‘সব শেষ’, কুর্স্ক থেকে পিছু হটার বিপর্যয়ের বর্ণনা দিলেন ইউক্রেনীয় সেনারা
রাশিয়ার কুর্স্ক অঞ্চল থেকে পিছু হটে ইউক্রেনে ফেরা সেনারা ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিচ্ছেন। যেন হরর সিনেমারই দৃশ্য, এমনটাই বলছেন তাঁরা। খবর বিবিসির
কুর্স্কের পরিস্থিতি কতোটা মারাত্মক— ফিরে আসা ইউক্রেনীয় সেনাদের এমন অনেক জবানবন্দি পেয়েছে যুক্তরাজ্যের বার্তাসংস্থা বিবিসি। তাঁরা জানিয়েছেন, কীভাবে শত্রুর ভারী গোলাবর্ষণের মধ্যে তাঁদের কুর্স্ক থেকে পশ্চাদপসরণ করতে হয়েছে। কীভাবে এসময় সারির পর সারি সামরিক যান ও সরঞ্জাম ধ্বংস হয়েছে রাশিয়ান ড্রোন আক্রমণে। সম্পূর্ণ পরিস্থিতিকে বিপর্যয় বলে অভিহিত করছেন তাঁরা।
সামাজিক মাধ্যমে ইউক্রেনের এসব সেনার সাথে কথা বলে বিবিসি। নিরাপত্তার খাতিরে তাঁদের ছদ্মনাম বিবিসির প্রতিবেদনে ব্যবহার করা হয়েছে। এদের কেউ কেউ সুজঝার পতনকে প্রতিরোধের ধস বলে উল্লেখ করেন। রাশিয়ার কুর্স্কে সুদঝাই ছিল ইউক্রেনীয়দের দখলে থাকা সর্বশেষ বৃহৎ জনপদ।
যুদ্ধের সম্মুখভাগে বিদেশি সংবাদকর্মীদের যেতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ইউক্রেন, ফলে বিবিসি নিজস্ব প্রতিবেদক পাঠিয়ে সরেজমিনে পরিস্থিতি দেখতে পারেনি। এই অবস্থায়, প্রত্যক্ষদর্শী সেনাদের জবানবন্দিতেই পরিস্থিতি তুলে ধরেছে।
ভলোদমির: 'সব সময় ড্রোন আক্রমণ হয়েছে'
গত ৯ মার্চ সুদঝায় মোতায়েন ছিলেন ভলোদমির। সেখান থেকে ম্যাসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রামের মাধ্যমে বিবিসিকে জানান, সেখানে সম্মুখভাগের প্রতিরোধ ধসে পড়ছে। আতংকে অস্থির সবাই।
তিনি বলেন, অস্ত্র সরঞ্জাম নিয়ে দলে দলে ইউক্রেনীয় সেনারা কুর্স্ক ছাড়ার চেষ্টা করছে। ফলে পিছু হটার পথে লাইনের পর লাইন তৈরি হয়েছে সামরিক যানবাহনের। অনেকগুলোই রাশিয়ার ড্রোন আক্রমণে ধ্বংস হয়ে পুড়ে গেছে। ড্রোনের অত্যাচারে দিনের বেলায় পালানোর চেষ্টা করাও অসম্ভব।
সুদঝা ও সীমান্তের এপাড়ে ইউক্রেনের সুমি অঞ্চলের মধ্যে চলাচলের জন্য একটি প্রধান রুটের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে ইউক্রেনীয়দের। এ পথ দিয়েই নিতে হচ্ছে সেনা, রসদ, যুদ্ধাস্ত্র। রাশিয়ান ড্রোন এই পথকে পরিণত করেছে মৃত্যুফাঁদে।
ভলোদিমির জানান, মাত্র একমাস আগেও ওই রাস্তায় চলাচল করাটা তুলনামূলকভাবে নিরাপদই ছিল। কিন্তু, ৯ মার্চ নাগাদ এটি শত্রুর গোলাগুলির নাগালের আওতায় পুরোপুরি চলে আসে। আর ড্রোন দিয়ে বিরামহীন হামলা চলছে। প্রতি মিনিটেই অন্তত দুই-তিনটি শত্রু ড্রোনকে দেখা যাচ্ছে। এগুলো সংখ্যায় প্রচুর।
তিনি বলেন, আমাদের সব লজিস্টিকস সুদঝা-সুমি মহাসড়কে। রাশিয়ানরা এটাকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করবে– সেটাও সবাই জানত। কিন্তু তারপরেও এই ধরনের আক্রমণ আমাদের কম্যান্ডকে বিস্মিত করেছে।
ভলোদমির এই বার্তা পাঠান সুদঝার পতনের ঠিক আগে। এসময় তিনি জানান, তিন দিক থেকে আক্রমণ হচ্ছে ইউক্রেনীয় সেনাদের ওপরে।
ম্যাক্সিম: ধ্বংস হওয়া যানবাহনে বোঝাই সড়ক
১১ মার্চ টেলিগ্রাম বার্তায় ম্যাক্সিম নামের এক সেনা জানান, সড়কটি দিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া ঠেকাতে লড়াই করছে ইউক্রেনীয় সেনারা।
