ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের মতো ‘বাণিজ্য যুদ্ধ’ নতুন কিছু নয়

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা পণ্যের ওপর ন্যূনতম ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। খবর রয়টার্স ও বিবিসির।
বুধবার (২ এপ্রিল) হোয়াইট হাউজের রোজ গার্ডেনে এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প কোন দেশের ওপর কত পারস্পরিক শুল্ক [রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ] আরোপ করছেন, তার একটি তালিকা তুলে ধরেন। প্রদর্শিত তালিকায় কোন দেশ যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর কত শতাংশ শুল্ক আরোপ করে, সে তথ্যও রয়েছে।
তালিকার তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর বাংলাদেশের আরোপকৃত শুল্কের হার ৭৪ শতাংশ। এজন্য বাংলাদেশের ওপর আরোপ করা হয় পালটা ৩৭ শতাংশ শুল্ক।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, নতুন নীতির আওতায় ৫ এপ্রিল থেকে সব দেশের পণ্যের ওপর ন্যূনতম ১০ শতাংশ বেজলাইন শুল্ক আরোপ করা হবে। তবে কিছু দেশ কেবলমাত্র এই ভিত্তিগত হারে-ই শুল্ক পরিশোধ করবে, এর বেশি নয়। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, তুরস্ক, কলম্বিয়া, চিলি, আর্জেন্টিনা, এল সালভাদর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরবসহ আরও কয়েকটি দেশ।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, যেসব দেশ মার্কিন পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করেছে বা বাণিজ্যে অশুল্ক বাধা তৈরি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট পালটা শুল্ক আরোপ করা হবে। এই 'অপরাধী' দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে প্রায় ৬০টি নাম, যাদের ওপর নতুন শুল্ক কার্যকর হবে ৯ এপ্রিল থেকে।
তবে এমন শুল্ক আরোপের ঘটনা কিন্তু নতুন নয়। নিজের অর্থনীতি বাঁচাতে কিংবা অন্যকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে বিপদে ফেলতে বহু দেশই এমন পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপের মাধ্যমে বাণিজ্য যুদ্ধে জড়িয়েছে।
বাণিজ্য যুদ্ধ কী?
ইনভেস্টোপিডিয়ার সংজ্ঞা অনুসারে বাণিজ্য যুদ্ধ হলো দুটি দেশের মধ্যে একটি অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব। একটি দেশের অন্যায্য বাণিজ্যিক কার্যকলাপের প্রতিশোধ বা কোনো দেশকে অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত করতে আমদানির ওপর শুল্ক ও অন্যান্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।
কোনো দেশ যদি মনে করে যে অন্য দেশ তাদের প্রতি অন্যায় করছে তাহলে তার প্রতিক্রিয়ায় আমদানির ওপর শুল্ক আরোপ করা যেতে পারে।
এছাড়া দেশীয় ট্রেড ইউনিয়ন বা শিল্প খাতের লবিস্টরা স্থানীয় ব্যবসাকে সুরক্ষিত করতে সরকারকে এমন শুল্ক আরোপে চাপ দিতে পারে। এছাড়া অনেক সময় মুক্ত বাণিজ্যের দীর্ঘমেয়াদী উপকারিতা পুরোপুরি বুঝতে না পারার কারণে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হতে পারে।
বাণিজ্য যুদ্ধের ইতিহাস
বাণিজ্য যুদ্ধ কিন্তু নতুন কিছু নয়। যখন থেকে মানুষ একে অপরের সঙ্গে বাণিজ্য শুরু করেছে, তখন থেকেই এ ধরনের দ্বন্দ্ব চলছে।
উদাহরণস্বরূপ, ১৭ শতকে ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো বিদেশি উপনিবেশগুলোর সঙ্গে একচেটিয়া বাণিজ্যের অধিকার নিয়ে একে অপরের সঙ্গে লড়াই করেছে।
ব্রিটিশ-চীনাদের বাণিজ্য যুদ্ধ
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বাণিজ্যিক দ্বন্দ্বের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এর অন্যতম উদাহরণ হলো, চীনের সঙ্গে ১৯ শতকের আফিম যুদ্ধ।
ব্রিটিশরা দীর্ঘদিন ধরে ভারতে উৎপাদিত আফিম চীনে পাঠিয়ে আসছিল। কিন্তু চীনের সম্রাট এটিকে অবৈধ ঘোষণা করেন। বিরোধ নিষ্পত্তির প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে সম্রাট সেনা পাঠিয়ে আফিম জব্দ করার নির্দেশ দেন।
তবে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর শক্তির কাছে চীন পরাজিত হয় এবং বাধ্য হয়ে বিদেশি বাণিজ্যের প্রবেশের অনুমতি দেয়।
যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপের বাণিজ্য যুদ্ধ
