হামলার শিকার হলে ইরান পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে ‘বাধ্য হবে’: খামেনির উপদেষ্টা

সোমবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতার এক উপদেষ্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বা তাদের মিত্রদের আক্রমণের শিকার হলে ইরান পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে বাধ্য হবে।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, ইরান পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত করতে কোনো চুক্তিতে না এলে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটিতে বোমা হামলা চালানো হবে। এর জবাবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ট্রাম্প যদি এই হুমকি বাস্তবায়ন করেন, তবে পাল্টা আঘাত হানবেন। এর ধারাবাহিকতায় খামেনির উপদেষ্টা এই মন্তব্য করলেন।
রাষ্ট্রায়ত্ত টিভি চ্যানেলকে খামেনির উপদেষ্টা আলী লারিজানি বলেন, 'আমরা (পারমাণবিক) অস্ত্রের (অধিকারী হওয়ার) দিকে অগ্রসর হচ্ছি না। কিন্তু আপনারা যদি ইরানের পারমাণবিক ইস্যুতে ভুল কিছু করেন, তাহলে ইরান বাধ্য হবে এই পথে হাঁটতে—কারণ তখন তার নিজেকে রক্ষা করতে হবে।'
তিনি আরও বলেন, 'ইরান এটা করতে চায় না, কিন্তু...তার আর কোনো উপায় থাকবে না। কোনো পর্যায়ে যদি আপনারা (যুক্তরাষ্ট্র) নিজেরা বা ইসরায়েলের মাধ্যমে বোমা হামলার পথে যান, তবে ইরান অন্য সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবে।'
এনবিসি নিউজ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার ট্রাম্প বলেন, পারমাণবিক চুক্তি না হলে 'বোমাবর্ষণ হবে'। তিনি আরও হুমকি দেন, তেহরানের ওপর 'সেকেন্ডারি ট্যারিফ' নামের কঠোর শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করা হবে।
তবে ট্রাম্পের মন্তব্যে স্পষ্ট হয়নি, যুক্তরাষ্ট্র একা হামলা চালাবে, নাকি কোনো মিত্র দেশের (সম্ভবত ইরানের শত্রু ইসরায়েল) সঙ্গে যৌথভাবে হামলা চালাবে।
রমজান শেষে ছুটির দিনে দেওয়া এক ভাষণে খামেনি বলেন, 'তারা অপকর্মের হুমকি দিচ্ছে। কিন্তু এই হুমকি যদি বাস্তব হয়, তাহলে নিশ্চিতভাবে তারা শক্তিশালী প্রতিআক্রমণের মুখোমুখি হবে।'
এই বার্তা জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাঈদ ইরাভানির মাধ্যমে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে ট্রাম্পের হুমকির নিন্দা জানিয়ে বলা হয়েছে, এর মধ্য দিয়ে 'যুদ্ধবাজরা উসকানি' দিচ্ছে।
তিনি বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র বা তার প্রক্সি ইসরায়েলের যেকোনো আগ্রাসনের জবাব ইরান দ্রুত এবং দৃঢ়ভাবে দেবে।'
মার্কিন প্রেসিডেন্টের হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী সুইস দূতাবাসের ভারপ্রাপ্ত চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে তলব করে।
ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সিনির কমান্ডার জেনারেল আমির আলী হাজিজাদেহ রাষ্ট্রীয় টিভিতে বলেন, 'ইরানের চারপাশে মার্কিনীদের অন্তত ১০টি ঘাঁটি আছে। সেগুলোতে ৫০ হাজার সেনা মোতায়েন রয়েছে।'
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, 'যারা কাচের ঘরে রয়েছে, তাদের উচিত হবে না অন্যের দিকে পাথর ছোড়া।'
চলতি বছরের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ট্রাম্প আবার 'সর্বোচ্চ চাপ' নীতি পুনর্বহাল করেছেন। তার প্রথম মেয়াদে এই নীতির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে এসে তেহরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করে।
পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টার অভিযোগ করে আসছে। যদিও তেহরান এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম কেবল শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত।
২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত করতে সম্মত হয়েছিল ইরান।
গত ৭ মার্চ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আয়াতুল্লাহ খামেনিকে একটি চিঠি পাঠান। এতে তিনি পারমাণবিক আলোচনার প্রস্তাব দেন এবং হুঁশিয়ারি দেন, তেহরান চুক্তি করতে না চাইলে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
ইরানের বার্তা সংস্থা ফার্স-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ১২ মার্চ সংযুক্ত আরব আমিরাতের এক দূত চিঠিটি তেহরানে পৌঁছে দেন।
এর জবাবে বৃহস্পতিবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানান, ওমানের মাধ্যমে একটি প্রতিক্রিয়া পাঠানো হয়েছে। যদিও তার বিস্তারিত প্রকাশ করেননি।
আরাগচি বলেন, 'সর্বোচ্চ চাপ ও সামরিক হুমকির মধ্যে' ইরান সরাসরি আলোচনায় যাবে না। তবে তিনি 'পরোক্ষ আলোচনা' দ্বার খোলা রেখেছিলেন।
এনবিসির প্রতিবেদন অনুসারে, ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা 'কথা বলছেন'; তবে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।
রোববার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, সর্বোচ্চ নেতা খামেনি—যিনি দেশের প্রধান নীতিনির্ধারক—পরোক্ষ আলোচনা অনুমোদন করেছেন।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ায় অতীতে ওমান বহুবার মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে।
সোমবার আরাগচি বলেন, 'আমাদের ওমানি বন্ধুদের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছি, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের চিঠি পেয়েছে এবং পড়েছে।'
পারমাণবিক কার্যক্রম ছাড়াও পশ্চিমা দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আসছে, তারা আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের জন্য প্রক্সি শক্তি ব্যবহার করছে। তেহরান এই অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে।
খামেনি বলেন, 'এই অঞ্চলে একটি মাত্র প্রক্সি শক্তি রয়েছে—আর সেটা হলো দুর্নীতিগ্রস্ত, দখলদার জায়নবাদী শাসনব্যবস্থা।' তিনি ইসরায়েলকে 'ধ্বংস করার' আহ্বান জানান।