বহুল কাঁচের দেয়াল দুটি জিনিস বোঝাতো: উচ্চমানের দোকানপাট অথবা জনসমক্ষে প্রদর্শনী। লা মর্গু দে পারি (La Morgue de Paris)-তে ছিল এই দুটিরই সংমিশ্রণ। সেখানে মানুষ আসত রহস্যময় মৃত্যু আর পচে যাওয়া লাশ দেখার নেশায়। এই ঘটনা কেবল তৎকালীন প্যারিসেরই নয়, বরং মানবমনের এক বিচিত্র কৌতূহলের ইতিহাস তুলে ধরে, যেখানে কোনো দুর্ভাগার ট্রাজেডি হয়েছে অন্যদের, বিশেষত সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণির বিনোদনের উৎস।
১৮৭০-এর দশকে প্যারিসের এই মর্গে, শহরের অজ্ঞাত পরিচয় মৃতদেহগুলো কাত করা মার্বেলের স্ল্যাবের ওপর রাখা থাকত। পচন রোধ করতে তাদের ওপর অল্প অল্প করে পানি ফোঁটা ফোঁটা করে ফেলা হতো। কিছু মৃতদেহ যে পোশাকে পাওয়া যেত, সে পোশাকেই থাকত, তবে বেশিরভাগই নগ্ন থাকত; কেবল লজ্জাস্থানের ওপর চামড়ার কৌপিন রাখা হতো। অন্যান্য পোশাক—কোট, বুট, এমনকি ছাতাও—মৃতদেহের উপরে বা পাশে ঝুলিয়ে রাখা হতো, যেন কোনো দোকানের জানালায় প্রদর্শিত হচ্ছে, অথবা যেন মৃতের অন্তিম পরিণতির রহস্যময় সূত্র দেওয়া হচ্ছে।
যদি কোনো মৃতদেহ খুব বেশি পচে যেত, তবে পরিচারকরা একটি মোমের প্রতিরূপ দিয়ে সেটির অংশবিশেষ প্রতিস্থাপন করত।
এই বিকৃত দৃশ্য দেখতেই প্রতিদিন বিশাল কাঁচের দেয়ালের সামনে ভিড় জমাতো পর্যটকরা। বিক্রেতারা অপেক্ষারত দর্শকদের কাছে কমলা ও ওয়াফেল বিক্রি করত। পর্যটকরা নটরডেমের পাশাপাশি এই মর্গকেও তাদের গাইডবুকে উল্লেখ করত। পরিবারগুলো সন্তানদের নিয়ে আসত। প্যারিসীয়রা এখানে শোক জানাতে নয়, বরং ব্যাখ্যাহীন কৌতূহল মেটাতে আসত।
মর্গটি মূলত শহরের অজ্ঞাত মৃতদেহ শনাক্তকরণে সহায়তা করার একটি ফরেনসিক অনুষঙ্গ হিসেবে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এর পরিবর্তে, এটি প্যারিসের সবচেয়ে রহস্যময়, কদর্য ও ভয়ংকর আকর্ষণে পরিণত হয়।
সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজ্যুয়াল স্টাডিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক এবং শিল্পকলার ইতিহাস বিষয়ক অধ্যাপক ভ্যানেসা শুয়ার্টজ বলেন, "১৯০৭ সালে যখন [প্যারিস মর্গ] বন্ধ হয়ে যায়, তখন একজন সাংবাদিক বলেছিলেন যে এটি ছিল জনগণের জন্য প্রথম বিনামূল্যের থিয়েটার।" তবে এটি বাস্তব ফরেনসিক উদ্ভাবনেরও একটি স্থান ছিল।
আজকাল, টিকটকে যেমন 'কোল্ড কেস' বা অমীমাংসিত মামলা ছোট ছোট থ্রিলারের মতো প্রকাশিত হয়, এবং সত্যিকারের অপরাধ বিষয়ক পডকাস্টগুলো চার্টের শীর্ষে থাকে, কিন্তু ১৫০ বছর আগে, প্যারিসীয়দের মৃত্যুকে বিনোদনে পরিণত করার কোনো ডিজিটাল মাধ্যম ছিল না। না ছিল অ্যালগরিদমের ভোজবাজি। তাদের ছিল বিশ্বের প্রথম পাবলিক মর্গ – মৃতকে শনাক্তকরণের একটি নাগরিক পরীক্ষা, যা ঘটনাক্রমে উন্মোচন করেছিল যে, আমরা কত আগ্রহের সঙ্গে ট্র্যাজেডিকে একটি প্রদর্শনীতে পরিণত করতে পারি।
