গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের শুল্ক আরোপ কেন ইউরোপের জন্য তেমন বড় কোনো ধাক্কা নয়
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের হুমকি এখন আর ইউরোপীয়দের কাছে কোনো নতুন বা আঁতকে ওঠার মতো খবর নয়। তাঁরা জানেন, ট্রাম্প শুল্ককে ব্যবহার করেন মার্কিন বাজারে প্রবেশের 'ফি' অথবা প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার হাতিয়ার হিসেবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই ইউরোপীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো সম্ভাব্য শুল্ক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। তারা তাদের সাপ্লাই চেইন ও বিপণন ব্যবস্থাতেও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনেছে।
বর্তমানে আমেরিকার বাজারে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ এবং ব্রিটিশ পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর রয়েছে। তবে নতুন করে আপদ হয়ে দেখা দিয়েছে ট্রাম্পের অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্কের হুমকি। গ্রিনল্যান্ডে সামান্য কিছু সেনা পাঠানোর 'শাস্তি' হিসেবে নরডিক দেশগুলোসহ জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস ও ব্রিটেনের ওপর এই শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন তিনি। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উত্তেজনা আর না বাড়লে শুল্কের এই বোঝা খুব একটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে না।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রায় ৫২ হাজার ৩০০ কোটি ইউরোর পণ্য আমেরিকায় রপ্তানি করেছে। বিপরীতে আমেরিকা থেকে আমদানি করেছে ৩৬০ বিলিয়ন ইউরোর পণ্য। এক বছর আগের তুলনায় এই রপ্তানি কিছুটা কমলেও আমদানি বেড়েছে। তবে এই রপ্তানি কমে যাওয়ার পেছনে শুল্কের প্রভাব ঠিক কতটা, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
কিল ইনস্টিটিউট নামের একটি থিঙ্ক-ট্যাঙ্কের গবেষণা বলছে, শুল্কের কারণে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর চেয়ে আমেরিকানরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বর্তমান শুল্কের প্রায় ৯৬ শতাংশ খরচ বহন করতে হচ্ছে আমেরিকার আমদানিকারক ও সাধারণ ভোক্তাদের। ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যের দাম খুব একটা পরিবর্তন করেনি।
গবেষকদের মতে, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হলে ইইউ-এর জিডিপি বা উৎপাদন কমবে মাত্র ০.০৪ শতাংশ এবং আমেরিকার কমবে ০.০২ শতাংশ। তবে ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, ইউরোপ যদি গ্রিনল্যান্ড ছেড়ে দিতে রাজি না হয়, তবে আগামী গ্রীষ্মের মধ্যে এই শুল্ক বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হবে। এমনটি হলেও ইইউ-এর ক্ষতি হবে বড়জোর ০.০৮ শতাংশ এবং আমেরিকার ০.০৬ শতাংশ। অর্থাৎ, এই শুল্ক যুদ্ধের কারণে বড় কোনো মন্দার আশঙ্কা এখনই দেখা যাচ্ছে না।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্ক আরোপের হুমকিতে ইউরোপের সব খাত সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও কিছু নির্দিষ্ট শিল্পখাত বেশ বড় ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে গাড়ি নির্মাণ ও স্বাস্থ্য খাতের কোম্পানিগুলো এখন গভীর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। চাপের মুখে থাকা দেশগুলোর রাজনৈতিক নেতারাও এখন এর পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছেন।