‘ইন হুইচ অ্যানি গিভস ইট দোজ ওয়ানস’: অরুন্ধতী রায়ের যে সিনেমা ভারতে আজও প্রাসঙ্গিক
আশির দশকের শেষের দিকের এক গুমোট দুপুর। দিল্লির রাজপথ চষে বেড়াচ্ছেন একদল স্থাপত্যবিদ্যার শিক্ষার্থী। তাদের চোখে স্বপ্ন, মুখে তর্ক আর দেশ বদলানোর তাড়না। তারা যেমন আদর্শবাদী, তেমনি সিস্টেমের ওপর ক্ষুব্ধ। তারা জানে, যে পেশার জন্য তারা তৈরি হচ্ছেন, এই সমাজ হয়তো তাদের ঠিকঠাক মূল্যায়ন করবে না।
এটি ১৯৮৯ সালের আলোচিত টেলিফিল্ম 'ইন হুইচ অ্যানি গিভস ইট দোজ ওয়ানস'-এর দৃশ্য। বুকারজয়ী বিশ্বখ্যাত লেখক অরুন্ধতী রায়ের লেখা এবং প্রদীপ কিশেনের পরিচালিত এই ছবিটি ভারতের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অনন্য স্থান দখল করে আছে।
দীর্ঘ প্রায় চার দশক পর নতুন আঙ্গিকে ফিরে আসতে যাচ্ছে ছবিটি। ২০২৬ সালের বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে 'ক্লাসিকস' বিভাগে ছবিটি নির্বাচিত হয়।
যদিও উৎসবের জুরি সদস্যদের 'গাজায় যুদ্ধ চলার সময়ে চলচ্চিত্র নির্মাতাদের রাজনীতির বাইরে থাকা উচিত' মন্তব্যে 'স্তম্ভিত ও বিরক্ত' হয়ে উৎসব থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন অরুন্ধতী রায়।
'ইন হুইচ অ্যানি গিভস ইট দোজ ওয়ানস' ছবিটির সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে ভারতের ফিল্ম হেরিটেজ ফাউন্ডেশন (এফএইচএফ)। সংস্থাটি জানিয়েছে, উৎসবের পর আগামী মার্চ মাসে ভারতের নির্বাচিত কিছু প্রেক্ষাগৃহে এটি মুক্তি দেওয়া হবে। তরুণ দর্শকদের আকৃষ্ট করতে টিকিটের দামও রাখা হবে সাধারণ মানুষের নাগালে।
ভারতের প্রথম ইংরেজি ভাষার পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হিসেবে পরিচিত 'অ্যানি' আদ্যোপান্ত দিল্লির স্থানীয় প্রেক্ষাপটে তৈরি হলেও এর আবেদন ছিল বিশ্বজনীন। খুব সীমিত বাজেটে নির্মিত এই ছবির গল্প এগিয়েছে দিল্লির 'স্কুল অব প্ল্যানিং অ্যান্ড আর্কিটেকচার'-এর শেষ বর্ষের একদল শিক্ষার্থীকে নিয়ে। পড়াশোনা শেষ করে স্নাতক হওয়ার ঠিক আগের সময়টায় তাদের দোলাচল আর অনিশ্চয়তা এতে দারুণভাবে ফুটে উঠেছে।
ছবিটির শিরোনামে 'গিভস ইট দোজ ওয়ানস' কথাটি মূলত দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি জনপ্রিয় চটুল শব্দবন্ধ। এর অর্থ হলো—কারও নিয়মিত কোনো আচরণ বা স্বভাবজাত ভঙ্গি প্রদর্শন করা।
ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র আনন্দ 'অ্যানি' গ্রোভার। তিনি যেমন আদর্শবাদী, তেমনি কিছুটা খামখেয়ালি। হোস্টেলের ঘরে তিনি মুরগি পোষেন আর দেশ বদলানোর জন্য আজব সব পরিকল্পনা করেন। যেমন—রেললাইনের দুপাশে গাছ লাগানো, যা ট্রেনের বর্জ্য থেকে সার পাবে! চার বছর আগে ডিনকে নিয়ে বাথরুমে একটি রসিকতা লিখেছিলেন তিনি, আর সেই থেকে প্রতিবার পরীক্ষায় অকৃতকার্য হচ্ছেন এই স্বপ্নবাজ তরুণ।
সিনেমাটির পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে আড্ডা আর তর্কের আবহ। এর চরিত্রগুলো কেউ তীক্ষ্ণ স্বভাবের, কেউ ভীষণ চিন্তাশীল, আবার কেউবা অস্থির। তারা যেমন বিশ্বখ্যাত স্থপতি লে করবুসিয়ে কিংবা কার্ল মার্ক্সকে নিয়ে গুরুগম্ভীর আলোচনা করে, তেমনি সমান গুরুত্ব দিয়ে তর্ক করে সিগারেটের দাম নিয়ে।