তিনি বলেন, "দিনকয়েক আগেই সংগঠিত একটি পশ্চাপসরণের জন্য আমরা প্রতিরক্ষা লাইন ছাড়ার নির্দেশ পাই। কারণ ততোদিনে সুদঝার পুনর্দখল নিতে রাশিয়ার অনেক সেনা মোতায়েন করা হয়ে গেছে। এদের মধ্যে বড় সংখ্যায় উত্তর কোরীয়রা ছিল।"
সামরিক বিশেষজ্ঞরা অনুমান করছেন, কুর্স্ক মুক্ত করার অভিযানে সর্বোচ্চ ৭০ হাজার সেনা মোতায়েন করেছে রাশিয়া— যার মধ্যে প্রায় ১২ হাজার উ. কোরীয় সেনা।
এই ফ্রন্টে রাশিয়া তার সেরা ড্রোন ইউনিটকে পাঠিয়েছে। কামিকাজে বা আত্মঘাতী এবং ফার্স্ট পার্সন ভিউ (এফপিভি) ড্রোন দিয়ে হামলা চালাতে এই ইউনিট বিশেষ দক্ষ। তাদের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে ইউক্রেনীয়দের প্রধান রসদ পরিবহনের পথটির ওপর হামলার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া।
রাশিয়ান এই ইউনিটের কাছে অপটিক ফাইবার তারে দিয়ে সংযুক্ত ড্রোন আছে— যেগুলো ইলেকট্রনিক প্রতিরোধ দিয়েও নিষ্ক্রিয় করা যায় না।
ম্যাক্সিম জানান, 'ফলে শত্রু আমাদের ডজন ডজন সমরাস্ত্র, সাঁজোয়া যান ধ্বংস করেছে।' ধ্বংস হওয়া যানবাহনের কারণে সড়কটিতে যানজট তৈরি হয়েছে বলেও জানান তিনি।
অ্যান্টন: পিছু হটার সময়ে বিপর্যয়
ওই একইদিন অর্থাৎ ১১ মার্চে ইউক্রেনীয় বাহিনীর পশ্চাপসরণকে একটি 'বিপর্যয়' বলে মন্তব্য করেন অ্যান্টন নামের এক সেনা।
কুর্স্ক ফ্রন্টে যুদ্ধ লড়া অ্যান্টন বিবিসির সাথে আলাপকালে রাশিয়ান ড্রোনের কারণে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার কথা জানান। তিনি বলেন, "ড্রোন যুদ্ধে আমরা একসময় এগিয়ে ছিলাম, কিন্তু এখন আর নেই।"
রাশিয়া আরও নির্ভুলভাবে আকাশ থেকে হামলা করতে পারছে এবং সেনার সংখ্যাও তাদের বেশি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সরবরাহ লাইন বিচ্ছিন্ন হওয়ার কথা তুলে ধরে অ্যান্টন বলেন, 'লজিস্টিকস আর কাজ করছে না— সেখানে সংগঠিতভাবে অস্ত্র, গোলাবারুদ, খাদ্য বা পানি আর পৌঁছানো যাচ্ছে না।"
রাতের আঁধারে পায়ে হেঁটে সুদঝা থেকে পালানোর কথা জানান অ্যান্টন। কিন্তু, বিপদ পিছু ছাড়েনি তখনও। এসময়ে বেশ কয়েকবার মরতে মরতে প্রাণে বেঁচে যান তিনি ও তার সঙ্গীরা। সব সময়েই উড়ছিল অজস্র ড্রোন।
তিনি অনুমান করছেন, কুর্স্কের দখলকৃত সব এলাকা অচিরেই ইউক্রেনের হাতছাড়া হবে। সামরিক দিক থেকে বলতে গেলে, কুর্স্ক ফ্রন্টে ইউক্রেনের সমস্ত শক্তি ফুরিয়ে গেছে। এখন সেটা ধরে রাখার জন্য নতুন কওরে শক্তিক্ষয়ও অর্থহীন।
পশ্চিমা কর্মকর্তাদের হিসাবমতে, কুর্স্কে আক্রমণ অভিযানে ইউক্রেনের প্রায় ১২ হাজার সেনা অংশ নেয়। এদের বড় অংশই ছিল সর্বোচ্চ প্রশিক্ষিত এবং পশ্চিমা ট্যাংক ও সাঁজোয়া যানের মতো আধুনিক অস্ত্রসজ্জিত।
এসব যুদ্ধ সরঞ্জামের অনেকগুলো ধ্বংস হওয়া বা রুশ সেনাদের হাতে আসার ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করেছেন রাশিয়ার সামরিক ব্লগাররা। গত ১৩ মার্চ রাশিয়া জানায়, কুর্স্ক সম্পূর্ণভাবে তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। আর যুদ্ধ সরঞ্জাম ও রসদ ফেলে পালাচ্ছে ইউক্রেনীয়রা।
