ট্রাম্পের শুল্ক নীতির অনিশ্চয়তায় যেভাবে বদলে যেতে পারে এশিয়ার ব্যবসা পরিস্থিতি

এশিয়ার কারখানা ও সরবরাহ চেইনগুলোর ওপর ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর ও অপ্রত্যাশিত শুল্ক নীতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে, যা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে একেবারে অনিশ্চিত করে তুলেছে। খবর বিবিসি'র।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন তান ইউ কং। তিনি বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠানটি যেন একদম দর্জির দোকান—গ্রাহকের পছন্দ অনুযায়ী চিপ তৈরি করে দেয়।
তিনি বলেন, 'আমরাই কাপড় দিই, বোতাম দিই, সব দিই। আপনি শুধু বলুন কোন ডিজাইন চান, আমরা সেটা বানিয়ে দিই।' তান গ্লোবালফাউন্ড্রিজের সিঙ্গাপুর কার্যালয়ের প্রধান।
কিন্তু এখন প্রতিষ্ঠানটি শুধু চিপ নয়, নিজেদের ভবিষ্যৎও 'কাস্টমাইজ' করছে—ডোনাল্ড ট্রাম্পের অপ্রত্যাশিত শুল্ক নীতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে।
ট্রাম্প ঘোষিত উচ্চ শুল্কের ওপর ৯০ দিনের বিরতি ৯ জুলাই শেষ হচ্ছে। এর আগে বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠান ওয়াশিংটনের মন জোগাতে তৎপর হলেও এরপর কী হবে, কেউ জানে না।
শুক্রবার ট্রাম্প বলেন, ১ আগস্ট থেকে নতুন শুল্ক কার্যকর হবে এবং এ নিয়ে '১২টি চিঠি' পাঠানো হবে। এই শুল্ক ১০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে, তবে কোন কোন দেশে চিঠি যাবে, তিনি বলেননি।
চিপস বা সেমিকন্ডাক্টরের ওপর এখনও শুল্ক আরোপ হয়নি, তবে ট্রাম্প একাধিকবার হুমকি দিয়েছেন। এই অনিশ্চয়তা ব্যবসায়ীদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা কঠিন করে তুলেছে।
ব্লুমবার্গ জানায়, যুক্তরাষ্ট্র মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে এআই চিপ রপ্তানির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করতে চায়, যাতে চীনে এসব প্রযুক্তি না পৌঁছায়।
এই বিষয়ে মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিবিসির প্রশ্নের জবাব দেয়নি।
তান বলেন, 'আপনি একদিন পরপর নীতি বদলাতে পারেন না। এতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা খুব কঠিন।'

এএমডি, ব্রডকম, কোয়ালকমের চিপ তৈরি করে গ্লোবালফাউন্ড্রিজ, যার কারখানা ভারত থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় বিস্তৃত।
এআই যন্ত্রের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় তারা ১৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি, কিছু উৎপাদন যুক্তরাষ্ট্রে সরিয়ে নিতে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করছে।
চিপ, পোশাক ও গাড়ির যন্ত্রাংশ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন নতুন ক্রেতা খুঁজছে, খরচ কমাচ্ছে এবং আগেভাগে অর্ডার পূরণে ব্যস্ত।
বস্টন কনসালটিং গ্রুপের অপর্ণা ভরদ্বাজ বলেন, 'এই অনিশ্চয়তায় ব্যবসায়ীদের মজুত বাড়ানো ও সময় ধরে পরিকল্পনা করা জরুরি।' তবে এতে প্রতিযোগিতা ও বাজারও হারানোর ঝুঁকি আছে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
তিনি বলেন, 'অনিশ্চয়তাই এখন নতুন বাস্তবতা।'
জয়ী ও পরাজিত
এপ্রিল মাসে ট্রাম্প যখন বিশ্বের অনেক দেশের ওপর শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন, তখন সবচেয়ে কঠোর শুল্ক আরোপ করা হয় এশিয়ার বেশ কিছু অর্থনীতির ওপর—যেমন দীর্ঘদিনের মিত্র জাপান (২৪ শতাংশ), দক্ষিণ কোরিয়া (২৫ শতাংশ) এবং বড় বাণিজ্যিক অংশীদার ভিয়েতনামের (৪৬ শতাংশ) ওপর।
কিছুদিন পর ট্রাম্প ৯০ দিনের জন্য অধিকাংশ দেশের শুল্ক ১০ শতাংশ করে সাময়িক বন্ধ রাখেন। তবে এই উচ্চ শুল্কগুলো আগামী বুধবার থেকে আবার চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, শুল্ক অনেক শিল্পের জন্য ক্ষতিকর হবে, বিশেষ করে বস্ত্র, আসবাবপত্র, রাবার ও প্লাস্টিক শিল্পে। সিঙ্গাপুরের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হবে, যদিও তাদের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে।
২০২৪ সালে বিশ্ব অর্থনীতির ৭.২ শতাংশ অংশের নিয়ন্ত্রণ ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর হাতে। তাই শুল্কের কারণে বাড়তি খরচ তাদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এখন পর্যন্ত কেবল ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করতে পেরেছে—যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা পণ্যে ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হবে, তবে ভিয়েতনাম থেকে রপ্তানির ওপর কোনো শুল্ক থাকবে না।
জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া এখনও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, তবে ট্রাম্প জাপানের ওপর ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন।
জাপানি গাড়ি নির্মাতারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মাজদা বলেছে, সরবরাহকারী বদলাতে সময় লাগছে এবং তারা বেঁচে থাকার জন্য লড়ছে।

