পাকিস্তান কেন বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের কাছে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান বিক্রি করছে?
নতুন বছরের শুরুতেই বাংলাদেশের কাছে নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান বিক্রির বিষয়ে ইঙ্গিত দেয় পাকিস্তান। দেশটির বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল জাহির আহমেদ বাবর সিধুর সঙ্গে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খানের বৈঠকের পর এই সম্ভাবনার কথা জানায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী।
পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বৈঠকে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর যুদ্ধকৌশল ও ইতিহাসের প্রশংসা করেছেন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রধান।
একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর 'পুরোনো হয়ে আসা' যুদ্ধবিমানের বহর আধুনিকায়ন এবং আকাশসীমার নজরদারি বাড়াতে আকাশপ্রতিরক্ষা রাডার ব্যবস্থা যুক্ত করার বিষয়ে পাকিস্তানের সহযোগিতা চেয়েছেন। আইএসপিআরের ওই বিবৃতিতে বলা হয়, এই বৈঠকের পর জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান বিক্রির চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
গত ৬ জানুয়ারি প্রকাশিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, সুপার মুশাক প্রশিক্ষণ বিমান দ্রুত বাংলাদেশকে সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়েও 'বিস্তারিত আলোচনা' হয়েছে।
হালকা ওজনের সুপার মুশাক বিমানটিতে একটি ইঞ্জিন থাকে। পাইলটদের প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহৃত দুই থেকে তিন সিটের এই বিমানটি বর্তমানে আজারবাইজান, তুরস্ক, ইরান, ইরাকসহ দশটিরও বেশি দেশের বিমানবহরে রয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ ছাড়াও সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান নিয়ে আলোচনার খবর পাওয়া গেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি আরব পাকিস্তানের কাছে ২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ পায়। এই ঋণের অর্থ জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান বিক্রির চুক্তিতে রূপান্তর করতে দুই দেশ আলোচনা চালাচ্ছে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে দুই দীর্ঘদিনের মিত্র দেশের মধ্যে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই এই খবর এল।
এর আগে গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে খবর ছড়িয়েছিল, লিবিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠী 'লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি'র (এলএনএ) সঙ্গে ৪ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি করেছে পাকিস্তান। ওই চুক্তির আওতায় এক ডজনেরও বেশি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান বিক্রির কথা রয়েছে।
তবে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এখন পর্যন্ত লিবিয়া বা সৌদি আরবের সঙ্গে কোনো চুক্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও এখনো কোনো চুক্তি সই হয়নি, কেবল 'আগ্রহ' প্রকাশ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ২৫ থেকে ৩০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানটি তুলনামূলক সস্তা হওয়ায় গত এক দশকে নাইজেরিয়া, মিয়ানমার ও আজারবাইজান এটি নিজেদের বহরে যুক্ত করেছে। ২০২৫ সালের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি পাকিস্তানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সুনাম বাড়ায়, যা এই যুদ্ধবিমানের চাহিদা তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।
গত মে মাসে কাশ্মীর সীমান্তে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনব্যাপী তীব্র বিমানযুদ্ধ হয়। ভারতশাসিত কাশ্মীরে বন্দুকধারীদের গুলিতে ২৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার জের ধরে এই সংঘাতের সূত্রপাত। ভারত এই হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করলেও ইসলামাবাদ তা অস্বীকার করে। পাল্টাপাল্টি মিসাইল ও ড্রোন হামলায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পরিস্থিতি।