প্যারিস যেভাবে বিশ্বের প্রথম পাবলিক মর্গ তৈরি করেছিল
প্যারিস মর্গ বিশ্বের সবচেয়ে অদ্ভুত আকর্ষণগুলির মধ্যে একটি তৈরি করার উদ্দেশ্যে শুরু করেনি। এটি একটি ব্যবহারিক সমস্যা দিয়ে শুরু হয়েছিল: অজ্ঞাত মৃতদেহগুলোর ব্যবস্থা কীভাবে করা যায়, এই প্রশ্ন থেকে। উনিশ শতকের প্রথম দিকে যখন শহরের জনসংখ্যা অর্ধ মিলিয়ন ছাড়িয়ে দ্রুত বাড়ছিল – তখন একটি বিরক্তিকর চিত্র সামনে আসে: অজ্ঞাতপরিচয় মানুষের মৃত্যু। সেইন নদী থেকে উদ্ধার করা বা গলি-ঘুপচিতে পাওয়া মৃতদেহ প্রায়শই চিহ্নিত করা যেত না। জনসাধারণকে সতর্ক করার বা নিকটাত্মীয়দের খুঁজে বের করার কোনো ব্যবস্থা না থাকায়, নগর কর্তৃপক্ষ জীবিত ব্যক্তির যেমন পরিচয় জানা যায়, তার সঙ্গে মৃতের অজ্ঞাত পরিচয় থাকার কারণে যে সমস্যা— তা দূর করার কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছিল না।
ইতিহাসবিদ এবং আসন্ন বই 'মর্গ'-এর লেখক ক্যাটরিওনা বায়ার্স বলেন, "আপনি মারা যেতে পারেন এবং আপনার মৃতদেহ অজ্ঞাত থাকতে পারে – এই ধারণাটি ছিল একটি আধুনিক সমস্যা।"
এই সমস্যার সমাধানের জন্য, প্যারিসের নগর কর্তৃপক্ষ ১৮০৪ সালে প্রথম মর্গ খোলে। এটি ছিল পুলিশের সঙ্গে সংযুক্ত একটি বিনয়ী, ব্যবহারিক কাঠামো। এটি প্রদর্শনের জন্য ডিজাইন করা হয়নি, বরং কার্যকারিতার জন্য তৈরি হয়েছিল, একটি নাগরিক অবকাঠামো জনসাধারণকে অজ্ঞাত মৃতদেহ শনাক্ত করতে সাহায্য করত। কিন্তু শহর পরিবর্তিত হওয়ার সাথে সাথে মর্গও পরিবর্তিত হয়।
প্যারিসকে একটি মঞ্চের মতো করে গড়ে তোলা হচ্ছিল, প্রশস্ত রাজপথ, বিশাল সম্মুখভাগ এবং নতুন মেট্রোপলিটন স্মৃতিস্তম্ভগুলো রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও আধুনিকতাকে প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে তৈরি হচ্ছিল। শুয়ার্টজ বলেন, "এটি হাউসম্যান-পরবর্তী প্যারিসের অংশ ছিল।"
প্রসঙ্গত ফ্রান্সের সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ন তাঁর জ্যেষ্ঠ এক রাজকর্মচারী জর্জ ইউজিন হাউসম্যানকে নির্দেশ দিয়েছিলেন নতুন নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে। এই পূর্তকাজের উদ্দেশ্যই ছিল নগরের শোভাবর্ধণ ও ফ্রান্সের আধুনিক প্রতিচ্ছবি তুলে ধরা। এর আওতায় ভেঙেও ফেলা হয় প্রাচীন অনেক বসতি। সে জায়গা দখল করে আধুনিক স্থাপত্যশৈলী, উদ্যান ও প্রশস্ত সব এভিনিউ।
