যুদ্ধ শুরুর পর গাজায় হামাসবিরোধী সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ

গাজায় ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথমবারের মতো হামাসের বিরুদ্ধে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে। শত শত মানুষ রাস্তায় নেমে সংগঠনটির ক্ষমতা ছাড়ার দাবি জানান। তবে মুখোশ পরা ও অস্ত্রধারী হামাস যোদ্ধারা লাঠি নিয়ে বিক্ষোভকারীদের ওপর চড়াও হয়। তারা আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় এবং বেশ কয়েকজনকে মারধর করে। খবর বিবিসির।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, গাজার উত্তরাঞ্চলের বেইত লাহিয়ায় শত শত মানুষ 'হামাস চলে যাও' স্লোগান দিচ্ছে। এই ভিডিওগুলো মূলত হামাসবিরোধী অ্যাক্টিভিস্টরা শেয়ার করেছেন।
অন্যদিকে, হামাস সমর্থকরা এই বিক্ষোভকে গুরুত্বহীন বলে দাবি করছে এবং অংশগ্রহণকারীদের 'বিশ্বাসঘাতক' বলে আখ্যা দিচ্ছে। হামাস এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
ইসলামী জিহাদ সংগঠনের সদস্যদের ইসরায়েলের দিকে রকেট হামলার একদিন পরই গাজার উত্তরে এই বিক্ষোভ হলো। এই হামলার জবাবে ইসরায়েল বেইত লাহিয়ার বড় অংশের মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয়, যা স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করে।
এদিকে, প্রায় দুই মাসের যুদ্ধবিরতির পর ইসরায়েল গাজায় সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শান্তি প্রস্তাব হামাস প্রত্যাখ্যান করেছে বলে ইসরায়েল দাবি করছে। তবে হামাসের অভিযোগ, জানুয়ারিতে হওয়া চুক্তি থেকে সরে এসেছে ইসরায়েল।
১৮ মার্চ বিমান হামলা শুরুর পর থেকে শত শত ফিলিস্তিনি নিহত ও হাজারো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের একজন, বেইত লাহিয়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ দিয়াব, যিনি এক বছর আগে ইসরায়েলি হামলায় তার ভাইকে হারিয়েছেন এবং যুদ্ধের কারণে তার বাড়ি ধ্বংস হয়েছে, বলেন, 'আমরা কারও স্বার্থরক্ষার জন্য জীবন দিতে রাজি নই। হামাসের উচিত জনগণের কথা শোনা। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে যে কণ্ঠস্বর উঠে আসে, সেটিই সবচেয়ে সত্য।'
বিক্ষোভ থেকে আরও একটি স্লোগান উঠে আসে—'হামাসের শাসন চাই না, মুসলিম ব্রাদারহুডের শাসন চাই না।'
হামাস ২০০৭ সাল থেকে গাজার একক শাসক হিসেবে রয়েছে। ২০০৬ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর তারা প্রতিদ্বন্দ্বী দলকে সহিংসভাবে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে হামাসের বিরুদ্ধে গাজায় উন্মুক্ত সমালোচনা বেড়েছে, যদিও সংগঠনটির প্রতি এখনো অনেকের সমর্থন রয়েছে। তবে প্রকৃতপক্ষে হামাসের প্রতি সমর্থন কতটা কমেছে, তা নির্ণয় করা কঠিন।
যুদ্ধ শুরুর আগেও হামাসের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ছিল, তবে প্রতিশোধের আশঙ্কায় অনেকেই প্রকাশ্যে কিছু বলতে সাহস করতেন না।
গাজার এক বাসিন্দা, মোহাম্মদ আল-নাজ্জার তার ফেসবুকে লিখেছেন, 'হামাস কীসের ওপর ভরসা করছে? আমাদের রক্তের ওপর? যে রক্ত গোটা বিশ্ব কেবল সংখ্যা হিসেবেই দেখে! এমনকি হামাসও আমাদের শুধু সংখ্যা হিসেবেই গণনা করে। পদত্যাগ করুন, আমাদের নিজেদের ক্ষত সামলাতে দিন।'
৭ অক্টোবর ২০২৩-এ হামাসের ইসরায়েলে হামলায় প্রায় ১,২০০ মানুষ নিহত হন এবং ২৫১ জনকে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল গাজায় সামরিক অভিযান চালিয়ে হামাসকে ধ্বংসের পরিকল্পনা নেয়। হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই অভিযানে এখন পর্যন্ত ৫০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
এদিকে, গাজার ২১ লাখ মানুষের বেশিরভাগই বাস্তুচ্যুত হয়েছে, অনেকেই একাধিকবার স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হয়েছেন। গাজার প্রায় ৭০ শতাংশ ভবন ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, বিশুদ্ধ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে, এবং খাদ্য, জ্বালানি, ওষুধ ও আশ্রয়ের তীব্র সংকট চলছে।