পাকিস্তান দাবি করে, ওই আকাশযুদ্ধে তারা ভারতের বেশ কয়েকটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। শুরুতে অস্বীকার করলেও পরে ভারতীয় কর্মকর্তারা ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করেন, তবে কতটি বিমান খোয়া গেছে তা স্পষ্ট করেননি।
পাকিস্তান বিমানবাহিনীর (পিএএফ) সাবেক এয়ার কমোডর আদিল সুলতান বলেন, 'পশ্চিমা ও রুশ প্রযুক্তির অনেক দামি যুদ্ধবিমানের বিরুদ্ধে পিএএফ যে দক্ষতা দেখিয়েছে, তা জেএফ-১৭ এর প্রতি অনেক দেশের আগ্রহ বাড়িয়েছে।'
ঐতিহ্যগতভাবে ভারতীয় বিমানবাহিনী (আইএএফ) ফরাসি মিরাজ-২০০০ এবং রাশিয়ার সু-৩০ জেটের ওপর নির্ভরশীল। তবে ২০২৫ সালের ওই লড়াইয়ে তারা ফরাসি রাফাল যুদ্ধবিমানও ব্যবহার করেছিল।
অন্যদিকে পাকিস্তান ওই লড়াইয়ে তাদের বহরে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের এফ-১৬ ফাইটিং ফ্যালকন এবং চীন থেকে সদ্য কেনা জে-১০সি ভিগোরাস ড্রাগনের পাশাপাশি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমানও ব্যবহার করে। পিএএফের তথ্যমতে, তাদের ৪২টি যুদ্ধবিমান ভারতের ৭২টি বিমানের মোকাবিলা করেছিল।
স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, এই জেএফ-১৭ থান্ডার আসলে কেমন বিমান? এর সক্ষমতাই–বা কী, আর কেনই–বা এতগুলো দেশ এর প্রতি ঝুঁকছে?
কী আছে জেএফ-১৭ থান্ডারে?
জেএফ-১৭ থান্ডার হলো হালকা ওজনের, সব ধরনের আবহাওয়ায় ব্যবহার উপযোগী 'মাল্টি-রোল' যুদ্ধবিমান। পাকিস্তান অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্স (পিএসি) এবং চীনের চেংডু এয়ারক্রাফট করপোরেশন (সিএসি) যৌথভাবে এটি তৈরি করে।
নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে বিমানটি তৈরির জন্য পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে চুক্তি হয়। ২০০০ সালের শুরুর দিকে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের কামরা এলাকার পিএসিতে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়।
এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত পাকিস্তান বিমানবাহিনীর এক অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমোডর নাম প্রকাশ না করার শর্তে আল–জাজিরাকে বলেন, বিমানটির ৫৮ শতাংশ কাজ হয় পাকিস্তানে এবং ৪২ শতাংশ চীনে।
তিনি জানান, 'বিমানের সামনের কাঠামো (ফিউজলেজ) ও পেছনের লেজ তৈরি হয় পাকিস্তানে। আর মাঝের ও পেছনের অংশ বানায় চীন। এতে ব্যবহার করা হয় রাশিয়ার ইঞ্জিন এবং ব্রিটিশ কোম্পানি মার্টিন বেকারের সিট। তবে পুরো বিমানটি জোড়া লাগানোর (অ্যাসেম্বলি) কাজ হয় পাকিস্তানেই।'
২০০৭ সালের মার্চে প্রথমবারের মতো জেএফ-১৭ প্রকাশ্যে আনা হয় এবং ২০০৯ সালে এর প্রথম সংস্করণ 'ব্লক-১' বিমানবাহিনীতে যুক্ত হয়। ২০২০ সালে আসে এর সবচেয়ে উন্নত সংস্করণ 'ব্লক-৩'।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, 'মূল উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের পুরোনো বিমানবহর বদলে ফেলা। গত এক দশকে জেএফ-১৭ আমাদের বিমানবাহিনীর মেরুদণ্ড হয়ে উঠেছে। বর্তমানে ১৫০টিরও বেশি এমন যুদ্ধবিমান আমাদের বহরে রয়েছে।'
জেএফ-১৭ আসার আগে পাকিস্তান মূলত ফরাসি মিরাজ-৩, মিরাজ-৫ এবং চীনা জে-৭ যুদ্ধবিমানের ওপর নির্ভর করত।
জেএফ-১৭ ব্লক-৩ সংস্করণটিকে বলা হয় '৪.৫ প্রজন্মের' যুদ্ধবিমান। এতে আকাশ থেকে আকাশে এবং আকাশ থেকে ভূমিতে হামলার সক্ষমতা রয়েছে। আধুনিক এভিওনিক্স, 'অ্যাকটিভ ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানড অ্যারে' (এইএসএ) রাডার এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম যুক্ত থাকায় এটি দৃষ্টিসীমার বাইরেও মিসাইল ছুড়তে পারে।
এফ-১৬ বা সু-২৭-এর মতো চতুর্থ প্রজন্মের বিমানের চেয়ে এর প্রযুক্তি অনেক উন্নত। এইএসএ রাডার থাকার কারণে এটি একসঙ্গে একাধিক লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে পারে এবং অনেক দূর পর্যন্ত নজরদারি চালাতে সক্ষম। তবে পঞ্চম প্রজন্মের বিমানের মতো এতে 'স্টেলথ' বা রাডার ফাঁকি দেওয়ার প্রযুক্তি নেই।
পাকিস্তান বিমানবাহিনী বলছে, মাঝারি ও কম উচ্চতায় ওড়ার ক্ষেত্রে এই বিমান অত্যন্ত দক্ষ। এর ক্ষিপ্রতা এবং টিকে থাকার ক্ষমতা যেকোনো বিমানবাহিনীর জন্যই বড় সম্পদ।
কারা কিনছে জেএফ-১৭?
জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান কেনার তালিকায় প্রথম নামটি ছিল মিয়ানমারের। ২০১৫ সালে তারা অন্তত ১৬টি ব্লক-২ সংস্করণের জেএফ-১৭ বিমানের অর্ডার দেয়। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত সাতটি বিমান তাদের হাতে পৌঁছেছে।
নাইজেরিয়া এই বিমানের দ্বিতীয় ক্রেতা। ২০২১ সালে তারা তিনটি জেএফ-১৭ নিজেদের বিমানবাহিনীতে যুক্ত করে।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আজারবাইজান দেড় বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যে প্রাথমিকভাবে ১৬টি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান কেনার অর্ডার দেয়। এরপর ২০২৫ সালের নভেম্বরে বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজে আজারবাইজান পাঁচটি জেএফ-১৭ প্রদর্শন করে আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিমান ব্যবহারকারী তৃতীয় দেশ হিসেবে নাম লেখায়।
একই মাসে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঘোষণা দেয়, একটি 'বন্ধুপ্রতীম দেশের' সঙ্গে জেএফ-১৭ বিক্রির বিষয়ে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। তবে সেই দেশটির নাম তারা প্রকাশ করেনি।
গত এক দশকে ইরাক, শ্রীলঙ্কা ও সৌদি আরবও জেএফ-১৭ কেনার আগ্রহ দেখিয়েছিল, যদিও শেষ পর্যন্ত তা আর বাস্তবায়িত হয়নি।
পাকিস্তান বিমানবাহিনীর প্রধান শক্তি এখন জেএফ-১৭ হলেও চীনের বিমানবাহিনী কিন্তু এটি ব্যবহার করে না। তারা মূলত নিজেদের জে-১০, জে-২০ এবং নির্মাণাধীন জে-৩৫ যুদ্ধবিমানের ওপরই বেশি নির্ভরশীল।
যেহেতু জেএফ-১৭ বিমানের পুরোটাই পাকিস্তানের কামরায় অ্যাসেম্বল বা সংযোজন করা হয়, তাই আন্তর্জাতিক বাজারে এর প্রধান বিক্রেতা পাকিস্তানই। বিক্রয়-পরবর্তী সেবাও তারাই দিয়ে থাকে।
অন্য যুদ্ধবিমানের সঙ্গে জেএফ-১৭ এর তুলনা
বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত যুদ্ধবিমানগুলো পঞ্চম প্রজন্মের। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এফ-২২ ও এফ-৩৫, চীনের জে-২০ ও জে-৩৫ এবং রাশিয়ার সু-৫৭। এই প্রজন্মের বিমানগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো 'স্টেলথ' প্রযুক্তি, যা আগের প্রজন্মের বিমানগুলোতে ছিল না।
তুলনামূলকভাবে জেএফ-১৭ এর ব্লক-৩ সংস্করণটি '৪.৫ প্রজন্মের' অন্তর্ভুক্ত। এই কাতারে আরও আছে সুইডেনের গ্রিপেন, ফ্রান্সের রাফাল, ইউরোফাইটার টাইফুন, ভারতের তেজাস এবং চীনের জে-১০ যুদ্ধবিমান।
