চাকরি ছেড়ে সবজি ব্যবসা, অভিনব উদ্যোগে দৈনিক বিক্রি ২০০ কেজি
মিরপুর ডিওএইচএস তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। ভোরের নরম আলোয় পাড়ার ঘুম ভাঙার আগেই রাস্তায় নেমে পড়েছে দু'টি ছোট গাড়ি। মহল্লার প্রতিটি রাস্তাজুড়ে ঘুরে বেড়ানো গাড়িগুলোর ভেতরে সাজানো তরতাজা মৌসুমি সব শাক-সবজি। সবুজ, লাল আর হলুদের প্রাণবন্ত ছটা দূর থেকেও বেশ লক্ষ করা যায়। সকালে ঘুম ভাঙতেই বাসিন্দারা দেখেন, বাজার তাদের দরজায় হাজির!
ভ্রাম্যমাণ সবজি বিক্রির ব্যবস্থা এখানে আগেও ছিলো। তবে এই 'ভেজিটেবল কার্ট' দুটি শুধুই ভ্রাম্যমাণ বাজার নয়, এখানে রয়েছে অন্য এক চমক। মাছ-মাংসের মতো সবজিও বিক্রি হচ্ছে ধুয়ে-কেটে প্রস্তুত অবস্থায়। আলাদা করে কাটাকুটির ঝামেলা নেই—ছোট্ট এই সুবিধাটাই অনেক বড় সুবিধা হয়ে উঠেছে ব্যস্ত এই নগরজীবনে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে মিরপুর ডিওএইচএসের বাসিন্দাদের মাঝে সাড়া ফেলেছে এই দুই ভেজিটেবল কার্ট।
চাকরি ছেড়ে ব্যবসা
ব্যাংকের হিসাবনিকাশে ব্যস্ত দিন কাটাতেন মাহমুদা ইয়াছমিন। কিন্তু নিজের চাকরি আর ঘর-সংসার সামলে সময় যেন হাতে থাকতই না। একসময় তার মনে হলো, একটু চাপমুক্ত আর কিছুটা স্বাধীন জীবনযাপন করতে চান, নিজের পরিবারকে দিতে চান বাড়তি সময়। সেই ভাবনা থেকেই একদিন ব্যাংকের চাকরিটা পেছনে ফেলে নিজের জন্য নতুন কিছু শুরু করলেন তিনি।
চাকরিজীবী মানুষদের জীবন তার খুবই চেনা। সময়ের অভাব, সকালে বাজারের ঝক্কি, অফিস থেকে ফিরে রান্নার চাপ—এসব তার নিজেরও অভিজ্ঞতা। ব্যবসার কথা মাথায় এলে এমন কিছু করতে চাইছিলেন, যাতে কর্মব্যস্ত মানুষের জীবনটাকে আরেকটু সহজ করা যায়। স্বামীর পরামর্শ নিয়ে এরপরই তিনি শুরু করেন তার প্রজেক্ট 'কুক ফ্রেশ'।
দুটি ইলেকট্রিক গাড়িকে সাজিয়ে তোলা হলো টাটকা কৃষিপণ্যে। তাতে কর্মব্যস্ত মানুষের জন্য থাকল একটি অভিনব ব্যবস্থা। মাহমুদা বললেন, 'এমন কিছু করতে চাচ্ছিলাম, যাতে আইডিয়াটা ইউনিক হয়, আবার মানুষকে সাহায্যও করতে পারি।'
মিরপুর ডিওএইচএসের বেশিভাগ মানুষই চাকরিজীবী। তাদের কথা ভেবেই তার এই উদ্যোগের শুরু হয়েছিলো বলে জানালেন এই নারী উদ্যোক্তা। 'অনেকে রান্নার কাজে খুব বেশি সময় পান না। আর বিভিন্ন ধরনের সবজি কাটতে আসলে অনেক সময় চলে যায়। ফলে চাকরি করে সংসার চালানো অনেকের জন্য টাফ হয়ে যায়। এটা ভেবেই আমার এই উদ্যোগ নেয়া।'
দুটো গাড়ি নিয়ে সকাল ৮ টায় বেড়িয়ে পড়েন দুজন ডেলিভারি ম্যান। তিনি নিজে বাসায় থেকে সব তত্ত্বাবধান করেন, অনলাইন বা ফোন কলের মাধ্যমে অর্ডার নেন। চলতি বছরের মে মাসে শুরু হওয়া এই ব্যবসা এরই মধ্যে ডিওএইচএস- এর বাসিন্দাদের মন জিতে নিয়েছে। সামাজিক মাধ্যমেও অভিনব এই উদ্যোগ নিয়ে চলছে ইতিবাচক আলোচনা।
কম দামে তরতাজা সবজি