ইউরোপীয় কৃষিপণ্যের প্রতিযোগিতা থেকে আমেরিকান কৃষকদের রক্ষা করতে ১৯৩০ সালে যুক্তরাষ্ট্র স্মুট-হলওয়ে শুল্ক অ্যাক্ট পাস করে। এ অ্যাক্ট অনুসারে আমদানির ওপর শুল্ক বাড়ানো হয়।
এ আইন পাসের ফলে আমদানি শুল্ক প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এর প্রতিক্রিয়ায়, বেশ কয়েকটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা শুল্ক আরোপ করে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য হ্রাস পায়।
এর প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্র বড় অর্থনৈতিক মন্দার মুখোমুখি হয় যা গ্রেট ডিপ্রেশন নামে পরিচিত। তখন এ অর্থনৈতিক মন্দা কাটাতে তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট বাণিজ্য বাধা কমাতে পারস্পরিক শুল্ক [রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ] অ্যাক্টসহ একাধিক আইন পাস করেন।
যুক্তরাষ্ট্র-চীনসহ অন্যান্য দেশের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধ
২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম থেকে শুরু করে সোলার প্যানেল ও ওয়াশিং মেশিন পর্যন্ত বিভিন্ন পণ্যের ওপর একের পর এক শুল্ক আরোপ করতে থাকেন।
শুধু চীন ও মেক্সিকো নয়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং কানাডার পণ্যেও এর প্রভাব পড়ে। এর প্রতিক্রিয়ায় কানাডা আমেরিকান ইস্পাতসহ অন্যান্য পণ্যের ওপর অস্থায়ী শুল্ক আরোপ করে।
ইইউ-ও পাল্টা ব্যবস্থা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য এবং হার্লে ডেভিডসন মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য পণ্যের ওপর শুল্ক বসায়।
২০১৯ সালের মে মাসের মধ্যে, চীনা আমদানির ওপর শুল্কের পরিমাণ প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যায়। অন্যান্য বাণিজ্য যুদ্ধের মতো, চীনও প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেয় এবং আমেরিকান পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ কড়াকড়ি করে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এক গবেষণায় দেখা যায়, চীনা পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্কের প্রধান বোঝা আমেরিকান আমদানিকারকদেরই বহন করতে হয়।
শেষ পর্যন্ত, এই ব্যয় বাড়তি দামের মাধ্যমে আমেরিকান ভোক্তাদের ওপর পড়তে থাকে।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য যুদ্ধ কী এখনও চলমান?
২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র চীনের ওপর কঠোর বাণিজ্য শুল্ক আরোপ করে। কিছু বিশেষজ্ঞরা একে বাণিজ্য যুদ্ধ হিসেবেই পরিচয় দিতে চান। চীনা বৈদ্যুতিক বাহনের (ইভি) ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত এবং লিথিয়ান-আয়ন ব্যাটারির ওপর ২৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বৃদ্ধি করেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।
এছাড়া, সোলার প্যানেল ও সেমিকন্ডাক্টরের ওপরও কর হার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এই শুল্ক বৃদ্ধির লক্ষ্য ছিল দেশীয় শিল্পকে রক্ষা করা। যদিও এর ফলে আমেরিকানরা সস্তা চীনা প্রযুক্তি থেকে বঞ্চিত হয়।
২০২৫ সালের শুরুর দিকে অনুমান করা হচ্ছিল যে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুধু চীনের ওপর নয়, মেক্সিকো ও কানাডার ওপরও শুল্ক বাড়ানোর বা নতুন শুল্ক নীতি আরোপ অব্যাহত রাখতে পারেন।
শুল্ক আরোপ অর্থনীতির জন্য ভালো না খারাপ?
বেশিরভাগ অর্থনীতিবিদের মতে, শুল্ক অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। কারণ এটি দেশগুলোর জন্য অর্থনৈতিক বিশেষায়নের (ইকোনমিক স্পেশিয়ালাইজেশন) সুবিধা গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে।
তবে, কিছু ক্ষেত্রে দেশীয় শিল্পের অতিরিক্ত সুরক্ষার জন্য এমন শুল্ক আরোপ করা যেতে পারে। যেমন― উৎপাদন বা প্রতিরক্ষা খাত।
যদিও কোনো দেশ আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করলে তা সস্তায় পেতে পারে। তারপরও দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বজায় রাখা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।