যে ফর্মুলা অনুসরণ করে ট্রাম্পের পাল্টা-শুল্কারোপ নির্ধারিত হয়েছে

যেসব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি পণ্যে শুল্ক হয়েছে— প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাদের থেকে আমদানি করা পণ্যেও বসিয়েছেন পাল্টা শুল্ক। এর আওতায় এসেছে বাংলাদেশসহ যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ বাণিজ্য অংশীদার। তবে পারস্পরিক এই শুল্ক (রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ) আসলে দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতির হিসাবেই নির্ধারিত হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন বিদ্যমান বাণিজ্য ভারসাম্যের ভিত্তিতেই এটি নির্ধারণ করেছে। একইসঙ্গে এসব দেশের শুল্ক হারের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনার অঙ্গীকার করেছে। দেশগুলোর অন্যান্য আমদানি বাধার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কারোপের ঘোষণা এরমধ্যে আলোড়ন ফেলেছে বিশ্বজুড়ে। কারণ এখানে জড়িত রপ্তানি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগসহ আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও।
বুধবার রাতে দেওয়া এক বিবৃতিতে শুল্ক নির্ধারণের পদ্ধতি জানিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। এই পদ্ধতিতে কোনো দেশের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য উদ্বৃত্তকে ভাগ করা হয়েছে— যুক্তরাষ্ট্রে দেশটির মোট রপ্তানিকে দিয়ে। আর এসব সংখ্যা নেয়া হয়েছে মার্কিন পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের তথ্য থেকে। পরে এসব সংখ্যাকেই দুই দিয়ে ভাগ করে 'ছাড়কৃত' শুল্ক হার নির্ধারণ করা হয়।
যেমন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত গত বছর ছিল ২৯৫ বিলিয়ন ডলার। মোট রপ্তানির পরিমান ছিল ৪৩৮ বিলিয়ন ডলার— এইক্ষেত্রে উদ্বৃত্তের অনুপাত দাঁড়ায় ৬৮ শতাংশ। ট্রাম্প প্রশাসনের ফর্মুলায় এই উদ্বৃত্তকে ২ দিয়ে ভাগ করলে শুল্কের হার দাঁড়ায় ৩৪ শতাংশ। জাপান, দক্ষীণ কোরিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্ষেত্রেও এই হিসাব তাঁদের ওপর আরোপিত শুল্কহারের কাছাকাছি ফলাফল দিয়েছে।
তবে যেসব দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে— তারাও সার্বিক ১০ শতাংশ শুল্কের আওতায় এসেছে। যেসব দেশের সঙ্গে আমদানি ও রপ্তানি প্রায় সমান ছাড় পায়নি তারাও।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর) তাদের বিবৃতিতে আরও বলেছে, প্রকৃত বাণিজ্য বাধাগুলোর হার এভাবে হিসাব করা সম্ভব হলেও— হিসাবের এই পদ্ধতি ট্রাম্পের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে।
বিবৃতিতে বলা হয়, "প্রতিটি দেশের হাজারো রকমের শুল্ক, নিয়ন্ত্রক বিধিমালা, কর ও অন্যান্য নীতির মিলিত প্রভাবে যে বাণিজ্য ঘাটতি— তা স্বতন্ত্রভাবে হিসাব করে বের করা বেশ জটিল, হয়তো অসম্ভবও। এজন্য এসবের মিলিত প্রভাবের প্রক্সি হিসেবে তাদের শুল্কের মাত্রাকে হিসাবে অন্তুর্ভুক্ত করা হয়— যাতে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি শূন্যে নামিয়ে আনা যায়।"
বুধবার হোয়াইট হাউসের রোজ গার্ডেনে ট্রাম্প বাণিজ্য অংশীদারদের ওপর শুল্ক ঘোষণা করেন। এক্ষেত্রে 'যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বিভিন্ন দেশের আরোপিত শুল্কের' অর্ধেক হারকে 'ছাড়কৃত পাল্টা শুল্ক হার' হিসেবে ঘোষণা করেন তিনি।
ট্রাম্পের এই ঘোষণার আগ পর্যন্ত কীভাবে শুল্ক নির্ধারিত হতে চলেছে সেই পদ্ধতি তেমন কেউই জানতেন না। তাছাড়া, ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশে শুল্কের যে বিবরণী ছিল— তার থেকেও ঘোষিত শুল্কের হারগুলোর সামান্য হেরফের রয়েছে। যেমন ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের সাথে যুক্ত তালিকায় দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর ২৬ শতাংশ শুল্কারোপের কথা বলা হলেও– ঘোষণা করা হয়েছে ২৫ শতাংশ।
ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মার্কিন পণ্য রপ্তানিতে করসহ শুল্ক ও অশুল্ক সব ধরনের বাধার ভিত্তিতে পাল্টা শুল্ক হার হিসাব করা হয়েছে।
শুল্ক ঘোষণার সময় ট্রাম্প শুল্ক হার নির্দেশ করা একটি বোর্ড হাতে নিয়ে দেখান। সেখানে 'মুদ্রার দরে কারসাজি ও বাণিজ্য বাধার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আরোপিত শুল্কসমূহ' লেখা ক্যাটাগরির ছকে শুল্ক হারগুলো তুলে ধরা হয়।
এতেই স্পষ্ট হয়েছে, হোয়াইট হাউস প্রথমে যেভাবে বলেছিল বাণিজ্য অংশীদারদের ওপর সেভাবে শুল্কের হার হিসাব করেনি যুক্তরাষ্ট্র।