৫জি প্রস্তুতি প্রকল্পে শম্বুকগতি: বিটিসিএলের ভাগ্যে কী আছে?
কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মধ্যে চলমান টানাপোড়েনের কারণে, বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) ১,০৫৯ কোটি টাকার '৫জি রেডিনেস' (৫জি প্রস্তুতি) প্রকল্পটির কাজ অর্ধেক সম্পন্ন হওয়ার পর স্থবির হয়ে পড়েছে।
এই অচলাবস্থার কারণে, আধুনিক টেলিযোগাযোগ ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সুবিধা পৌঁছে দেওয়া এবং ২০৩০ সাল পর্যন্ত ক্রমবর্ধমান ব্যান্ডউইথ চাহিদা পূরণে নেওয়া অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্কের আধুনিকায়নের এ প্রকল্পের কাঙ্খিত সুবিধা থেকে দেশ বঞ্চিত হচ্ছে বলে জানান কর্মকর্তারা।
২০২২ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মেয়াদ পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। প্রকল্পের অধীনে ইতোমধ্যে প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। তবে কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগে দুদক একটি তদন্ত শুরু করার পর এর বাস্তবায়ন কাজ থমকে যায়। ২০২৫ সালের জুনে দুদক একটি চিঠি দিয়ে জানায়, তদন্ত চলাকালীন প্রকল্পের কাজ চালিয়ে যাওয়া আইনের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ হবে। পরবর্তীতে কমিশনের তদন্ত দল পেয়েছে যে, প্রকল্পের কেনাকাটায় দুর্নীতি হয়েছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ও এসব অভিযোগ পর্যালোচনার জন্য বেশ কয়েকটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। একাধিক অভ্যন্তরীণ ও কারিগরি তদন্ত শেষে মন্ত্রণালয় দুদককে জানায়, ক্রয় প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম খুঁজে পাওয়া যায়নি। কারিগরি বিনির্দেশও সঠিক আছে এবং বিটিসিএলের জন্য সহায়ক।
চলতি বছরের মে মাসে মন্ত্রণালয় দুদকের সচিবকে চিঠি দিয়ে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার অনুরোধ জানায়, যাতে বিটিসিএলের প্রকল্পের বাকি কাজ দ্রুত শেষ করা যায়। তবে কর্মকর্তারা বলছেন, দুদকের শীর্ষস্থানীয় শূন্য পদগুলোতে নিয়োগ না হওয়ায় কমিশন এখনো এই বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। এর আগে গত মে মাসের শেষের দিকে দুদকের তদন্ত কমিটি ৪১ ব্যক্তির বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়ের এবং মূল ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়েকে কালো তালিকাভুক্ত করার সুপারিশ করেছিল।
দুদকের তদন্তে যা পাওয়া গেছে
দুদকের একটি পাঁচ সদস্যের কমিটি প্রকল্পের আটটি ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পেয়ে ৭৯ পৃষ্ঠার একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তবে শীর্ষ পদগুলো শূন্য থাকায় কমিশন এ বিষয়ে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিতে পারছে না।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) যেখানে ২৬ টেরাবাইট ক্ষমতার ডেন্স ওয়েভলেন্থ ডিভিশন মাল্টিপ্লেক্সিং (ডিডব্লিউডিএম) সরঞ্জাম ক্রয়ের সুনির্দিষ্ট অনুমোদন ছিল, সেখানে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ ১২৬ টেরাবাইট সক্ষমতার সরঞ্জাম ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেয়।
এছাড়াও দরপত্র প্রক্রিয়ায় গোপনীয় তথ্য অসৎ উদ্দেশ্যে দরদাতাদের কাছে প্রকাশ, এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট ২০০৬ ও পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস ২০০৮ ভঙ্গ করে দরপত্র প্রক্রিয়ায় "অবৈধ প্রভাব" বিস্তারের চেষ্টা করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। পরিকল্পনা থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি স্তরেই বিভিন্ন প্রকার অনিয়ম, স্বচ্ছতার অভাব এবং প্রক্রিয়াগত গুরুতর অসঙ্গতি দেখা গেছে বলে জানায় কমিটি।
মন্ত্রণালয়ের যুক্তি
গত ৫ মে দুদককে দেওয়া এক চিঠিতে মন্ত্রণালয় অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত বিভিন্ন কমিটির তদন্তের ফলাফল বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছে। এতে বলা হয়, ক্রয় প্রক্রিয়া সমস্ত বিদ্যমান সরকারি বিধিমালা মেনেই সম্পন্ন হয়েছে এবং সর্বনিম্ন রেসপনসিভ দরদাতা হিসেবে হুয়াওয়ে ইন্টারন্যাশনাল ও হুয়াওয়ে টেকনোলজিস (বাংলাদেশ) কনসোর্টিয়ামকে ২৬.৫৫ মিলিয়ন ডলারের (প্রায় ৩১১ কোটি টাকা) চুক্তিটি দেওয়া হয়েছিল। মন্ত্রণালয়ের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং এবং কারিগরি কমিটি—উভয়ই দরপত্র প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম পায়নি।
কারিগরি কমিটি আরও জানিয়েছে, সরঞ্জামের যে মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে তা যথাযথ, সঠিক ও আন্তজার্তিক মানসম্পন্ন এবং ২০৩০ সাল পর্যন্ত দেশের বর্ধিত ব্যান্ডউইথের চাহিদা মেটাতে সক্ষম।