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের এপ্রিল-অক্টোবর সময়ের তুলনায় ২০২৫ সালের একই সময়ে আমেরিকায় ইউরোপীয় শিল্প-সরঞ্জাম রপ্তানি ৪ শতাংশ কমেছে। অথচ এই সময়ে অন্যান্য দেশ থেকে আমেরিকার সামগ্রিক আমদানি বেড়েছে ১১ শতাংশ। গাড়ির ক্ষেত্রে এই চিত্র আরও ভয়াবহ। ইউরোপ থেকে আমেরিকার গাড়ি ও অন্যান্য যানবাহন আমদানি কমেছে প্রায় ৩২ শতাংশ। শুল্কের এই চাপ সামলাতে অনেক বড় কোম্পানি এখন তাদের সাপ্লাই চেইনে পরিবর্তন আনছে। তারা সরাসরি আমেরিকার মাটিতেই পণ্য সংযোজন বা তৈরির কাজ বাড়িয়েছে, যাতে বাড়তি শুল্ক এড়ানো যায়।
মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক মর্গান স্ট্যানলির মতে, ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো আমেরিকা থেকে যে আয় করে, তার বড় অংশই এখন সেখানে উৎপাদিত বা সংযোজিত পণ্য থেকে আসে। তবে কিছু খাত এখনো পুরোপুরি বিদেশের ওপর নির্ভরশীল।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা বা ওষুধ কোম্পানিগুলো। ইউরোপের বড় ওষুধ কোম্পানিগুলোর মোট বিক্রির প্রায় ৪০ শতাংশই আসে আমেরিকার বাজার থেকে। জিএসকে এবং নোভো নরডিস্কের মতো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই আয়ের পরিমাণ প্রায় অর্ধেক। যদিও বর্তমানে অনেক ওষুধ শুল্কমুক্ত সুবিধায় রয়েছে, তবে ট্রাম্পের নতুন ঘোষণায় সেই সুবিধা থাকবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না।
অন্যদিকে, গাড়ি নির্মাতাদের অবস্থা আরও সংকটাপন্ন। ইউরোপের পাঁচটি বড় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান প্রতি বছর আমেরিকা থেকে প্রায় ২০ হাজার কোটি ডলার আয় করে। যেসব কোম্পানির আমেরিকায় নিজস্ব কারখানা নেই, তারাই সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছে। যেমন—২০২৫ সালে আমেরিকায় অডি'র বিক্রি কমেছে ২৭ শতাংশ। তবে সবচেয়ে বড় ধস নেমেছে বিলাসবহুল গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান পোরশে'র ব্যবসায়। ২০২৫ সালে কোম্পানিটির পরিচালন মুনাফা ৯ সে শতাংশ কমে গেছে। শুল্ক যুদ্ধের এই প্রভাবকে পোরশে'র জন্য একটি 'বিপর্যয়কর বছর' হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকের হিসাব অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) আমেরিকায় ৫২৩ বিলিয়ন ইউরোর পণ্য রপ্তানি করেছে। বর্তমানে ইইউ পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ এবং ব্রিটিশ পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর রয়েছে। কিল ইনস্টিটিউটের এক গবেষণা বলছে, এই শুল্কের ৯৬ শতাংশ ধকল পোহাতে হচ্ছে খোদ আমেরিকার আমদানিকারক ও ভোক্তাদের। ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যের দাম খুব একটা বাড়ায়নি।
ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, ইউরোপ যদি গ্রিনল্যান্ড ছেড়ে দিতে রাজি না হয়, তবে আগামী গ্রীষ্মের মধ্যে এই শুল্ক বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এতে দুই পক্ষেরই জিডিপি কিছুটা কমলেও তা বড় কোনো মন্দার কারণ হবে না।
ট্রাম্পের শুল্কের জবাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নও ২১ বিলিয়ন ও ৭২ বিলিয়ন ইউরোর দুটি আলাদা 'পাল্টা শুল্ক' তালিকা তৈরি করে রেখেছে। আমেরিকার যেসব এলাকায় রিপাবলিকানদের সমর্থন বেশি, সেসব এলাকার পণ্যকে লক্ষ্যবস্তু করছে ইউরোপ। যেমন—আমেরিকার 'কেন্টাকি বার্বন' হুইস্কির ওপর শুল্ক বসিয়ে আইরিশ হুইস্কিকে সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে ইইউ।
