আইএইএ’র সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক স্থগিতের আইন অনুমোদন ইরানের প্রেসিডেন্টের

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-র সঙ্গে সব ধরনের সহযোগিতা স্থগিতের আইন অনুমোদন করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। এর ফলে তেহরানের ক্ষতিগ্রস্ত পরমাণু কর্মসূচি পুনরায় চালুর যেকোনও উদ্যোগ ইরান গোপনে এগিয়ে নিতে পারে।
এক সপ্তাহ আগে ইরানের পার্লামেন্ট আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-র সঙ্গে সহযোগিতা স্থগিতের পক্ষে আইন পাস করে।
গেল বুধবার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ জানায়, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থা, সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আইনটি কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছেন।
ইরানের অভিযোগ, আইএইএ ইসরায়েলের সঙ্গে সহযোগিতা করেছে এবং সেই সুযোগে তেহরানের পরমাণু স্থাপনাগুলোর ওপর হামলার পথ তৈরি হয়েছে। তবে সংস্থাটি এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
আইএইএর সঙ্গে সব ধরনের সহযোগিতা স্থগিতের সিদ্ধান্ত কবে এবং কীভাবে কার্যকর হবে—তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে এই পদক্ষেপ ইরানকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ছাড়াই পরমাণু কর্মসূচি গোপনে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি)-র এর স্বাক্ষরকারী দেশ। এই চুক্তির আওতায় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পরমাণু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ কি না, তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের অনুমতি দিতে হয়।
আইএইএর একজন মুখপাত্র সিএনএনকে জানান, 'আমরা এই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে অবগত। তবে ইরানের পক্ষ থেকে আরও আনুষ্ঠানিক তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছি আমরা।'
ইরানের সিদ্ধান্তে বাড়ছে উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ইরানের সিদ্ধান্তকে 'অগ্রহণযোগ্য' বলে আখ্যা দিয়েছে। দপ্তরের মুখপাত্র ট্যামি ব্রুস বলেন, 'তেহরানের উচিত আর দেরি না করে পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতা নিশ্চিত করা।'
তিনি আরও বলেন, 'ইরানের সামনে এখনো পথ পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। তারা চাইলে শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে ফিরে যেতে পারে।'
এদিকে, ইরানের আইএইএর সঙ্গে সব ধরনের সহযোগিতা স্থগিতের সিদ্ধান্তকে 'বিপর্যয়কর' হিসেবে দেখছে জার্মানি।
বার্লিনে এক সংবাদ সম্মেলনে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মার্টিন গিসে বলেন, 'কূটনৈতিক সমাধানের জন্য ইরানের আইএইএর সঙ্গে কাজ করাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।'—খবর এএফপির।
জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টেফান দুজাররিকও এই পদক্ষেপকে 'উদ্বেগজনক' বলে উল্লেখ করে বুধবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এর আগেও ইরানকে আইএইএর সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
সম্প্রতি ইসরায়েল ইরানের সামরিক ও পরমাণু স্থাপনায় নজিরবিহীন হামলা চালায়, যার লক্ষ্য ছিল শীর্ষ সামরিক কমান্ডার, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র এবং পরমাণু বিজ্ঞানীরা। এর পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের নাতাঞ্জ, ইসফাহান ও ফোরদোতে 'সমর্থনমূলক' বিমান হামলা চালায়।
এই টানা ১২ দিনের সংঘাত শেষ হয় গত সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতির মধ্য দিয়ে। ইরান জানিয়েছে, হামলায় তাদের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবে তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অব্যাহত রাখবে এবং তাদের 'শান্তিপূর্ণ' পরমাণু কর্মসূচি চালিয়ে যাবে।
রবিবার আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের হামলাগুলো ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারেনি। সংস্থাটির মতে, তেহরান চাইলে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুনরায় শুরু করতে পারবে।
ইসরায়েল ইরানের পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালানোর কয়েক দিন আগেই আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে জানায়, তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ কি না—তা তারা নিশ্চিত করতে পারছে না।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইরান এমন মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে, যা অস্ত্র উৎপাদনের কাছাকাছি।
এই প্রতিবেদনের পর আইএইএ ইরানের বিরুদ্ধে একটি নিন্দা প্রস্তাব পাস করে, যা তেহরান সরকারের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। ইরানের অভিযোগ, সংস্থাটি এবং এর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি ইসরায়েল ও পশ্চিমাদের পক্ষ নিয়ে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বহুবার পরমাণু অস্ত্র তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ইসলাম ধর্মে গণবিধ্বংসী অস্ত্র নিষিদ্ধ।
২০১৮ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে একতরফাভাবে পরমাণু চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রাধীরে ধীরে বাড়াতে শুরু করে।
এই চুক্তিটি ২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসনের সময় স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে সীমাবদ্ধ রাখা।