১৮৬৪ সালে, মর্গটি ইলে দে লা সিটে-তে নটরডেমের পিছনে একটি নতুন স্থানে স্থানান্তরিত হয়। পথচারীদের ভিড় এবং রাস্তা থেকে স্পষ্ট দৃশ্যমানতার কারণে, ভবনটি যেন দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যই ডিজাইন করা হয়েছিল। এর ব্যয়বহুল কাঁচের সম্মুখভাগ, জানালার দিকে কাত করা স্ল্যাব এবং মৃতদেহের উপর অবিরাম ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ার দৃশ্য— পৌরসভার একটি জরুরি কাজকে প্রদর্শনীতে পরিণত করে। আর এমন নকশাও কাকতালীয় ছিল না।
মর্গের বিন্যাস হাউসম্যানাইজেশনের যুক্তিকে প্রতিফলিত করে— সুশৃঙ্খল, প্রবেশযোগ্য এবং দৃশ্যমানতার জন্য নির্মাণ করা হয়।
'ট্রু ক্রাইম' আসক্তির এক অপ্রত্যাশিত মঞ্চ
১৮৬০-এর দশকে, কিছু একটা বদলে গিয়েছিল। প্যারিসীয়রা কেবল মর্গ দেখতে আসত না; তারা এর ভক্ত হয়ে উঠছিল। এই পরিবর্তনের একটি অংশ এসেছিল সংবাদমাধ্যম থেকে। সচিত্র সংবাদপত্রগুলো এসময় জনপ্রিয়তা লাভ করে। তখন মর্গের রহস্যময় মামলাগুলোর চাঞ্চল্যকর সংবাদ প্রচারও বাড়তে থাকে। ফলে দর্শকরা কেবল দেখতে আসত না, বরং সংবাদে বলা কাহিনিকে অনুসরণ করত এবং কীভাবে নিহতের মৃত্যুর রহস্য উন্মোচিত হয় – তা জানতেও ঘুরেফিরে আসত।
নতুন জনপ্রিয় 'পেটিট প্রেস' — ফ্রান্সের 'পেনি প্রেস'-এর সংস্করণ — চাঞ্চল্যকর শিরোনাম, উত্তেজনাপূর্ণ জল্পনা এবং মৃতদেহের শিল্পীর চিত্রায়ণ দিয়ে এই আসক্তিকে বাড়িয়ে তুলত। বায়ার্স যেমনটি ব্যাখ্যা করেছেন, মানুষ প্রাথমিক সংবাদপত্রের প্রতিবেদন থেকে শুরু করে মর্গ পরিদর্শন এবং শেষ পর্যন্ত বিচার পর্যন্ত মামলাগুলি অনুসরণ করতে পারত। এটি ছিল 'ট্রু ক্রাইম' উপভোগের একটি প্রাথমিক রূপ।
কিছু মৃতদেহ বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করত। অস্বচ্ছ বা আপত্তিকর পরিস্থিতিতে পাওয়া তরুণীদের মরদেহ বিকৃত আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। শুয়ার্টজ বলেন, "ধারণা ছিল যে নারীদের প্রাইভেট স্থানে থাকার কথা।" কিন্তু মর্গে তাদের উপস্থিতি তাদের উন্মোচন করত, যা দ্রুত বদলে যাওয়া সমাজে "পারিবারিক শৃঙ্খলার ভাঙনকে" তুলে ধরত।
প্রযুক্তি কেবল এই আসক্তিকে আরও তীব্র করেছিল। প্লেট গ্লাস নিরবচ্ছিন্ন দেখার সুযোগ দিত। রেফ্রিজারেশন প্রদর্শনের সময় বাড়িয়ে দিত। মোমের মুখোশ পচন ঢেকে দিত। প্রতিটি উদ্ভাবন জনসাধারণকে আরও কিছুক্ষণ দেখতে, কাঁচের ওপারে, ঠান্ডা মার্বেলের উপর, এবং কখনও কখনও মোমের তৈরি মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে দিত।