'কুক ফ্রেশ' দলের কাজ শুরু হয় খুব ভোরে। স্থানীয় বাজার থেকে প্রতিদিনের তাজা সবজি চলে আসে। তারপর শুরু হয় বাছাই, ধোয়া আর প্যাকেটিং। যতটা দরকার ততটা কেটে নেওয়া হয়, বাকি সবজিগুলো আবার নতুন করে ধুয়ে সাজিয়ে তোলা হয় গাড়িতে। এরপর সকাল ৮টা থেকে গাড়িগুলো বেরিয়ে পড়ে সবজি ডেলিভারির উদ্দেশ্যে।
বড় গাড়ির দায়িত্বে আছেন মোহাম্মদ আরিফ। তিনি শুরু থেকেই এই প্রজেক্টের সঙ্গে যুক্ত। জানালেন, সকাল ৮ টা থেকে বিকেল পর্যন্ত তারা গাড়ি নিয়ে পুরো ডিওএইচএস ঘুরে বেড়ান। ফোন পেলে বাসায় বাসায় অর্ডার পৌঁছে দেন। তার গাড়িতে রয়েছে একটি ঘণ্টা। বাসার নিচে গিয়ে সেই ঘণ্টা দিতেই লোকেরা চলে আসেন। সারাদিনের প্রায় সব সবজিই বিক্রি হয়ে যায়। কিছু বেঁচে গেলে সেগুলো চলে যায় স্থানীয় হোটেলে।
শীতকাল বলে গাড়িগুলো এখন বাহারি সবজি বোঝাই থাকে। আলু, শিম, গাজর, বেগুন, পেপে, বাহারি সব শাক তো রয়েইছে, এর সাথে মৌসুমি টমেটো, লাউ, বাঁধাকপি, ফুলকপি, ধনেপাতা, সবই পাওয়া যাচ্ছে। দামও তুলনামূলক কম। পাশাপাশি প্রতিটি গাড়িতেই রয়েছে রেডি-টু-কুক প্যাকেট, ধোয়া-কাটা সবজি, যেগুলোর দাম ৫৫ থেকে ১১০ টাকার মধ্যে।
আরিফ জানালেন, প্রতিদিন দুটো গাড়ি মিলিয়ে দেড়শ থেকে দুইশ কেজি সবজি বিক্রি হয়। বিশেষ করে কাটা সবজির চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। আর অর্ডার দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাসার দরজার সামনে হাজির হন বলে তাদের প্রতি মানুষের আস্থা দিন দিন বাড়ছে বলে মনে করেন আরেক বিক্রেতা মোহাম্মদ জুবায়ের। এখন শুধু মিরপুর ডিওএইচএস নয়, আশেপাশে এলাকাগুলোতেও তারা ডেলিভারি দেয়া শুরু করেছেন।
'রেডি টু কুক' সবজি
মাছ-মাংস কেটে বিক্রি করাটা সব জায়গায় দেখা যায়। কিন্তু সবজি কেটে রান্নার উপযোগী করে বিক্রি করার ধারণাটি নতুন বলে বেশ প্রশংসিত হচ্ছে 'কুক ফ্রেশ'-এর এই উদ্যোগ। মিরপুর ডিওএইচএস ও আশেপাশের এলাকার অনেকেই জানালেন, তারা বেশ উপকার পাচ্ছেন এই সেবা থেকে।
সরকারি তিতুমীর কলেজের সহকারী অধ্যাপক বিলকিস আক্তার 'কুক ফ্রেশ'-এর নিয়মিত ক্রেতা। তিনি জানালেন, এই ভেজিটেবল কার্ট তার দৈনন্দিন কাজ অনেক সহজ করে দিয়েছে। 'কোনোদিন দেখা যায় হাতে সময় নেই, তাড়াতাড়ি করে রান্না করতে হবে। আবার হেল্পিং হ্যান্ড কোনো দিন না এলে তখন খুব ঝামেলা হয়। তখন এখান থেকে সবজি কিনি, বিশেষ করে "রেডি টু কুক" আইটেমটা কিনে ঝটপট ভাজি করে ফেলা যায়।' তার মতে, ব্যস্ত মানুষদের জন্য এই 'কেটে সবজি বিক্রি'র বিষয়টি বেশ উপকারী।
কথা হলো এলাকার আরও কয়েকজনের সঙ্গে। তাদের একজন মোহাম্মাদ দুলাল আহমেদ। তিনি একজন ব্যাচেলর। নিজের রান্নাটা নিজেকেই করতে হয়। জানালেন, এই ভেজিটেবল কার্ট ছাড়া তার চলা একরকম অসম্ভব এখন। বললেন, 'সবজি কেনার জন্য এখন আর বাজারে যেতে হয় না। কাটাকুটির ঝামেল নাই। আমি প্রতিদিন কিছু না কিছু কিনি। নিয়ে শুধু ধুয়েই রান্না উঠিয়ে দেয়া যায়।'
