যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য তদন্তের আওতায় বাংলাদেশসহ প্রধান রপ্তানিকারকরা
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর) বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি অর্থনীতির উৎপাদন খাত নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। তাদের দাবি, এসব দেশে কাঠামোগত অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা ও অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে। এমনটা হচ্ছে কি-না তা তা খতিয়ে দেখতেই এই তদন্ত।
যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইন-এর ৩০১ ধারার আওতায় এই তদন্ত শুরু করা হয়েছে। তদন্তাধীন ১৭টি অর্থনীতির মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, মেক্সিকো, সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে ও তাইওয়ান।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রেজিস্টার-এ প্রকাশিত নোটিশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সরকার রপ্তানি খাতে যে নগদ প্রণোদনা দেয়, তা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের পক্ষে কয়েক বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি করতে ভূমিকা রেখেছে—এমন অভিযোগ তদন্তের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
নোটিশে বলা হয়, "বাংলাদেশে কাঠামোগত অতিরিক্ত সক্ষমতা ও উৎপাদনের প্রমাণ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পণ্য বাণিজ্যে বাংলাদেশের উদ্বৃত্ত প্রায় ৬.১৫ বিলিয়ন ডলার, যার বড় অংশই টেক্সটাইল খাতের রপ্তানি থেকে এসেছে। বাংলাদেশ সরকার ৪৩টি খাতে রপ্তানি প্রণোদনা হিসেবে নগদ সহায়তা দিয়ে থাকে। এর মধ্যে দেশীয় টেক্সটাইল ও চামড়াজাত পণ্য খাতও অন্তর্ভুক্ত।"
এ ছাড়া বাংলাদেশের সিমেন্ট শিল্প উল্লেখযোগ্য অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম বড় মন্দার মুখে পড়েছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে সিমেন্টের ব্যবহার নেমে এসেছে ৩৮ মিলিয়ন টনে, যা দেশের মোট উৎপাদন সক্ষমতার ৪০ শতাংশেরও কম। ২০২৫ সালে এই ব্যবহার আরও কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বুধবার (১১ মার্চ) দেওয়া এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বলেন, সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিগুলোর নীতি ও কার্যক্রম "অযৌক্তিক বা বৈষম্যমূলক" কি না এবং তা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের ওপর কোনো ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে কি না—এই তদন্তে তা মূল্যায়ন করা হবে।
ইউএসটিআর-এর মতে, তদন্তে মূলত দেখা হবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নীতি, পদক্ষেপ বা উৎপাদনকাঠামো যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের জন্য অযৌক্তিক বা বৈষম্যমূলক কি না এবং সে কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না।
বিবৃতিতে গ্রিয়ার বলেন, অন্য দেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্র নিজের শিল্প সক্ষমতা বিনষ্ট হতে দেবে না। অর্থাৎ এমন পরিস্থিতি তারা আর মেনে নেবে না, যেখানে অন্য দেশগুলো তাদের অতিরিক্ত উৎপাদনের চাপ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ঠেলে দেবে। তাঁর মতে, এ তদন্ত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শিল্প খাত পুনরুজ্জীবন নীতির অংশ। এর লক্ষ্য হলো, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সরবরাহব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনা এবং উৎপাদন খাতে উচ্চ বেতনের কর্মসংস্থান তৈরি করা।
গ্রিয়ার আরও বলেন, অনেক দেশের উৎপাদন সক্ষমতা তাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। ফলে অতিরিক্ত উৎপাদিত পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় উৎপাদন প্রতিযোগিতার মুখে ফেলে। সে দেশে নতুন বিনিয়োগ ও উৎপাদন সম্প্রসারণও বাধাগ্রস্ত হয়। এসব কারণে ট্রাম্প প্রশাসনের পুনঃ শিল্পায়নের নীতি ব্যাহত হচ্ছে।
৩০১ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কোনো বিদেশি সরকারের নীতি বা কর্মকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের জন্য অযৌক্তিক বা বৈষম্যমূলক হলে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিক্রিয়ামূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। বাণিজ্য আইনের ৩০২(খ) ধারায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তর ৩০১ ধারাবলে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে এ ধরনের তদন্ত শুরু করতে পারে।
তদন্ত শুরু হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক পরামর্শের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ইতিমধ্যে তালিকাভুক্ত দেশের সরকারগুলোর কাছে আলোচনার অনুরোধ পাঠানো হয়েছে।
এ তদন্ত নিয়ে ১৭ মার্চ থেকে মতামত দেওয়া যাবে। আগ্রহী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে লিখিত মতামত, শুনানিতে অংশগ্রহণের আবেদন ও সাক্ষ্যের সারসংক্ষেপ জমা দিতে হবে। আগামী ৫ মে এ বিষয়ে গণশুনানি শুরু হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশ প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য রপ্তানি করে। এর মধ্যে তৈরি পোশাক খাতই সবচেয়ে বড় অংশ জুড়ে রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার এই খাতে নগদ প্রণোদনা দিলেও তা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অতিরিক্ত উৎপাদন বা বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেনি।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সাবেক সদস্য মোস্তফা আবিদ খান টিবিএস-কে বলেন, "বাংলাদেশ যে প্রণোদনা দেয়, তা বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার নীতিমালা কাঠামোর মধ্যেই পড়ে। তবে প্রশ্ন উঠতেই পারে—এই প্রণোদনা কি অতিরিক্ত উৎপাদনকে উৎসাহিত করছে।"
তিনি আরও বলেন, "আমার মনে হয় না সরকারের দেওয়া সহায়তার মাত্রা এমন যে তা অতিরিক্ত উৎপাদনকে উৎসাহিত করছে।"