এই সিনেমাতেই 'রাধা' চরিত্রে অভিনয় করেছেন অরুন্ধতী রায় নিজে, যিনি একাধারে আত্মবিশ্বাসী ও প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। তবে বর্তমান দর্শকদের জন্য সবচেয়ে বড় চমক হলো, এই ছবিতেই পর্দায় প্রথম দেখা গিয়েছিল বলিউড বাদশা শাহরুখ খানকে। এটিই ছিল তার অভিনয় জীবনের অভিষেক।
'অ্যানি' সিনেমার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো এর অকৃত্রিম ক্যাম্পাস জীবন। হোস্টেলের সেই অগোছালো ঘর, খাটে আয়েশ করে বসে আড্ডা, সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে আমলাতন্ত্র থেকে পরীক্ষা—সবকিছু নিয়ে যুক্তি-তর্কের ঝড় তোলা। আর ছিল কর্তৃপক্ষের প্রতি এক ধরনের তোয়াক্কা না করার মানসিকতা।
শিক্ষার্থীরা সেখানকার প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মকানুনকে রীতিমতো উপহাস করতেন। এমনকি প্রিন্সিপালকে আড়ালে তারা ডাকতেন 'যমদূত' নামে। ওদিকে প্রিন্সিপালও কম যেতেন না, ছাত্রদের সম্বোধন করতেন 'মাই ডিয়ার ডঙ্কি' (আমার প্রিয় গাধা) বলে।
অরুন্ধতী অভিনীত 'রাধা' চরিত্রটি ছিল সেই সময়ের বিদ্রোহী তারুণ্যের প্রতীক। শাড়ির সঙ্গে হ্যাট পরা কিংবা অবলীলায় সিগারেট ফুঁকে তিনি ক্যাম্পাসের সেই স্বাধীনচেতা ভাবমূর্তি ফুটিয়ে তুলেছিলেন।
নিজের স্মৃতিচারণামূলক বই 'মাদার মেরি কামস টু মি'-তে অরুন্ধতী রায় লিখেছেন, সেই সময়কার ক্যাম্পাসের এক ধরনের 'উদ্ভট নৈরাজ্য' থেকেই এই সিনেমার চিত্রনাট্য তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ছাত্রছাত্রীদের চালচলন এবং হিন্দি ও ইংরেজির এক আজব মিশেলে তৈরি হওয়া তাদের সেই জগাখিচুড়ি 'হিংলিশ' ছিল ছবির প্রাণ।
সিনেমাটি মুক্তির পর দর্শকদের প্রতিক্রিয়া ছিল দেখার মতো। দিল্লিতে এর প্রথম প্রদর্শনীর কথা মনে করে অরুন্ধতী বলেন, 'ছাত্রছাত্রীরা হলরুম উপচে মেঝেতেও বসে পড়েছিল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুরো হল হাসির রোল আর শিস দেওয়ার শব্দে ফেটে পড়ে। তারা যেন পর্দায় নিজেদের প্রতিচ্ছবি, নিজেদের পোশাক, ভাষা আর ছোটখাটো সেই বোকামিগুলোই দেখতে পাচ্ছিল।'
ক্যাম্পাস জীবনের গল্পের বাইরেও 'অ্যানি' সিনেমাটি আশির দশকের ভারতের এক বিশেষ সময়ের সাক্ষী হয়ে আছে। তখন ভারতের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে তরুণদের সংস্কৃতি, তাদের ভাষা এবং সামাজিক অসংগতি নিয়ে কথা বলার সুযোগ আজকের তুলনায় অনেকটা বেশি ছিল। বিশেষ করে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের মাধ্যমে ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার যে স্বাধীনতা তখন ছিল, তা এখনকার সেন্সরশিপের যুগে ভাবা কঠিন।
মুক্তির পর ছবিটি সেরা চিত্রনাট্য ও সেরা ইংরেজি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে দুটি জাতীয় পুরস্কার জয় করে। তবে দূরদর্শনে একবার গভীর রাতে প্রচারের পর সিনেমাটি যেন মূলধারার আলোচনা থেকে একরকম হারিয়েই যায়।
কিন্তু বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেলেও একদল চলচ্চিত্রপ্রেমী ও আর্কিটেকচারের শিক্ষার্থীদের মধ্যে 'অ্যানি'র আবেদন দিন দিন বাড়তে থাকে। সিনেমার 'বুটলেগ' বা অনানুষ্ঠানিক কপিগুলো হাতে হাতে ঘুরতে থাকে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই এটি একটি 'কাল্ট' বা অনন্য সিনেমার মর্যাদা পায়।
