ভূমিকম্প: মিয়ানমারে নিহতের সংখ্যা ১৬০০ ছাড়িয়েছে, ব্যাংককে নিখোঁজ ১০১

মিয়ানমারে শুক্রবার আঘাত হানা ৭.৭ ও ৬.৪ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ১ হাজার ৬৪৪ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছে অন্তত ১ হাজার ৬৭০ জন। একই ঘটনায় থাইল্যান্ডে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ জনে।
ধ্বংসস্তূপে আটকা পড়া ব্যক্তিদের উদ্ধারের জন্য শনিবার সকাল থেকে আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থাগুলো দেশটিতে পৌঁছাতে শুরু করেছে।
মিয়ানমারের জান্তা সরকার এক বিবৃতিতে বলেছে, সড়ক, সেতু ও ভবনের মতো অবকাঠামোগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে বেসামরিক নাগরিকরা হতাহত হয়েছে।
শুক্রবার মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
এদিকে ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভিস (ইউএসজিএস) পূর্বাভাস দিয়েছে, মিয়ানমারে ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়াতে পারে। আর এই বিপর্যয়ে ক্ষতির পরিমাণ দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনকেও (জিডিপি) ছাড়িয়ে যেতে পারে।

ইউএসজিএসের ভূমিকম্প ঝুঁকি কর্মসূচির বিজ্ঞানী সুজান হিউ রয়টার্সকে বলেন, সময়সহ বিভিন্ন কারণে ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা অনুমান করা কঠিন।
তিনি বলেন, দিনের বেলায় যখন ভূমিকম্প আঘাত হানে—যেমনটি মিয়ানমারে হয়েছে—তখন মানুষ তুলনামূলক ভালোভাবে তা মোকাবিলা করতে পারে।
ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মিয়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয়। শহরটি ভূমিকম্পের উৎপত্তিকেন্দ্রের কাছে অবস্থিত।
শনিবার চীনের একটি উদ্ধার দল মিয়ানমারে পৌঁছেছে। রাশিয়া জানিয়েছে, তারা আগেই সহায়তা পাঠিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমারে উৎপত্তি হওয়া ৭.৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পের কম্পনে শুক্রবার থাইল্যান্ডের ব্যাংককে নির্মাণাধীন একটি ৩০ তলা ভবন ধসে পড়েছে। এতে ওই ভবনসহ থাইল্যান্ডে এখন পর্যন্ত অন্তত ১০১ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানানো হয়েছে ব্যাংকক পোস্টের প্রতিবেদনে।

ভূমিকম্পের কারণে শুক্রবার রাতে থাইল্যান্ডের রাজধানীতে শত শত মানুষ সিটি পার্কগুলোতে রাত কাটিয়েছে। তবে সেখানকার পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে।
মিয়ানমারে আঘাত হানা দুটি ভূমিকম্পের তীব্র কম্পন থাইল্যান্ডসহ আশপাশের অঞ্চলে অনুভূত হয়েছে এবং বেশ কিছু স্থানে ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পটি আঘাত হানার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ব্যাংককের উত্তরের এই ভবনটি একেবারে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
জানা যায়, সরকারি কার্যালয় হিসেবে ব্যবহারের জন্য ভবনটি নির্মাণ করা হচ্ছিল।
ইউএসজিএস জানিয়েছে, প্রথম কম্পনটি স্থানীয় সময় শুক্রবার (২৮ মার্চ) স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে সাগাইং শহর থেকে ১৬ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে ভূ-পৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে আঘাত হানে। প্রথম ভূমিকম্পটি আঘাত হানার ১২ মিনিট পরেই দ্বিতীয় ভূমিকম্পটি আঘাত হানে।
ব্যাংককে শক্তিশালী কম্পনে আতঙ্কিত বাসিন্দারা উচ্চ ভবন ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভূমিকম্পের তীব্রতায় সুইমিং পুলের পানি উপচে পড়তে দেখা গেছে।

চিয়াং মাই শহরের বাসিন্দা দুয়াংজাই এএফপিকে বলেন, 'আমি শব্দ শুনে ঘুম থেকে উঠি, তখনই যতটা দ্রুত সম্ভব পায়জামা পরেই দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে যাই।'
ব্যাংককের চাতুচাক এলাকায় ৩০ তলা একটি নির্মাণাধীন ভবন ধসে পড়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে ৪৩ জন নির্মাণশ্রমিক আটকা পড়েছেন বলে জানা গেছে।
ব্যাংককে কিছু মেট্রো ও লাইট রেল সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন।
এদিকে, মিয়ানমার ফায়ার সার্ভিস বিভাগের এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, 'আমরা অনুসন্ধান শুরু করেছি এবং ইয়াঙ্গুনে হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির খোঁজ নিতে ঘুরে দেখছি। এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য পাইনি।'
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিয়ানমারের প্রাচীন রাজধানী মান্ডালের প্রকাশিত ছবিতে ভেঙে পড়া ভবনের পাশাপাশি রাস্তায় ধ্বংসাবশেষ পড়ে থাকতে দেখা গেছে। শহরটি মিয়ানমারের বৌদ্ধ ঐতিহ্যের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, লোকজনকে মান্ডালে বিমানবন্দরে চিৎকার করতে এবং রানওয়ের মাটিতে বসে থাকতে দেখা যায়। পেছনে একটি জেট বিমান দাঁড়িয়ে ছিল।
সেই সময় তাদেরকে বলতে শোনা যায়, 'বসে পড়ো! দৌড়াবে না!'

শহরের এক প্রত্যক্ষদর্শী রয়টার্সকে বলেন, 'সবকিছু কাঁপতে শুরু করতেই আমরা দৌড়ে বাড়ির বাইরে বের হয়ে যাই। আমি নিজ চোখে একটি পাঁচতলা ভবন ধসে পড়তে দেখেছি। আমার শহরের সবাই রাস্তায় বেরিয়ে এসেছে, কেউই ভবনের ভেতরে ফেরার সাহস পাচ্ছে না।'
শহরের আরেক প্রত্যক্ষদর্শী হেত নাইং ওও রয়টার্সকে জানান, একটি চায়ের দোকান ধসে পড়ায় তার ভেতরে কয়েকজন আটকা পড়েছেন। তিনি বলেন, 'আমরা ভেতরে যেতে পারিনি। পরিস্থিতি খুবই খারাপ।'
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, শহরের একটি মসজিদ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে ভূমিকম্পের শক্তিশালী কম্পনে সড়কগুলো ফেটে গেছে এবং ভবনগুলোর ছাদের অংশ ভেঙে পড়েছে।
মিয়ানমারে আগের ভূমিকম্প
মিয়ানমারে ভূমিকম্প একটি স্বাভাবিক ঘটনা। ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৩০ থেকে ১৯৫৬ সালের মধ্যে দেশটির সাগাইং ফল্টের কাছে ৭.০ বা তার বেশি মাত্রার ছয়টি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। সাগাইং ফল্ট দেশটির মাঝ বরাবর উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত।
২০১৬ সালে মিয়ানমারের প্রাচীন রাজধানী বাগানে ৬.৮ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে তিনজন নিহত হন এবং পর্যটনস্থলটির বহু মন্দিরের চূড়া ও দেয়াল ধসে পড়ে।