বিক্ষোভে উত্তাল ইরান: দ্বিতীয় রাতেও রাজপথে হাজারো মানুষ
শীর্ষ নেতৃত্বের কঠোর হুঁশিয়ারি এবং দেশজুড়ে সম্পূর্ণ ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট সত্ত্বেও ইরানে দ্বিতীয় রাতের মতো সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। শুক্রবার রাতে রাজধানী তেহরানসহ দেশটির প্রধান শহরগুলোতে হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে এসে বর্তমান শাসনব্যবস্থা অবসানের দাবিতে স্লোগান দেয়।
বিবিসি পার্সিয়ান টেলিভিশনে প্রচারিত ভিডিওতে দেখা গেছে, রাজধানী তেহরানের রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ মিছিল করছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, এই বিক্ষোভে শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত; সব শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণ দেখা গেছে।
উত্তর তেহরানের অভিজাত এলাকা সাদাত আবাদ-এর এক বাসিন্দা জানান, বিক্ষোভকারীরা একটি মসজিদে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির আমলের রাজকীয় পতাকা প্রদর্শন করে। লদান (৬০) নামের ওই নারী জানান, সরকারি প্রতিহিংসার ভয়ে তিনি কেবল নিজের প্রথম নাম প্রকাশ করতে চান। তিনি টানা দ্বিতীয় রাতের মতো বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন।
নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং বিবিসি পার্সিয়ান কর্তৃক যাচাইকৃত ভিডিও এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, বিক্ষোভ কেবল তেহরানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মাশহাদ, তাবরিজ, উরমিয়া, ইসফাহান, কারাজ এবং ইয়াজদসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, জ্বলন্ত আবর্জনার স্তূপ ও আগুনের কুণ্ডলীর পাশে দাঁড়িয়ে বিশাল জনতা গত প্রায় ৫০ বছরের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসনের অবসানের দাবিতে স্লোগান দিচ্ছে।
বিক্ষোভকারীরা 'স্বৈরাচারের মৃত্যু চাই' এবং 'শাহ দীর্ঘজীবী হোক' বলে স্লোগান দেয়। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দিকে ইঙ্গিত করে তারা স্লোগান দেয়— 'এটি রক্তের বছর, সাইয়্যেদ আলির পতন হবে।' এর আগে শুক্রবার এক ভাষণে খামেনি বিক্ষোভকারীদের 'দাঙ্গাবাজ' হিসেবে অভিহিত করে দাবি করেন, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হয়ে কাজ করছে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের এক উপস্থাপক বিক্ষোভকারীদের সতর্ক করে বলেন, 'রাস্তায় নামলে তাদের জীবনের ঝুঁকি রয়েছে'। তিনি বলেন, 'আজকের রাতটি মা-বাবাদের জন্য তাদের সন্তানদের বাইরে যাওয়া থেকে বিরত রাখার রাত। যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, কেউ আহত হয় বা গুলি চলে; তবে অভিযোগ করবেন না।'
তেহরানের বাসিন্দা প্রকৌশলী আমির রেজা (৪২) জানান, তিনি বন্দুকের গুলি এবং সাউন্ড বোমার প্রচণ্ড শব্দ শুনতে পেয়েছেন। তিনি বলেন, 'দাঙ্গা পুলিশ ও সাদা পোশাকে থাকা মিলিশিয়ারা ফাঁকা গুলি ছুড়ে ভিড় ছত্রভঙ্গ করতে শুরু করলে তিনি বাসায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।'
মূলত গত মাসের শেষের দিকে তেহরানের কেন্দ্রীয় বাজারে মুদ্রার দরপতন এবং চরম মুদ্রাস্ফীতির প্রতিবাদে এই বিক্ষোভ শুরু হয়। তবে দ্রুতই তা দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক ধর্মীয় শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভে রূপ নেয়।
ইস্তাম্বুল থেকে এএনটি টিভির পরিচালক এলিয়ার কামরানি জানান, উত্তর-পশ্চিম ইরানে শনিবারও বড় ধরনের বিক্ষোভের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি জানান, নিরাপত্তা বাহিনী একদিকে বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা চালাচ্ছে, আবার অন্যদিকে অর্থনৈতিক দুর্দশার প্রতি সহানুভূতি দেখিয়ে তাদের ঘরে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করছে। কামরানি বলেন, 'মানুষ বলছে আমাদের হারানোর আর কিছু নেই।'
বিক্ষোভ ঠেকাতে ইরান সরকার শুক্রবার প্রায় সব ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দেয়। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বিক্ষোভকারীরা যাতে সংগঠিত হতে না পারে এবং বাইরের বিশ্বে তথ্য পাঠাতে না পারে, সেজন্য ইন্টারনেট ও আন্তর্জাতিক কল ব্লক করা হয়েছে। এমনকি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত বার্তা সংস্থা ইরনা'র ওয়েবসাইটও বন্ধ হয়ে যায়। কেবল রেভল্যুশনারি গার্ডসের ঘনিষ্ঠ ফারস ও মেহর নিউজ এজেন্সি সংবাদ প্রচার করছিল।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীদের দমনে নিরাপত্তা বাহিনী আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করছে এবং নির্বিচারে গ্রেফতার চালাচ্ছে। এখন পর্যন্ত অন্তত ২৮ জন বিক্ষোভকারী ও পথচারী নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে শিশুও আছে। তবে প্রবাসে থাকা অন্যান্য মানবাধিকার গোষ্ঠী এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলে দাবি করেছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমস কর্তৃক যাচাইকৃত একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, তেহরানের আল-গাদির হাসপাতালের মেঝেতে অন্তত সাতজন নিথর হয়ে পড়ে আছেন, যাদের মৃত বলে মনে হচ্ছে। ভিডিওর বর্ণনাকারী বলছিলেন, 'তারা মানুষকে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত বুলেট দিয়ে হত্যা করেছে।'
তথ্যের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ সত্ত্বেও স্টারলিঙ্ক স্যাটেলাইট সংযোগ ব্যবহার করে কিছু ভিডিও ও তথ্য বাইরে আসছে। লস অ্যাঞ্জেলেস ভিত্তিক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মেহেদি ইয়াহইয়ানেজাদ জানান, ২০২২ সালের নারী জাগরণের পর প্রায় ৩০০টি স্টারলিঙ্ক টার্মিনাল ইরানে পাঠানো হয়েছিল, এখন সেই সংখ্যা কয়েক হাজারে দাঁড়িয়েছে। তিনি জানান, সরকার স্টারলিঙ্ক বিচ্ছিন্ন করতে তেহরানে জিপিএস জ্যাম করার চেষ্টা করছে।
