ট্রাম্পকে খুশি করতে বিক্ষোভকারীরা ‘নিজেদের রাস্তাঘাট ধ্বংস করছে’: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা
ইরানের রাজপথে চলমান গণবিক্ষোভের মুখে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। শুক্রবার তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর কঠোর দমন-পীড়ন চালাবে। এদিকে, বিক্ষোভকারীরা রাতভর ভবনের জানালা থেকে স্লোগান দিয়ে এবং মিছিলের মাধ্যমে সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থনের প্রতিশ্রুতিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন।
ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ভাষণে খামেনি ট্রাম্পকে এমন এক ব্যক্তি হিসেবে অভিহিত করেন যার হাত 'ইরানিদের রক্তে রঞ্জিত'। এ সময় তার সমর্থকরা 'আমেরিকা নিপাত যাক!' বলে স্লোগান দিতে থাকেন।
বিক্ষোভকারীদের সমালোচনা করে খামেনি বলেন, "বিক্ষোভকারীরা অন্য দেশের প্রেসিডেন্টকে খুশি করতে নিজেদের রাস্তাঘাট ধ্বংস করছে।" খামেনির এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে ওয়াশিংটন থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে ট্রাম্প তাঁর আগের অবস্থানে অনড় থেকে জানিয়েছেন, বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে তিনি ইরানে হামলা চালাবেন।
ইরানের বর্তমান সরকার দেশটিতে ইন্টারনেট এবং আন্তর্জাতিক টেলিফোন যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। তবে অ্যাক্টিভিস্টদের শেয়ার করা কিছু ভিডিওতে দেখা গেছে, রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীরা আগুনের কুণ্ডলী পাকিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছে। রাস্তায় যত্রতত্র ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে রয়েছে। অন্যদিকে, ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের "সন্ত্রাসী এজেন্টরা" এসব অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতা উসকে দিয়েছে। বিস্তারিত তথ্য না জানিয়েই তারা 'হতাহতের' খবর নিশ্চিত করেছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় বিক্ষোভের প্রকৃত চিত্র এখনও অস্পষ্ট। তবে রুগ্ন অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন বর্তমানে কয়েক বছরের মধ্যে ইরান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই বিক্ষোভকে সাবেক যুবরাজ রেজা পাহলভির জনসমর্থন পরীক্ষার প্রথম মাধ্যম হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাহলভির বাবা ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের ঠিক আগে দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন। পাহলভি বৃহস্পতিবার রাতে বিক্ষোভের ডাক দেওয়ার পর শুক্রবার রাত ৮টাতেও পুনরায় আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অনেকের কণ্ঠে সাবেক শাহর সমর্থনে স্লোগান শোনা গেছে। অতীতে এর জন্য মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান থাকলেও বর্তমানে অর্থনীতির দুর্দশায় ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এটি দেখা যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা 'হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি'র তথ্যমতে, সাম্প্রতিক এই সহিংসতায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৪২ জন নিহত হয়েছেন এবং ২ হাজার ২৭০ জনেরও বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির সিনিয়র ফেলো হলি ড্যাগ্রেস বলেন, "সাবেক যুবরাজ রেজা পাহলভির বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার রাত ৮টায় রাজপথে নামার আহ্বান বিক্ষোভের গতিপ্রকৃতি বদলে দিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট থেকে এটা স্পষ্ট যে, ইরানিরা ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে উৎখাত করার এই আহ্বানকে গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে।"
তিনি আরও যোগ করেন, "ঠিক এই কারণেই ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছে যাতে বিশ্ব এই প্রতিবাদ দেখতে না পারে। দুর্ভাগ্যবশত, এটি নিরাপত্তা বাহিনীকে নির্বিচারে বিক্ষোভকারীদের হত্যার সুযোগ করে দিতে পারে।"
ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগের চিত্র
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বৃহস্পতিবার রাত ৮টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে তেহরানের বিভিন্ন এলাকা "স্বৈরশাসক নিপাত যাক!" এবং "ইসলামি প্রজাতন্ত্র নিপাত যাক!" স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে। কেউ কেউ পাহলভির ফেরার দাবিতে স্লোগান দিয়ে বলেন, "এটিই শেষ যুদ্ধ! পাহলভি ফিরে আসবেন!" যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষকে রাস্তায় দেখা গেছে।
পাহলভি এক বার্তায় বলেন, "ইরানিরা আজ তাদের স্বাধীনতা দাবি করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানের শাসকগোষ্ঠী সব ধরনের যোগাযোগের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। তারা ইন্টারনেট ও ল্যান্ডলাইন কেটে দিয়েছে, এমনকি স্যাটেলাইট সিগন্যাল জ্যাম করার চেষ্টা করছে।"
উরোপীয় নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, "প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে যোগ দিয়ে আপনারা শাসকগোষ্ঠীকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করুন। ইরানের জনগণের কণ্ঠস্বর যাতে স্তব্ধ না হয়, সে জন্য সব ধরণের প্রযুক্তিগত ও কূটনৈতিক সম্পদ ব্যবহার করে যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করুন।"
উল্লেখ্য, পাহলভি অতীতে ইসরায়েলের সমর্থন পাওয়ার কারণে সমালোচিত হয়েছিলেন। বিশেষ করে গত জুনে ইরানের ওপর ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধের পর এ সমালোচনা তীব্র হয়।
ট্রাম্পের নতুন হুঁশিয়ারি
নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের ধকল সইতে থাকা ইরানের মুদ্রা 'রিয়াল'-এর মান ডিসেম্বরে মারাত্মকভাবে পড়ে যায়। এরপরই আন্দোলন শুরু হয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত সপ্তাহে সতর্ক করেছিলেন যে, ইরান সরকার 'শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যা করলে' আমেরিকা তাদের রক্ষায় এগিয়ে আসবে।
বৃহস্পতিবার এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, "ইরানকে অত্যন্ত কঠোরভাবে বলে দেওয়া হয়েছে যে, তারা যদি এটি করে (বিক্ষোভকারীদের হত্যা) তবে তাদের জাহান্নামের মাসুল দিতে হবে।"
পাহলভির সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন কি না এমন প্রশ্নে ট্রাম্প কৌশলী উত্তর দেন। তিনি বলেন, "প্রেসিডেন্ট হিসেবে এ মুহূর্তে এটি করা উপযুক্ত হবে কি না তা আমি নিশ্চিত নই। আমি মনে করি সবাইকে রাজপথে যেতে দেওয়া উচিত এবং আমরা দেখব কে সামনে আসে।"
এছাড়া ফক্স নিউজকে দেওয়া অন্য এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন যে, ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি হয়তো ইরান ছাড়ার পথ খুঁজছেন। ট্রাম্প বলেন, "তিনি কোথাও যাওয়ার জায়গা খুঁজছেন। পরিস্থিতি খুব খারাপের দিকে যাচ্ছে।"
