সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্র-ইউক্রেন প্রতিনিধি দলের আলোচনা, যুদ্ধ অবসানে আশাবাদী মার্কিন দূত

ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জানিয়েছেন, রোববার ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলগুলোর মধ্যে জ্বালানি স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ, যার লক্ষ্য তিন বছর ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটানো।
সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকের এক দিন পর, সোমবার (২৪ মার্চ) যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ইউরোপের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘাতের অবসান ঘটানোর সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
রোববার (২৪ মার্চ) ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে উইটকফ বলেছেন, 'আমি মনে করি তিনি (রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন) শান্তি চান।'
তিনি আরও বলেন, 'সোমবার সৌদি আরবে কিছু বাস্তব অগ্রগতি দেখতে পাবেন, বিশেষ করে এটি কৃষ্ণসাগরে উভয় দেশের জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত অস্ত্রবিরতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সেখান থেকে স্বাভাবিকভাবেই একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতির দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।'
এদিকে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, রোববারের আলোচনায় অংশ নেওয়া তার দেশের প্রতিনিধিদল 'সম্পূর্ণ গঠনমূলকভাবে' কাজ করছে। তিনি বলেন, 'আলোচনাটি বেশ কার্যকর হয়েছে, প্রতিনিধিদলের কাজ অব্যাহত রয়েছে।'
এক টেলিভিশন বিবৃতিতে জেলেনস্কি বলেছেন, 'কিন্তু আজ আমরা আমাদের অংশীদারদের যা-ই বলি না কেন, পুতিনকে সত্যিকারের নির্দেশ দিতে হবে যাতে হামলা বন্ধ হয়।'
ইউক্রেনের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রুস্তেম উমেরভ। তিনি বলেন, এই ধরনের যোগাযোগের লক্ষ্য হলো 'ন্যায়সংগত শান্তি এগিয়ে আনা ও নিরাপত্তা জোরদার করা'। তবে জেলেনস্কি জানিয়েছেন, রোববারের আলোচনাগুলো মূলত 'প্রযুক্তিগত' ছিল।
গত সপ্তাহে পুতিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাব মেনে নেন, যাতে রাশিয়া ও ইউক্রেন পরস্পরের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা ৩০ দিনের জন্য বন্ধ রাখে। তবে এই সীমিত অস্ত্রবিরতির বিষয়টি দ্রুতই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে, কারণ উভয় পক্ষই হামলা চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ এনেছে।
কিয়েভে রাতভর রুশ ড্রোন হামলায় অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একটি পাঁচ বছরের শিশুও রয়েছে। হামলায় বহুতল আবাসিক ভবনে আগুন ধরে যায় এবং রাজধানীজুড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় বলে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ রোববার জানিয়েছে।
অন্যদিকে রুশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল লক্ষ্য করে ছোড়া ইউক্রেনের ৫৯টি ড্রোন ধ্বংস করেছে। তারা আরও জানিয়েছে, এসব হামলায় রোস্তভে একজন নিহত হয়েছেন।
এদিকে, রুশ সেনারা পূর্ব ইউক্রেনে অগ্রসর হতে থাকায় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আহ্বানকে সমর্থন জানিয়েছেন, যাতে উভয় পক্ষের জন্য ৩০ দিনের একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা যায়।
'কোনো একভাবে নিয়ন্ত্রণে'
শনিবার ট্রাম্প বলেছেন, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের বৃদ্ধি রোধের প্রচেষ্টা 'কোনো একভাবে নিয়ন্ত্রণে' রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র আশা করছে, তারা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে একটি বড় যুদ্ধবিরতি চুক্তি করতে পারবে। তারা ২০ এপ্রিলের মধ্যে একটি অস্ত্রবিরতি চুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করছে। পরিকল্পনার সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিদের উদ্ধৃতি দিয়ে ব্লুমবার্গ নিউজ রোববার এমন খবর দিয়েছে।
হোয়াইট হাউজের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইক ওয়াল্টজ রোববার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে বিভিন্ন আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার ব্যবস্থার ওপর আলোচনা করছে। এরমধ্যে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া ইউক্রেনীয় শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বৃহত্তর আলোচনা লক্ষ্য কী, এমন প্রশ্নে জবাবে ওয়াল্টজ বলেন, কৃষ্ণ সাগর যুদ্ধবিরতি চুক্তি সই হওয়ার পর, 'আমরা সীমান্ত রেখা নিয়ে আলোচনা করব, যা আসল সম্মুখ রেখা'।
'এবং এর মাধ্যমে যাচাইকরণ, শান্তিরক্ষা, এবং সীমান্ত স্থির রাখা হবে,' বলেছেন ওয়াল্টজ। 'এবং তারপর অবশ্যই, স্থায়ী শান্তি।'
দুটি ফোনকলসহ ট্রাম্পের পুতিনের সাথে যোগাযোগ, ইউরোপীয় নেতাদের উদ্বিগ্ন করেছে। তারা ভয় পাচ্ছে, ওয়াশিংটন ইউরোপকে উপেক্ষা করে রাশিয়ার সাথে শান্তি চুক্তি করতে পারে, যা তেলের দাম, মধ্যপ্রাচ্য এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্কিত বড় চুক্তির অংশ হতে পারে।
ব্রিটেন ও ফ্রান্স ইউক্রেনের জন্য সামরিক সহায়তা বাড়াতে কাজ করছে এবং অনেক দেশ তাদের প্রতিরক্ষা খরচ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে পারে।
তবে, ওয়াশিংটনের ইউরোপীয় ন্যাটো মিত্রদের উদ্বেগ কমানোর লক্ষ্যে উইটকফ বলেন, ইউক্রেনে শান্তি চুক্তি হলে পুতিন অন্য কোনো প্রতিবেশী দেশে আক্রমণ করবেন না।
তিনি বলেন, 'আমি মনে করি না যে, তিনি পুরো ইউরোপ দখল করতে চান। এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চেয়ে অনেক ভিন্ন পরিস্থিতি।'