বাণিজ্যযুদ্ধ কেবল শুল্কে সীমাবদ্ধ না থাকলে ইউরোপ আরও কঠোর হতে পারে। ইইউ এমন কিছু পণ্যের রপ্তানি বন্ধ করে দিতে পারে যার বিকল্প আমেরিকার কাছে নেই। যেমন,
চিপ নির্মাণ: উন্নত চিপ তৈরির মেশিন বা লিথোগ্রাফি মেশিনের ক্ষেত্রে নেদারল্যান্ডসের কোম্পানি এএসএমএল (ASML)-এর একক আধিপত্য রয়েছে।
উড়োজাহাজ: এয়ারবাসের বিকল্প পাওয়া আমেরিকার জন্য কঠিন হবে।
প্রযুক্তি জায়ান্ট: গুগল বা মেটার মতো মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্টদের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ বা সরকারি কাজ থেকে তাদের বাদ দেওয়ার হুমকিও দিয়ে রেখেছে ইইউ।
অর্থনৈতিক এই লড়াই এখন কেবল শুল্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন গ্রিনল্যান্ড দখল ও আটলান্টিক পাড়ের দুই শক্তির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে ইউরোপের হাতে কিছু অস্ত্র থাকলেও সেগুলো ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা অনেক। আমেরিকায় ইউরোপীয়দের বিপুল সম্পদ ও বিনিয়োগ রয়েছে। অনেকে মনে করতে পারেন, এই সম্পদ বিক্রি করে দিয়ে আমেরিকার বাজারে ধস নামানো সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে এটি করা প্রায় অসম্ভব। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বা সরকারি বন্ড গণহারে বিক্রি করার আইনি ক্ষমতা ইউরোপীয় দেশগুলোর সরকারের হাতে নেই। তাছাড়া এসব সম্পদ বিক্রি করতে চাইলে বড় ক্রেতা খুঁজে পাওয়াও এক কঠিন চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে, পাল্টা আঘাত দেওয়ার ক্ষেত্রে আমেরিকার ক্ষমতা অনেক বেশি। আমেরিকা যদি সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি বন্ধ করে দেয়, তবে ইউরোপের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংকটে পড়বে। বর্তমানে ইউরোপের প্রযুক্তি খাত আমেরিকার 'ক্লাউড' সেবা ও ডিজিটাল সিস্টেমের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ট্রাম্প প্রশাসন চাইলে এসব ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করে ইউরোপকে অচল করে দিতে পারে। এছাড়া বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলারের আধিপত্য এবং আমেরিকার শক্তিশালী আর্থিক ব্যবস্থার কারণে ইউরোপীয় ব্যাংক ও ব্যবসাগুলোও বিপদে পড়তে পারে। এর বাইরে ইউক্রেনকে সামরিক ও গোয়েন্দা তথ্য সহায়তা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি তো রয়েছেই। সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, পাল্টাপাল্টি লড়াইয়ে ইউরোপের চেয়ে আমেরিকার হাতেই নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি বেশি।
তবে একটি জায়গায় ইউরোপের মোক্ষম এক সুযোগ রয়েছে, আর তা হলো 'ফুটবল'। এই গ্রীষ্মে আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকোতে ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে ইউরোপ এবং দক্ষিণ আমেরিকান দেশগুলোই হলো আসল আকর্ষণ। এই দেশগুলো ছাড়া বিশ্বকাপ তার জৌলুস হারাবে। ইউরোপীয় দেশগুলো যদি এই টুর্নামেন্টে অংশ না নেওয়ার বা বয়কট করার হুমকি দেয়, তবে তা ডোনাল্ড ট্রাম্পের আত্মমর্যাদায় এক বড় আঘাত হবে। অর্থনৈতিকভাবে খুব একটা ক্ষতি না হলেও বিশ্বমঞ্চে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্মানের প্রশ্নে এটি হতে পারে ইউরোপের সবচেয়ে বড় তুরুপের তাস।