আর তারা দেখতও বটে। উনিশ শতকের শেষের দিকে, মর্গ প্রতিদিন লুভর মিউজিয়ামের চেয়ে বেশি এবং আইফেল টাওয়ারের চেয়ে চারগুণ বেশি দর্শক আকর্ষণ করত। এমনকি রথী-মহারথী সাহিত্যিকরাও এর প্রভাব থেকে মুক্ত ছিলেন না। চার্লস ডিকেন্স একাধিকবার মর্গে গিয়েছিলেন, যার মধ্যে একবার বড়দিনের দিনও ছিল। কিন্তু এমিল জোলাই এটি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখেছিলেন। তার ১৮৬৭ সালের উপন্যাস 'তেরেস রাকুইন'-এ তিনি মর্গকে একটি গথিক পটভূমি হিসেবে নয়, বরং দর্শনীয় বস্তুতে আসক্ত একটি সমাজের ওপর মন্তব্য হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।
শুয়ার্টজ বলেন, "জোলা নিজেকে এর ঊর্ধ্বে ভাবতেন না। তিনি বুঝতেন মর্গ মানুষের ভিড় সম্পর্কে কী প্রকাশ করে।"
প্যারিস মর্গ যেভাবে বিশ্ব ফরেনসিক বিজ্ঞানকে নতুন রূপ দিয়েছে
১৮৮০-এর দশকে, বিশ্বের শহরগুলো প্যারিস মর্গের নিজস্ব সংস্করণ গ্রহণ করছিল। "প্যারিস মর্গ ছিল অবিশ্বাস্যভাবে প্রভাবশালী," বায়ার্স বলেন। নিউইয়র্ক শহর এই মডেলটি সম্পূর্ণভাবে অনুকরণ করে। সান ফ্রান্সিসকোও একই পথ অনুসরণ করে। রোম, বার্লিন, লিসবন, মেলবোর্ন এবং বুখারেস্টও তা-ই করেছিল।
তবে আসল রপ্তানি কেবল স্থাপত্য ছিল না – এটি ছিল দক্ষতা। প্যারিস ফরেনসিক মেডিসিন এবং আধুনিক পুলিশিং কৌশলগুলোর জন্য বৈশ্বিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। মেডিকেল পরীক্ষকরা সেখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজ নিজ দেশে ফিরে গিয়ে একই ধরনের ব্যবস্থা স্থাপন করেন। পুলিশ বিভাগগুলো মৃতদেহ শনাক্তকরণ এবং অপরাধস্থল প্রোটোকলগুলির জন্য প্যারিসীয় কৌশলগুলো অধ্যয়ন করা শুরু করে।
যে উত্তরাধিকার রয়ে গেছে
প্যারিস মর্গ ১৯০৭ সালে বন্ধ হয়ে যায়। জনরুচি পরিবর্তিত হয়েছিল কারণ সংস্কারকরা মৃতের জন্য আরও গোপনীয়তার চাপ দিচ্ছিলেন। তাই প্যারিসের অন্য প্রান্তে একটি নতুন মর্গ অনেকটাই চুপিসারে খোলা হয়েছিল – কাঁচ ছাড়া, ভিড় ছাড়া।
কিন্তু দেখার ক্ষুধা অদৃশ্য হয়নি। সেই একই বছর, প্যারিসে স্থায়ী সিনেমা হলগুলোর উত্থান ঘটে। শুয়ার্টজ যেমন উল্লেখ করেছেন, এই সময়টি "কেবল কাকতালীয়" ছিল না। বাস্তবসম্মত দৃশ্যের আকাঙ্ক্ষা একটি নতুন মাধ্যম খুঁজে পেয়েছিল।
আদতে এতে যদি কিছু হয়ে থাকে, তা হচ্ছে মর্গ একটি নতুন ভিজ্যুয়াল ভাষা উদ্ভাবনে সহায়তা করে: যা জনসাধারণের কর্তব্য এবং ব্যক্তিগত আগ্রহের মধ্যেকার রেখাটি ঝাপসা করে দেয়। এটি একটি পাবলিক স্পেস ছিল যা মানুষকে তাকিয়ে থাকতে, অনুমান করতে, তত্ত্ব প্রস্তাবের সুযোগ দিত। জানিয়েছিল। আর তা কাজও করেছিল। মানুষ বারবার আসত, কেবল মৃতদের শনাক্ত করতে নয়, কাহিনির পরিসম্পাতিও দেখতে।
বায়ার্স বলেন, "মর্গ নাগরিক কর্তব্য এবং কৌতূহলবশত অন্যের ব্যক্তিগত জীবন পর্যবেক্ষণ- এর মধ্যে অদ্ভুত নিবিড়তা প্রকাশ করে। এটি আজও মৃত্যু আমাদের কীভাবে গ্রাস করে– সেই চিন্তাকে প্রভাবিত করে।"