মাহমুদা জানান, ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী প্রতিদিন 'রেডি টু কুক' সবজি প্রস্তুত করেন তার লোকজন। প্রয়োজন অনুযায়ী আগে অর্ডার করে রাখা যায়। আবার কার্ট থেকেও কেনা যায় সরাসরি। আস্ত সবজির থেকে ২০-৩০ টাকা বেশি দাম পড়ে এসব কাটা সবজির। শাক-সবজির কতটুকু অংশ ফেলে দেয়া হয়েছে, সেটা হিসেব করে দাম নির্ধারণ করা হয়।
তিনি আরও জানালেন, শুধু উচ্চবিত্ত নয়, রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে শ্রমিক, অনেকেই তাদের কাটা সবজি নেন। 'একজন মানুষ সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করে বাড়ি ফিরে নতুন করে কাটাকুটি করতে চান না। তারা চাইলে আমাদের প্যাকেট থেকে সবজি নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে রান্না করে ফেলতে পারেন। ঠিক এই কারণেই আমাদের উদ্যোগ সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে,' বললেন মাহমুদা।
ভবিষ্যৎ ভাবনা
ব্যবসার ধারণাটি অভিনব। তবে এখনো সব মানুষের কাছে পৌঁছতে পারেনি বলে মনে করেন মাহমুদা ইয়াছমিন। ব্যবসাটি লাভজনক হলেও এখনো আশানুরূপ পর্যায়ে যায়নি। তবে মানুষ আরো বেশি অভ্যস্ত হয়ে উঠলে তিনি সফল হবেন বলে মনে করছেন।
এই ব্যবসার বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের কথা জানালেন তিনি। 'সবজি যেহেতু পচনশীল বস্তু, ফলে তাৎক্ষণিক ডিমান্ড অনুযায়ী সাপ্লাই করতে হয়। জনবল বেশি দরকার হয়, সময় বেশি লাগে। প্রতিদিন ফ্রেশ সবজি কেটে দেওয়াও একটা চ্যালেঞ্জ। আর ধারণাটি নতুন বলে সবার বিশ্বাস অর্জন করা কঠিন,' বললেন মাহমুদা।
তবে এখন পর্যন্ত বেশ আশাবাদী তিনি। কুক ফ্রেশ প্রজেক্ট ঘিরে তার একাধিক ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি চান এই ব্যবসার ধারণা সারা ঢাকায় ছড়িয়ে দিতে। এজন্য একাধিক ফ্রাঞ্চাইজি নেয়া শুরু করেছেন। তার পরিকল্পনা, বিক্রয় বাড়লে গ্রামে গিয়ে সরাসরি কৃষকদের থেকে শাকসবজি এনে গ্রাহকদের হাতে তুলে দেবেন। বললেন, 'এতে কৃষকেরা লাভবান হবেন, গ্রাহকরাও সন্তুষ্ট হবেন। তবে তার জন্য বিক্রি হতে হবে কয়েক টন। নইলে এটা সম্ভব হবে না।'
এছাড়া তার মতো উদ্যোক্তাদের দিয়ে একটি ক্লাব গঠন করার চিন্তাভাবনা করছেন মাহমুদা। তার একটাই উদ্দেশ্য, মানুষকে সাহায্য করা। 'মানুষ আমাদের কার্ট দেখে প্রথমে ভেবেছিল অনেক দাম হবে সবজির। বাস্তবে কিন্তু তার উল্টো। বাসায় বসে অর্ডা্র করছে, আমরা পৌঁছে দিচ্ছি, একদম ফ্রি ডেলিভারি। আমাদের ইচ্ছা, প্রফিট মার্জিন কম থেকেও যেন হিউজ পরিমাণ মানুষ সেবাটা নিতে পারে। এ লক্ষ্যেই এগিয়ে যাচ্ছি।'
- ছবি: জুনায়েত রাসেল