অস্ট্রেলিয়া যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা মিত্র। তারা ওয়াশিংটনকে জানিয়েছে, তাদের ওপর শুল্ক 'শূন্য' হওয়া উচিত।
ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ড বেশি পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং আমদানি কর কমানোর অনুরোধ করেছে।
কম্বোডিয়ার মতো দরিদ্র দেশ, যাদের দরকষাকষির ক্ষমতা কম, তাদের ওপর ৪৯ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ হয়েছে, কিন্তু তারা বেশি পণ্য কিনতে সক্ষম নয়।
আইএনএসইএড-এর অধ্যাপক পুশান দত্ত বলেন, 'এশিয়ার অর্থনীতি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল… তারা বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের কেন্দ্রে।' এই চেইনে পরিবর্তন এলে তা এশিয়ার জন্য কঠিন হবে।
তিনি বলেন, 'ভারতের মতো বড় অভ্যন্তরীণ চাহিদাসম্পন্ন দেশ কিছুটা সুরক্ষিত থাকতে পারে, তবে সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম ও এমনকি চীনের মতো রপ্তানিনির্ভর দেশের ওপর বড় প্রভাব পড়বে।'
নতুন বিশ্বব্যবস্থা?
ট্রাম্প প্রথম বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া চিপ তৈরির কারখানা ও ডাটা সেন্টারে বিনিয়োগ বাড়িয়েছেন। এর পিছনে ছিল 'ফ্রেন্ড-শোরিং'—অর্থাৎ এমন দেশগুলোতে উৎপাদন যাদের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক আছে।
এছাড়া, এশিয়ার দেশগুলো উপকৃত হয়েছে 'চায়না + ১' কৌশল থেকে, যেখানে চীন ও তাইওয়ানের বাইরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতেও সরবরাহ চেইন বিস্তৃত করা হয়েছে।
অপর্ণা ভরদ্বাজ বলেন, 'শুল্ক যতই বাড়ুক, যুক্তরাষ্ট্র অনেক এশীয় ব্যবসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ গ্রাহকই থাকবে।'

ট্রাম্পের নীতিতে পোশাক ও জুতার মতো খাতে ব্যয় বেড়েছে, যেখানে অনেক ব্র্যান্ড উৎপাদন সরিয়ে এনেছে ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ায়।
কিছু মার্কিন ব্র্যান্ড ইতোমধ্যে বলেছে, শুল্কের কারণে দাম বাড়লে তারা গ্রাহকদের ওপর সেই খরচ চাপাবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভিয়েতনাম, লাওস ও কম্বোডিয়া থেকে বিনিয়োগ সরতে পারে শুল্ক কম থাকা দেশ—যেমন ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায়।
বিকল্প বাজার হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মধ্যপ্রাচ্য ও ল্যাটিন আমেরিকা উঠে আসছে।
তান বলেন, 'আমরা এখন আর বিশ্বায়ন করছি না, বরং এমন অঞ্চল খুঁজছি যেখানে নিরাপদ থাকবো। এখন সবাইকে মানিয়ে নিতে হবে যে, সস্তায় পাওয়া যাবে না।'
এশিয়ার বাণিজ্যিক সম্পর্ক বদলাচ্ছে, আর যুক্তরাষ্ট্র হয়ে উঠছে এক অনিশ্চিত সহযোগী।
অধ্যাপক দত্ত বলেন, 'এতে চীনের জন্য বড় সুযোগ এসেছে—সে বিশ্ব বাণিজ্যের রক্ষক হয়ে উঠছে।'
যুক্তরাষ্ট্র-ভিয়েতনাম চুক্তি এখন পর্যন্ত তৃতীয়, এর আগে যুক্তরাজ্য ও চীনের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। নতুন চুক্তি না হলে এশিয়ার ব্যবসা নতুন পথে হাঁটতে পারে।
অপর্ণা ভরদ্বাজ বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র যখন বাণিজ্যে সুরক্ষা দেয়াল তুলছে, এশিয়া তখন উল্টো পথে—খোলামেলা বাণিজ্যের দিকে এগোচ্ছে।'
তিনি বলেন, 'শুল্ক দুইটি প্রবণতা বাড়াচ্ছে—চীন-পশ্চিমের বাণিজ্য কমছে, চীন ও এশিয়ার দেশের মধ্যে বাণিজ্য বাড়ছে।'
অধ্যাপক দত্ত এক প্রবাদ উদ্ধৃত করে বলেন, 'শাসকের সম্মানে মাথা নত করো, তারপর নিজের পথে চলো।'