ছবিতে ফরাসি অভিনেত্রী ব্রিজিট বারডোর বর্ণাঢ্য জীবন
৯১ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন ফরাসি অভিনেত্রী ব্রিজিট বারডো। ১৯৫০-এর দশকে তিনি হয়ে উঠেছিলেন পর্দার আইকন। সিনেমার জগতকে তিনি নতুন এক জাদুতে মুগ্ধ করে রেখেছিলেন।
'অ্যান্ড গড ক্রিয়েটেড ওম্যান' সিনেমা দিয়ে তার উত্থান। এরপর 'দ্য ট্রুথ', 'কনটেম্পট' এবং 'ভিভা মারিয়া!'-এর মতো সিনেমায় অভিনয় করেন তিনি। পরে অবশ্য সিনেমার জগত ছেড়ে তিনি নিজেকে সঁপে দেন প্রাণী অধিকার রক্ষায়।
বারডোর জীবন ছিল গ্ল্যামার, বিতর্ক আর দৃঢ়তায় মোড়ানো এক আখ্যান।
১৯৩৪ সালে প্যারিসে জন্ম বারডোর। শুরুতে তিনি ব্যালেরিনা বা ব্যালে নৃত্যশিল্পী হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। তবে তার অসাধারণ দক্ষতা খুব দ্রুতই চলচ্চিত্র নির্মাতাদের নজর কাড়ে।
মাত্র ১৮ বছর বয়সে পরিচালক রজার ভাদিমকে বিয়ে করেন তিনি। ভাদিম তাকে নিয়ে তৈরি করেন 'অ্যান্ড গড ক্রিয়েটেড ওম্যান'। এই সাহসী সিনেমাই তাকে রাতারাতি আন্তর্জাতিক তারকায় পরিণত করে।
ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভক যুগের এই ক্লাসিক সিনেমায় তার আবেদনময়ী উপস্থিতি চলচ্চিত্রে নারীত্বের সংজ্ঞাই বদলে দেয়। কান চলচ্চিত্র উৎসবে তিনি হয়ে ওঠেন এক বড় চমক।
১৯৫০-এর দশকের শেষ ভাগ এবং ১৯৬০-এর দশকজুড়ে বারডো হয়ে ওঠেন এক বিশ্বব্যাপী ক্রেজ। 'দ্য ট্রুথ' সিনেমায় তার গভীর অভিনয় সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায়। জঁ-লুক গদারের মাস্টারপিস 'কনটেম্পট'-এও তিনি ছিলেন অনবদ্য। আবার 'ভিভা মারিয়া!' সিনেমায় সহশিল্পী জিন মরোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজের কৌতুকরসের প্রতিভা দেখান।
তার উষ্কখুষ্ক চুল আর চোখে গাঢ় আইলাইনার—সারা বিশ্বে নতুন ফ্যাশন ট্রেন্ড চালু করে। আর তার দুর্দান্ত অভিনয় তাকে সিনেমার জগতে এক পথিকৃৎ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
শুধু আইকনিক চরিত্রেই আটকে থাকেননি বারডো, দেখিয়েছেন অভিনয়ের বৈচিত্র্যও। 'লাভ অন আ পিলো' সিনেমায় তিনি এক জটিল ও আবেগদীর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন। আবার রোমান্টিক ড্রামা 'টু উইকস ইন সেপ্টেম্বর'-এ ফুটিয়ে তোলেন চরিত্রের অসহায়ত্ব।
'দ্য বিয়ার অ্যান্ড দ্য ডল' সিনেমায় কৌতুকপূর্ণ চরিত্রে তিনি ছিলেন দারুণ সাবলীল। এর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন যে যেকোনো ঘরানার ছবিতেই তিনি মানানসই। এই সিনেমাগুলো খুব বেশি আলোচিত না হলেও দর্শকের মন জয় করার ক্ষমতা তাঁর ছিল।
১৯৭৩ সাল। খ্যাতির তখন তুঙ্গে তিনি। ঠিক তখনই মাত্র ৩৯ বছর বয়সে অভিনয়কে বিদায় জানান বারডো। উদ্দেশ্য—প্রাণী অধিকার রক্ষায় কাজ করা।
গড়ে তোলেন 'ব্রিজিট বারডো ফাউন্ডেশন'। সিল শিকার এবং গবেষণাগারে প্রাণীদের ওপর পরীক্ষার বিরুদ্ধে সোচ্চার হন তিনি। নিজের সমস্ত আবেগ ঢেলে দেন এই আন্দোলনে।
পর্দার লাস্যময়ী নায়িকা থেকে সমাজকর্মী—তার এই সাহসী রূপান্তর অনেককেই অবাক করেছিল। তবে এটি ছিল নিজের শর্তে বাঁচার প্রতি তাঁর অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
এরপর সেন্ট-ট্রোপেজে বসবাস শুরু করেন। লাইমলাইট থেকে দূরে বেছে নেন নিরিবিলি জীবন। তবু তিনি ১৯৬০-এর দশকের গ্ল্যামার এবং প্রাণী অধিকার আন্দোলনের প্রতীক হয়েই ছিলেন।
তবে শেষ জীবনে বারডোর ভাবমূর্তি কিছুটা ক্ষুণ্ন হয়। সমকামীদের নিয়ে কটূক্তি এবং জাতিগত বিদ্বেষ ছড়ানোর দায়ে তাকে একাধিকবার জরিমানাও দিতে হয়েছে।
এই বিতর্কগুলো এক কিংবদন্তির স্মৃতিতে কিছুটা হলেও দাগ কেটেছে। অথচ ক্যারিয়ারের স্বর্ণযুগে তিনিই ফরাসি সিনেমাকে বিশ্বদরবারে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন।