৪.৫ প্রজন্মের বিমানে স্টেলথ প্রযুক্তি না থাকলেও এদের গায়ে বিশেষ প্রলেপ দেওয়া থাকে, যা রাডারের সিগন্যাল কমিয়ে দেয়। ফলে এদের শনাক্ত করা কঠিন, তবে অসম্ভব নয়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যখন ৪.৫ প্রজন্মের কোনো বিমান শত্রুর রাডার সীমানায় ঢোকে, তখন তা ধরা পড়তে পারে। তবে ধরা পড়ার আগেই এটি জ্যামিং প্রযুক্তির মাধ্যমে শত্রুর সিগন্যাল অকেজো করে দিতে পারে কিংবা দূরপাল্লার মিসাইল ছুড়ে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনে ফিরে আসতে পারে।
অন্যদিকে, পঞ্চম প্রজন্মের বিমানগুলোর নকশা এবং ভেতরে অস্ত্র রাখার ব্যবস্থার কারণে রাডার এদের টেরই পায় না।
জেএফ-১৭ এর দাম আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো না হলেও ধারণা করা হয়, প্রতিটি বিমানের দাম ২৫ থেকে ৩০ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে। যেখানে একটি রাফাল বিমানের দাম ৯০ মিলিয়ন ডলারের বেশি এবং গ্রিপেনের দাম ১০০ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়।
ইসলামাবাদভিত্তিক এক নিরাপত্তা বিশ্লেষক জানান, জেএফ-১৭ এর প্রধান আকর্ষণ এর কম দাম, রক্ষণাবেক্ষণের সুবিধা এবং যুদ্ধের ময়দানে এর সাফল্য।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই বিশ্লেষক বলেন, 'জেএফ-১৭ কেবল পারফরম্যান্স দিয়েই নয়, বরং পুরো প্যাকেজ হিসেবেই আকর্ষণীয়। কম দাম, বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের সুযোগ, সহজ প্রশিক্ষণ ও যন্ত্রাংশ পাওয়ার সুবিধা—সব মিলিয়ে এটি অনন্য। তাছাড়া এটি কেনার ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলোর মতো রাজনৈতিক শর্তের বেড়াজালও কম থাকে।'
তিনি আরও বলেন, 'যাদের বাজেট কম কিন্তু আধুনিকায়ন প্রয়োজন, তাদের জন্য জেএফ-১৭ যথেষ্ট ভালো একটি বহুমুখী যুদ্ধবিমান। তবে জে-১০সি বা এফ-১৬ভি এর মতো উচ্চক্ষমতার যুদ্ধবিমানের সঙ্গে পাল্লা, পে-লোড বা আপগ্রেডের সুযোগের দিক থেকে এটি সরাসরি বিকল্প হতে পারে না।'
ইসলামাবাদের এয়ার ইউনিভার্সিটির অ্যারোস্পেস অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ অনুষদের ডিন আদিল সুলতান বলেন, ২০২৫ সালে ভারতীয় বিমানের বিরুদ্ধে জেএফ-১৭ এর সাফল্য এর সক্ষমতার প্রমাণ। তবে তিনি মনে করিয়ে দেন, আকাশযুদ্ধে জয়-পরাজয় কেবল বিমানের ওপরই নির্ভর করে না।
সুলতানের মতে, 'যুদ্ধবিমানের সঙ্গে গ্রাউন্ড রাডার, এয়ারবোর্ন রাডার ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সমন্বয় এবং সবচেয়ে বড় কথা—পাইলটের দক্ষতা ও প্রশিক্ষণই যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা রাখে।'
কেন বাড়ছে জেএফ-১৭ এর চাহিদা?
