ইরানজুড়ে বিশাল সরকারবিরোধী বিক্ষোভ; পুরো দেশে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ইন্টারনেট
ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করার মধ্যে ইরানে দেশজুড়ে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট চলছে বলে জানিয়েছে অনলাইন পর্যবেক্ষণ সংস্থা নেটব্লকস।
বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক পোস্টে নেটব্লকস উল্লেখ করেছে যে, এই ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা মূলত দেশজুড়ে চলা বিক্ষোভকে লক্ষ্য করে নেওয়া 'ধারাবাহিক ডিজিটাল সেন্সরশিপ ব্যবস্থার' অংশ। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে যে, এটি একটি সংকটময় মুহূর্তে জনসাধারণের যোগাযোগের অধিকারকে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।
জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং স্থানীয় মুদ্রার মান কমে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট ক্ষোভের মুখে ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইরানের বিভিন্ন শহরের মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছে।
ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে যে, ইরানের রাজধানী এবং অন্যান্য শহরে বিক্ষোভকারীদের বিশাল জনস্রোত মিছিল করছে। একে গত কয়েক বছরের মধ্যে দেশটির ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার বিরোধীদের সবচেয়ে বড় শক্তি প্রদর্শন বলা হচ্ছে।
বিবিসি পার্সিয়ান কর্তৃক যাচাইকৃত ভিডিওতে দেখা গেছে যে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তেহরান এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মাশহাদে বিক্ষোভগুলো শান্তিপূর্ণ ছিল এবং নিরাপত্তা বাহিনী সেগুলো ছত্রভঙ্গ করেনি।
মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর মতে, ইরানি মুদ্রার দরপতনের ফলে সৃষ্ট ক্ষোভ থেকে শুরু হওয়া এই অস্থিরতা টানা ১২তম দিনে পদার্পণ করেছে এবং এটি ইরানের ৩১টি প্রদেশের ১০০টিরও বেশি শহর ও জনপদে ছড়িয়ে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি এইচআরএএনএ জানিয়েছে, অন্তত ৩৪ জন বিক্ষোভকারী—যাদের মধ্যে পাঁচ জন শিশু—এবং নিরাপত্তা বাহিনীর আট জন সদস্য নিহত হয়েছেন এবং দুই হাজার ২৭০ জন বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
নরওয়েভিত্তিক পর্যবেক্ষক সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস আইএইচআর জানিয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে অন্তত ৪৫ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে আট জন শিশু রয়েছে।
বিবিসি পার্সিয়ান ২২ জনের মৃত্যু এবং পরিচয় নিশ্চিত করেছে, অন্যদিকে ইরানি কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা বাহিনীর ছয় জন সদস্যের মৃত্যুর খবর জানিয়েছে।
এএফপি সংবাদ সংস্থা স্থানীয় গণমাধ্যম ও সরকারি বিবৃতির বরাতে জানিয়েছে, বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ অন্তত ২১ জন নিহত হয়েছেন।
পরবর্তীতে একটি পর্যবেক্ষণ সংস্থা দেশব্যাপী ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের খবর দেয়। ভিডিও ফুটেজে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ক্ষমতাচ্যুতি এবং প্রয়াত সাবেক শাহের নির্বাসিত পুত্র রেজা পাহলভিকে ফিরিয়ে আনার দাবিতে স্লোগান দিতে শোনা গেছে বিক্ষোভকারীদের। উল্লেখ্য যে, রেজা পাহলভি আগেই তার সমর্থকদের রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
এদিকে অস্থির পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইরানি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে পরস্পরবিরোধী বার্তা এসেছে। তবে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বিক্ষোভ সামলাতে 'সর্বোচ্চ সংযম' দেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে এর আগে চলতি সপ্তাহে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বলেন, দাঙ্গাবাজদের 'তাদের উপযুক্ত জায়গায় রাখা' (দমন করা) উচিত। দেশটির প্রধান বিচারপতিও বিক্ষোভকারীদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সাথে 'তাল মিলিয়ে চলার' বা তাদের হয়ে কাজ করার অভিযোগ এনেছেন।
প্রধান বিচারপতি গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-এজেই বলেন, যারা 'অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে' তাদের প্রতি কোনো ধরনের নমনীয়তা দেখানো হবে না।
তিনি বলেন, 'যদি কেউ দাঙ্গা করতে বা অস্থিতিশীলতা তৈরির জন্য রাস্তায় নামে, কিংবা তাদের সমর্থন করে, তবে তাদের জন্য আর কোনো অজুহাত অবশিষ্ট থাকে না।' তিনি আরও বলেন, 'বিষয়টি এখন খুবই স্পষ্ট ও স্বচ্ছ। তারা এখন ইরান ইসলামী প্রজাতন্ত্রের শত্রুদের সাথে একযোগে কাজ করছে।'
এদিকে, চলতি সপ্তাহে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বিক্ষোভ-সংশ্লিষ্ট হতাহতের ঘটনা প্রতিরোধ করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন বলে তার মুখপাত্র সাংবাদিকদের জানান।
সোমবার এক ব্রিফিংয়ে স্টিফান দুজারিক বলেন, 'তিনি (জাতিসংঘ মহাসচিব) কর্তৃপক্ষকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংগঠনের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার সমুন্নত রাখার আহ্বানও জানিয়েছেন।'
তিনি আরও বলেন, 'সব ব্যক্তিকেই শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করার এবং নিজেদের অভিযোগ প্রকাশ করার সুযোগ দিতে হবে।'
ইরানে সর্বশেষ ২০২২ ও ২০২৩ সালে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখা যায়, ২২ বছর বয়সী মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর। নারীদের জন্য দেশের কঠোর পোশাকবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তিনি পুলিশ হেফাজতে মারা যান।
বিক্ষোভের বর্তমান ঢেউয়ের মধ্যে মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো ইরানি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আহত বিক্ষোভকারীদের আটক করতে হাসপাতালে অভিযান চালানোর মতো কৌশল অবলম্বনের অভিযোগ এনেছে।
মঙ্গলবার অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানায়, নিরাপত্তা বাহিনী পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর ইলামের ইমাম খোমেনি হাসপাতালে প্রবেশ করে টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করেছে, দরজা ভাঙচুর করেছে এবং চিকিৎসা কর্মীদেরসহ ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের ওপর হামলা চালিয়েছে।
সংস্থাটি বলেছে, 'ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীকে অবশ্যই বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ এবং আগ্নেয়াস্ত্রের বেআইনি ব্যবহার অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ব্যক্তিদের নির্বিচারে গ্রেপ্তার করা বন্ধ করতে হবে, আহতরা যাতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পায় তা নিশ্চিত করতে হবে এবং চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোর পবিত্রতাকে সম্মান করতে হবে।'