ফিল্ম হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের পরিচালক শিবেন্দ্র সিং দুঙ্গারপুর বলেন, 'ভারতে ইংরেজি জানা শিক্ষার্থীদের জীবন নিয়ে এর আগে সেভাবে কেউ সিনেমা বানায়নি। দর্শকেরা পর্দায় এভাবে সাবলীলভাবে ইংরেজি বলা দেখে অভ্যস্ত ছিল না। কিন্তু বিভিন্ন নামী কলেজের ছাত্ররা এভাবেই একে অপরের সঙ্গে কথা বলে। 'অ্যানি' কোনো আড়ষ্টতা ছাড়াই সেই বাস্তবতাকে তুলে ধরেছিল।'
দুঙ্গারপুর আরও যোগ করেন, নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ভারতের অর্থনৈতিক উদারীকরণের ঠিক আগের সময়টা এই সিনেমায় ধরা পড়েছে। তখন সরকারি চাকরি মানে ছিল একদিকে যেমন নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, অন্যদিকে তেমনি একঘেয়েমিতে দমবন্ধ হওয়া অবস্থা। আমলাতন্ত্র, সামাজিক উঁচু-নিচু ভেদাভেদ আর প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে সিনেমার সেই লড়াই আজও মানুষের কাছে পরিচিত।
মূলত এই কারণেই তিন দশক পরও সিনেমাটির আবেদন এতটুকু কমেনি। চারপাশের সমস্যাগুলো যেহেতু এখনো পাল্টায়নি, তাই 'অ্যানি'র সেই প্রতিবাদী সুর আজও দর্শকদের মনে সমানভাবে দোলা দেয়।
পুরনো এই সিনেমাটি নতুন করে ফিরে আসার গল্পটিও অনেকটা সিনেমার মতোই। প্রদীপ কিশেন যখন তার বাড়ি বদলাচ্ছিলেন, তখন হঠাৎ এক গাদা পুরনো চিত্রনাট্য আর কাগজপত্র ভর্তি কয়েকটি ট্রাঙ্ক খুঁজে পান। তিনি প্রায় এগুলো ফেলেই দিচ্ছিলেন। কিন্তু এক বন্ধুর মাধ্যমে খবর পান শিবেন্দ্র সিং দুঙ্গারপুর। তিনি তড়িঘড়ি করে সেগুলো সংগ্রহ করেন এবং 'অ্যানি'কে আধুনিক প্রযুক্তিতে সংস্কারের প্রস্তাব দেন।
এই সংস্কার প্রক্রিয়াটি ছিল রীতিমতো গবেষণার মতো। দীর্ঘ কয়েক দশক পড়ে থাকায় ছবির রঙ চটে গিয়েছিল, শব্দেও ছিল নানা সমস্যা। দুঙ্গারপুর একটি মজার উদাহরণ দিয়ে বলেন, 'সিনেমার শেষ দিকে একটি দৃশ্যে অরুন্ধতী রায় লাল শাড়ি পরেছিলেন। কিন্তু পুরনো প্রিন্টে লাল রঙটি প্রায় মুছে গিয়েছিল। আমাদের তখন চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে হয়েছে—শাড়িটির লাল রঙ আসলে ঠিক কেমন ছিল!'
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সিনেমাটি দেখলে মনে হয়, এটি যেন বিশ্বখ্যাত ঔপন্যাসিক অরুন্ধতী রায়ের লেখক হয়ে ওঠার আগের একটি পূর্বাভাস। তবে তাঁর পরবর্তী জীবনের গম্ভীর কাজের তুলনায় এই সিনেমাটি অনেক বেশি প্রাণবন্ত ও হাসিখুশি। এতে প্রচুর ঠাট্টা-তামাশা আর খুনসুটি আছে। অরুন্ধতী রায় নিজেই এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, এই সিনেমার প্রতিবাদ ছিল এর 'মেজাজে', কোনো 'চড়া স্লোগানে' নয়।
পরিচালক প্রদীপ কিশেন বলেন, 'শিক্ষার্থীরা সেখানে বিদ্রোহ করছিল ঠিকই, তবে তা রাগ দিয়ে নয়, বরং আশা আর আনন্দ দিয়ে। ছবিটি ছিল প্রথা মেনে না চলার এবং নিজের মতো করে বাঁচার গল্প।'
পর্দায় যখন সিনেমাটি আবার ফিরে আসবে, তখন নতুন প্রজন্মের দর্শকেরা হয়তো আশির দশকের সেই আমেজ খুঁজে পাবেন—পুরনো আমলের প্যান্ট, ড্রাফটিং টেবিল আর নিয়ন আলোর নিচে সিগারেটের ধোঁয়া। তবে একই সঙ্গে তারা এটাও অনুভব করবে যে, যে সমাজ বা ব্যবস্থা নিয়ে সিনেমাটি ঠাট্টা করেছিল, সেই ব্যবস্থা আজও খুব একটা বদলায়নি।
দুঙ্গারপুরের ভাষায়, 'নতুন দর্শকেরা দেখবে সেই সময়টা কতটা আধুনিক ছিল। আবার একই সাথে তারা এটাও বুঝবে যে, আজকের সময়ের সঙ্গে এর কতটা অদ্ভুত মিল রয়েছে।'