২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের সঙ্গে চার দিনের সংঘাতে পাকিস্তান বিমানবাহিনী আবারও বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে। বিশেষ করে ৭ মে রাতে ভারতীয় বিমান পাকিস্তানের ভূখণ্ডে হামলা চালানোর পর পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যায়।
পাকিস্তান বিমানবাহিনীর (পিএএফ) দাবি, তাদের চীনা জে-১০সি যুদ্ধবিমানের স্কোয়াড্রন অন্তত ছয়টি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে। ভারত শুরুতে ক্ষয়ক্ষতির কথা অস্বীকার করলেও পরে স্বীকার করে যে তাদের 'কিছু' বিমান খোয়া গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকরে মধ্যস্থতার দাবি করেন, তিনিও বারবার পাকিস্তানি জেটের পারফরম্যান্সের প্রশংসা করেছেন। যদিও ভারত এই দাবি তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
যদিও জেএফ-১৭ সরাসরি ভারতীয় বিমান ভূপাতিত করার ঘটনায় জড়িত ছিল না, তবে পিএএফ বলছে, ভারতীয় বিমানের মোকাবিলায় গঠিত ফরমেশনে এটিও অংশ নিয়েছিল। তিন দিন পর ১০ মে আইএসপিআর দাবি করে, একটি জেএফ-১৭ হাইপারসনিক মিসাইল ছুড়ে ভারতের রুশ নির্মিত এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আঘাত হানে। ভারত অবশ্য তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কোনো ক্ষতির কথা অস্বীকার করেছে।
ইসলামাবাদভিত্তিক ওই নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, মে মাসের ওই সংঘাতকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তান এখন জেএফ-১৭ এর বিপণন জোরদার করছে। তারা সীমিত বাজেটের দেশগুলোর কাছে এটিকে 'যুদ্ধে পরীক্ষিত' ও সাশ্রয়ী বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, 'আগ্রহ প্রকাশের বিষয়টি এখনই খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখার দরকার নেই। কারণ, যুদ্ধবিমান কেনার প্রাথমিক আলোচনা থেকে চুক্তি সই ও সরবরাহ পর্যন্ত বছরের পর বছর সময় লেগে যায়।'
তিনি আরও বলেন, 'ঋণের বদলে জেএফ-১৭ দেওয়ার যে কথা শোনা যাচ্ছে, তা হয়তো পিএএফের মূল পরিকল্পনার সঙ্গে মেলে না।'
অন্যান্য পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন, ইসলামাবাদ তাদের বিমানবাহিনীর সাফল্যকে কাজে লাগিয়ে প্রতিরক্ষা রপ্তানি বাড়াতে এবং নিজেদের একটি উদীয়মান মধ্যম শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে।
জেএফ-১৭ কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত সেই অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমোডর বলেন, যুদ্ধের ময়দানের পারফরম্যান্সই শেষ কথা। তিনি বলেন, 'খুব কম দেশই যুদ্ধবিমান তৈরি করে। বাজার মূলত পশ্চিমাদের দখলে এবং তারা বিক্রির সময় অনেক শর্ত জুড়ে দেয়। কিন্তু সবাই এখন উৎসের বৈচিত্র্য চায়, এক ঝুড়িতে সব ডিম রাখতে চায় না। ঠিক এখানেই পাকিস্তানের সুযোগ।'
বাংলাদেশের বিষয়ে তিনি বলেন, ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর থেকে পাকিস্তানের প্রতি ঢাকার মনোভাব অনেকটাই বদলে গেছে।
তিনি আরও বলেন, 'এ ধরনের চুক্তি কেবল একটি বিমান কেনা-বেচা নয়। এটি জাতীয় পর্যায়ের একটি সহযোগিতা ও কৌশলগত মৈত্রী। যুদ্ধবিমান কেনা মানে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি, কারণ এর মেয়াদ থাকে তিন থেকে চার দশক।'
ওই কর্মকর্তার মতে, 'বাংলাদেশ যদি জেএফ-১৭ বা সুপার মুশাক ট্রেইনার কেনে, তবে বুঝতে হবে তারা দীর্ঘ মেয়াদের জন্যই পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। তারা চীনা জে-১০ এর প্রতিও আগ্রহ দেখাচ্ছে, যার মানে হলো—কৌশলগতভাবে তারা ভবিষ্যতে কাদের সঙ্গে থাকতে চায়, সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।'
