‘আম্মু রিপ্লাই দিচ্ছে না কেন?’: এখনো মায়ের মেসেজ-কলের অপেক্ষায় অভিনেত্রী শিমুর মেয়ে
ওজিহার বয়স এখন ২০ বছর। চার বছর আগে এক কালোছায়া গ্রাস করেছিল তার সাজানো পৃথিবীকে। যখন তার বয়স মাত্র ১৬, তখন নিজের বাবার হাতে খুন হন মা—জনপ্রিয় অভিনেত্রী রাইমা ইসলাম শিমু। সেই থেকে ওজিহার জীবন বিষাদময় এক দীর্ঘশ্বাসের গল্প। মা নেই, আর বাবা সেই খুনের দায়ে কারাবন্দী। জীবনের এই কঠিন সমীকরণে দাঁড়িয়ে ওজিহা আজও খুঁজে ফেরেন—কেন এমন হলো?
সম্প্রতি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে আলাপকালে শিমু হত্যার সেই মর্মান্তিক স্মৃতি ও বর্তমান পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন নিহতের বোন ফাতেমা বেগম।
তিনি জানান, ওজিহার একমাত্র পৃথিবী ছিল তার মা। সেই মা হুট করে হারিয়ে যাওয়ায় ওজিহা চরম মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফাতেমা বেগম বলেন, 'ও তো এখন বড় হয়েছে, সব বোঝে। ওর মনে প্রতিনিয়ত প্রশ্ন জাগে—এমন ঘটনা ওর সাথেই কেন হলো? ওজিহা ওর মাকে এতটাই মিস করে যে, আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে। ওর দাদা বাড়ি থেকেও কেউ কোনো খোঁজ নেয় না। সব মিলিয়ে ও মানসিকভাবে ভীষণ ভেঙে পড়েছে।'
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শিমুর বোন আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, 'গতকালই ওজিহা আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে বলছিল— "আমি আম্মুকে অনেকবার কল ও মেসেজ দিয়েছি, কিন্তু আম্মু রিপ্লাই দিচ্ছে না কেন? তুমি একটু কল করো না, তোমার কল নিশ্চয়ই ধরবে। আম্মু কল ধরলে আমাকে একটু কথা বলতে বলো প্লিজ।" ও এখনো প্রতিনিয়ত শিমুর ফেসবুক আইডিতে আর মোবাইল নম্বরে মেসেজ পাঠায়, কলের পর কল দেয়। মায়ের কোনো উত্তর না পেয়ে হাত-পা কাঁপতে থাকে ওর। আমি চেষ্টা করছি ওকে এই ট্রমা থেকে বের করে আনতে।'
শুধু ওজিহা নয়, শিমুর ছোট ছেলে রায়ানও সেই রাতের বিভীষিকা ভুলতে পারছে না। ঘটনার ছয় বছর পার হলেও মায়ের সেই আর্তনাদ আজও তার কানে বাজে। ফাতেমা বেগম জানান, 'ঘটনার সময় রায়ান রুমে ছিল। ও ঘুম থেকে জেগে একনজর সব দেখেছিল। ও ওর মাকে বলতে শুনেছিল— "রায়ান আমাকে বাঁচাও।' এই শব্দটা ও এখনো ভুলতে পারেনি। ওর বাবা ওকে ধমক দিয়ে শুইয়ে দিয়েছিল। আমরা চেষ্টা করছি ওর মন থেকে এসব স্মৃতি মুছে দিতে।'
এদিকে মেয়ের শোকে শিমুর মা-ও মৃত্যুশয্যায়। ফাতেমা বেগম বলেন, 'আপার প্রিয় খাবারগুলো মা এখন আর খেতে পারেন না। খাবার সামনে এলেই কান্না করেন। মায়ের দ্বিতীয়বার ব্রেন স্ট্রোক হয়েছে। আমাদের একটাই চাওয়া, মা যেন মরার আগে তার মেয়ে হত্যার বিচারটা দেখে যেতে পারেন। আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং ন্যায়বিচারের আশায় আছি।'
মামলার বর্তমান অবস্থা
আদালত সূত্রে জানা গেছে, অভিনেত্রী শিমু হত্যা মামলাটি বর্তমানে ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ নুসরাত জাবীন নিম্মীর আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। মামলায় মোট ৩৩ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৯ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। আগামী ৫ মার্চ পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ ধার্য রয়েছে। শিমুর স্বামী সাখাওয়াত আলী নোবেল ও তার বন্ধু এস এম ফরহাদ বর্তমানে কারাগারে আছেন।
সংশ্লিষ্ট আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর মো. আল আমিন বলেন, 'রাষ্ট্রপক্ষ এই মামলাটিতে খুবই আন্তরিক। সাক্ষীদের জবানবন্দিতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। আমরা আশা করছি তাদের সর্বোচ্চ সাজা হবে এবং ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার পাবে।'
তবে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা দাবি করেছেন, রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে এবং তারা খালাস পাবেন।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ১৭ জানুয়ারি কেরানীগঞ্জের আলীপুর ব্রিজের পাশ থেকে শিমুর বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। দাম্পত্য কলহের জেরে একই বছরের ১৬ জানুয়ারি সকালে তাকে হত্যা করা হয় বলে তদন্তে বেরিয়ে আসে।
এই ঘটনায় শিমুর ভাই হারুনুর রশীদ বাদী হয়ে কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় মামলা করেন। একই বছরের ২৯ আগস্ট পুলিশ চার্জশিট দাখিল করে এবং ২৯ নভেম্বর আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করেন।
