‘রাজনীতির বাইরে থাকতে হবে’: জুরির মন্তব্যে ক্ষুব্ধ, বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব বর্জন অরুন্ধতীর
বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের জুরি সদস্যদের মন্তব্যে 'স্তম্ভিত ও বিরক্ত' হয়ে উৎসব থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন বুকারজয়ী ঔপন্যাসিক ও রাজনৈতিক প্রাবন্ধিক অরুন্ধতী রায়। গাজায় যুদ্ধ চলার সময়ে চলচ্চিত্র নির্মাতাদের রাজনীতির বাইরে থাকা উচিত—জুরি সদস্যদের এমন মন্তব্যের পর তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন।
১৯৮৯ সালের চলচ্চিত্র 'ইন হুইচ অ্যানি গিভস ইট দোজ ওয়ানস'-এর প্রদর্শনীতে যোগ দিতে অরুন্ধতী রায়ের বার্লিনে যাওয়ার কথা ছিল। সিনেমাটির চিত্রনাট্য তিনি লিখেছিলেন। এ বছর উৎসবের 'ক্লাসিকস' বিভাগে ছবিটি নির্বাচিত হয়। প্রায় চার দশক পর সিনেমাটির ফিরে আসাকে তিনি নিজের জন্য 'মিষ্টি ও চমৎকার' অনুভূতি বলে বর্ণনা করেছিলেন।
শুক্রবার বার্লিনে না যাওয়ার ঘোষণা দেন অরুন্ধতী রায়। এতে উৎসবের আর্কাইভাল প্রদর্শনী ঘিরে তৈরি হওয়া আমেজ কিছুটা ম্লান হয়েছে। ইউরোপের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো চলমান সংঘাতের বিষয়ে কীভাবে সাড়া দিচ্ছে, তা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম 'দ্য ওয়্যার'-কে দেওয়া লিখিত বিবৃতিতে অরুন্ধতী রায় বলেন, গণসহিংসতার মুখে শৈল্পিক নিরপেক্ষতার আহ্বান মূলত 'চোখের সামনে ঘটতে থাকা মানবতাবিরোধী অপরাধ নিয়ে আলোচনা বন্ধ করার একটি কৌশল'। তিনি আরও বলেন, 'শিল্পী, লেখক এবং চলচ্চিত্র নির্মাতাদের এটি থামানোর জন্য তাদের সাধ্যমতো সবকিছু করা উচিত।'
বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে জার্মান পরিচালক উইম ওয়েন্ডার্সের নেতৃত্বাধীন জুরিকে প্রশ্ন করা হয়, সিনেমা রাজনৈতিক ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে কি না। জবাবে ওয়েন্ডার্স বলেন, সিনেমা মানুষকে পরিবর্তন করতে পারলেও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বদলাতে পারে না। চলচ্চিত্র নির্মাতাদের 'রাজনীতির বাইরে থাকতে হবে' বলেও মন্তব্য করেন তিনি। শিল্পীদের তিনি রাজনৈতিক অংশগ্রহণকারী নয়, বরং ভারসাম্য রক্ষাকারী হিসেবে উল্লেখ করেন।
আরেক জুরি সদস্য পোলিশ প্রযোজক ইওয়া পুসজিনস্কা ইসরায়েলের প্রতি জার্মানির সমর্থনের সঙ্গে উৎসবকে জড়ানো প্রশ্নগুলোকে 'কিছুটা অন্যায্য' বলে অভিহিত করেন। তার মতে, দর্শকদের রাজনৈতিক পছন্দের জন্য শিল্পীরা দায়ী নন।
গাজা পরিস্থিতি নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে অরুন্ধতী রায় লিখেছেন, 'আমাকে স্পষ্টভাবে বলতে দিন: গাজায় যা ঘটেছে এবং যা ঘটে চলেছে, তা হলো ইসরায়েল রাষ্ট্র কর্তৃক ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর চালানো গণহত্যা।' তিনি আরও যোগ করেন, এই সহিংসতা 'যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির সরকারের পাশাপাশি ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশ দ্বারা সমর্থিত ও অর্থায়নকৃত, যা তাদের এই অপরাধের সহযোগী করে তুলেছে।'
জুরি সদস্যদের মন্তব্য প্রসঙ্গে অরুন্ধতী রায় বলেন, সেগুলো ছিল 'বিস্ময়কর'। তার ভাষায়, শুধু শিল্পের বিষয়ে বলা কথার জন্য নয়, বরং যেসব বিষয় তারা এড়িয়ে গেছেন, সেগুলোর জন্যও এই প্রতিক্রিয়া। ফিলিস্তিন প্রশ্নে জার্মানির সরকারি অবস্থান নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই 'গভীরভাবে বিরক্ত' বলেও উল্লেখ করেন। তবে জার্মান দর্শকদের কাছ থেকে সবসময় রাজনৈতিক সংহতি পেয়েছেন বলেও জানান।
অরুন্ধতীর মতে, বিষয়টি শিল্পের স্বায়ত্তশাসনের নয়; বরং এর নৈতিক অবস্থানের। তিনি লিখেছেন, 'যদি আমাদের সময়ের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং শিল্পীরা রুখে দাঁড়াতে না পারেন এবং একথা বলতে না পারেন, তবে তাদের জেনে রাখা উচিত যে ইতিহাস তাদের বিচার করবে।'
বিবৃতির শেষাংশে অরুন্ধতী রায় বলেন, 'গভীর দুঃখের সঙ্গে আমাকে বলতে হচ্ছে যে, আমি উৎসবে অংশ নেব না।'
