নির্মাণের আগে আবার সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, তিস্তা প্রকল্প পিছিয়ে যাচ্ছে ২০২৯ সাল পর্যন্ত
বছরের পর বছর ধরে একাধিকবার পরিকল্পনা এবং অর্থায়নের প্রস্তাবে নানা পরিবর্তনের পর, 'তিস্তা নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনা প্রকল্প'র মূল নির্মাণকাজে যাওয়ার আগে, আরও একটি নতুন সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই সমীক্ষা শেষ হবে ২০২৮ সালের মার্চে, ফলে বহুল আলোচিত এ প্রকল্পের মূল নির্মাণকাজ শুরু হতে পারে ২০২৯ সালে।
এই নতুন সময়সূচি সরকারের আগের প্রতিশ্রুতির তুলনায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। মাত্র কয়েক মাস আগেও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল যে, চলতি বছরের মধ্যেই প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদন পাবে এবং ২০২৭ সালে মূল কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা সম্ভব হবে। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছেও সেই পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়েছিল। তবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বিডব্লিউডিবি) নতুন প্রস্তাবে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, ২৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়ের এই অন্তর্বর্তীকালীন কারিগরি সমীক্ষাটি সরকার নিজস্ব অর্থায়নে স্বাধীনভাবে পরিচালনা করবে। এই সমীক্ষার প্রতিবেদন জমা হওয়ার পর প্রকল্পের জন্য নতুন করে মূল প্রস্তাব তৈরি করা হবে।
'তিস্তা নদী অববাহিকার সমন্বিত ও টেকসই ব্যবস্থাপনা' প্রকল্পটি বাস্তবায়নে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে উদ্যোগ নেওয়া হলেও—ভূরাজনৈতিক সংবেদনশীলতা ও অর্থায়ন জটিলতার কারণে বারবার এর অগ্রগতি থমকে গেছে।
২০১৬ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান– 'পাওয়ারচায়না'র সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করে। পরবর্তীতে ২০২০ সালের দিকে প্রতিষ্ঠানটি তাদের তৈরি করা একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেয়। এর পাশাপাশি ২০২৪ সালে ভারতও প্রকল্পটিতে অর্থায়নের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল।
আওয়ামী লীগের আমলে প্রকল্পটির অগ্রগতি থেমে থাকলেও, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরিকল্পনা কমিশন ২০২৫ সালের ৩০ জুন 'তিস্তা নদীর সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প'-এর প্রথম পর্যায়ের নীতিগত অনুমোদন দেয়। এর ধারাবাহিকতায় অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) বেইজিংয়ের কাছে একটি প্রাথমিক প্রকল্প প্রস্তাব পাঠায়। এতে প্রথম পর্যায়ের কাজের জন্য প্রায় ৭৪৭.২৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয় ধরা হয়েছিল। এরমধ্যে ৫৫০.৬২ মিলিয়ন ডলার চীন থেকে ঋণ হিসাবে নেওয়ার প্রস্তাব ছিল। বাকি অর্থ সরকারি তহবিল থেকে যোগান দেওয়ার প্রস্তাব ছিল।
প্রাতিষ্ঠানিক ধাপ ও প্রক্রিয়াগত জটিলতা
বর্তমান সরকার তিস্তা এবং পদ্মা ব্যারাজ—উভয় প্রকল্প নিয়েই এগিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করলেও বেশ কিছু আনুষ্ঠানিক ও প্রক্রিয়াগত ধাপ এখনও বাকি রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, নতুন এই সম্ভাব্যতা সমীক্ষাটি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদনের আগে—চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) অননুমোদিত প্রকল্পের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। চলতি অর্থবছরের এডিপির সবুজ পাতায় নতুন অননুমোদিত প্রকল্প তালিকায় প্রকল্পটি ছিল না।
গত সপ্তাহে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক করে প্রকল্পটি এডিপিতে অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরপর সমীক্ষা প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদন প্রক্রিয়া শুরু হবে। অনুমোদনের পাওয়ার পর সমীক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ এ বছরের মধ্যে শুরুর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইআরডি সূত্রে জানা গেছে,তিস্তা প্রকল্পে নিয়ে সরকারের নতুন সমীক্ষার উদ্যোগ স্বাগত জানিয়েছে চীন। একই সঙ্গে নতুন সমীক্ষায় কারিগরি সহায়তা দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে দেশটি।
প্রস্তাবিত সমীক্ষার আওতায় তিস্তা নদীর হাইড্রোলজিক্যাল, হাইড্রোলিক, মরফোলজিক্যাল, পরিবেশগত এবং আর্থ-সামাজিক বিভিন্ন গতিশীলতা মূল্যায়ন করা হবে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো নদীকে সুসংহত করা (রিভার স্ট্যাবিলাইজেশন), নদীভাঙন রোধ এবং পলি ব্যবস্থাপনার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশল নির্ধারণ করা।
দুটি মূল পর্যায় বা কম্পোনেন্টে বিভক্ত এই উদ্যোগটি তিস্তা নদীর সম্পূর্ণ বাংলাদেশ অংশে—অর্থাৎ নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম এবং গাইবান্ধা জেলা এবং এর সাথে যুক্ত সমস্ত শাখা নদীর ওপর—মৌলিক বিশ্লেষণাত্মক গবেষণা ও ফিজিক্যাল মডেলিংয়ের সমন্বয় ঘটাবে।
বিশ্লেষণাত্মক গবেষণা ও ফিজিক্যাল মডেলিং
সমীক্ষার ১ম অংশের (বিশ্লেষণাত্মক গবেষণা) অধীনে নদীভাঙন, বন্যার ঝুঁকি, পলির গতিপ্রকৃতি এবং পানি সংকটের মতো প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত ও মূল্যায়ন করা হবে। এর পাশাপাশি ভূ-উপরিস্থ এবং ভূগর্ভস্থ পানি সম্পদের টেকসই ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে—পানি সংরক্ষণ, ধারণ এবং উন্নত সেচ পরিকল্পনার বিভিন্ন বিকল্পও খুঁজে দেখা হবে।
২য় অংশ অর্থাৎ 'ফিজিক্যাল মডেলিং'-এর অধীনে স্কেলভিত্তিক হাইড্রোলিক মডেল তৈরি করা হবে, যার মাধ্যমে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে নদীর আচরণ, পলিবহন ও এর গঠনগত পরিবর্তন পরীক্ষা করা সম্ভব হবে। এটি নদীর শাসনব্যবস্থা (রিভার ট্রেইনিং স্টাকচার), ড্রেজিং, ক্যানেলাইজেশন এবং প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মূল্যায়নের পাশাপাশি বন্যার ঝুঁকি, কৃষি, অবকাঠামো এবং তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের ওপর প্রভাবগুলো বিশদভাবে পর্যালোচনা করবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশা, কারিগরি এই নীলকশাটি চূড়ান্ত হলে তা উত্তরাঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী জলবায়ু সহনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে—যার মূল লক্ষ্য পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করে সাড়ে ৭ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধার সম্প্রসারণ এবং প্রতি বছরের ভয়াবহ বন্যা থেকে ১ কোটিরও বেশি মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া।