২০২৫ সালের ১৮ জুনে দেওয়া দুদকের চিঠির জবাবে (যেখানে বলা হয়েছিল প্রকল্প চালু রাখা বেআইনি হবে) বিটিসিএলের আইনি উপদেষ্টা যুক্তি দেখান যে, আদালত বা অন্য কোনো উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ ছাড়া কেবল দুদকের একটি অনুসন্ধানের কারণে ক্রয় প্রক্রিয়া স্থগিত করা যায় না।
মন্ত্রণালয় আরও জানায় যে, ২০২৫ সালের ২৯ জুন অনুষ্ঠিত বিটিসিএলের একটি বোর্ড সভায় তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার টেলিযোগাযোগ বিষয়ক বিশেষ সহকারীও প্রকল্প সচল রাখার পক্ষে সমর্থন দিয়েছিলেন, যাতে ইতিমধ্যে ইনস্টল বা স্থাপন করা সরঞ্জামগুলো দ্রুত চালু করা যায়।
সাবজেক্ট ম্যাটার এক্সপার্ট টিম এবং কস্ট-বেনিফিট অ্যানালিসিস কমিটিও বাকি কাজ পুনরায় শুরু করার পক্ষে মত দিয়েছিল বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
প্রকল্প বিলম্বের খেসারত
বিটিসিএল কর্মকর্তাদের মতে, প্রকল্পটির দুটি প্রধান অংশ রয়েছে: সরঞ্জাম সরবরাহ ও ইনস্টলেশনের জন্য প্যাকেজ জিডি-১ এবং অপটিক্যাল ফাইবার স্থাপনের জন্য প্যাকেজ ডব্লিউডি-১। ইতোমধ্যে জিডি-১ এর প্রায় ৮৫ শতাংশ এবং ডব্লিউডি-১ এর ৬০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।
দুদককে দেওয়া চিঠিতে মন্ত্রণালয় সতর্ক করে বলেছে যে, এই প্রকল্প বাতিল করলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হবে। জিডি-১ এর জন্য খোলা যথাক্রমে ৩২৬ কোটি টাকা ও ৩১ কোটি টাকার অপরিবর্তনযোগ্য ঋণপত্র (এলসি) বাতিল করা সম্ভব নয় বিধায়—এই তহবিলগুলো সরকারের আর্থিক ক্ষতিতে পরিণত হওয়া আশঙ্কা রয়েছে।
মন্ত্রণালয় জানায়, প্রকল্প পরিত্যক্ত হলে বিটিসিএলের আইপি প্রকল্পের অধীনে ইনস্টল করা বেশিরভাগ সরঞ্জামই অলস পড়ে থাকবে, যা শত শত কোটি টাকার সরকারি বিনিয়োগের অপচয় ঘটাবে।
চিঠিতে বলা হয়, দেশব্যাপী জেলা ও উপজেলাগুলোতে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিটিসিএলের ব্যাকবোন (নেটওয়ার্ক) গড়ে তুলতে এই প্রকল্প অত্যন্ত অপরিহার্য। ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক চালু না হওয়ায়— বিটিসিএলের চলমান আইপি প্রকল্পের মাধ্যমে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে স্থাপিত যন্ত্রপাতিসমূহ চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে বলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
বিটিসিএলের প্রকল্পটির পরিচালক এস. ওয়াজেদ আলীর যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি। প্রকল্প সম্পর্কে কোনো বিষয়ে জানতে তিনি ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর চিঠি দেওয়ার পরামর্শ দেন। এর বাইরে প্রকল্প সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না বলে এই প্রতিবেদককে জানান তিনি।
গত ১৫ জুন বিটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন মো. আসলাম হোসেন। এর আগে তিনি বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল পিএলসি কোম্পানির এমডি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। মুঠোফোনে তার সঙ্গে যোগাযোগ ও এসএমএস পাঠালেও প্রকল্পটির বিষয়ে জানতে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকজন কর্মকর্তা চলমান দুদক তদন্তের কথা উল্লেখ করে অন-রেকর্ড মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন প্রকল্প কর্মকর্তা বলেন, যেকোনো প্রমাণিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, তবে বিটিসিএলের ভবিষ্যতের জন্য এই প্রকল্প শেষ করা অত্যন্ত জরুরি।
তারা বলেন, ৫জি রেডিনেস প্রকল্প টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে সহায়তা করবে, বাংলাদেশের ডিজিটাল অবকাঠামোকে শক্তিশালী করবে এবং বিটিসিএলের ব্যাকবোন ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে "সবার জন্য দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট" দেওয়ার সরকারি প্রতিশ্রুতি পূরণে সাহায্য করবে।
এক কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেন, এই প্রকল্প সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হলে বিটিসিএল প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর দিক থেকে বেসরকারি প্রতিযোগীদের চেয়ে মারাত্মকভাবে পিছিয়ে পড়বে, যার ফলে গ্রাহক সন্তুষ্টি হ্রাস পাবে এবং প্রতিষ্ঠানটি রাজস্ব ও বাজার অংশীদারিত্ব হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।
তিনি বলেন, "পাশাপাশি বিটিসিএল ব্যান্ডউইথ সরবরাহ সার্ভিস প্রদান থেকে ছিটকে পড়বে এবং এ সংক্রান্ত সকল নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবসা বেসরকারি সংস্থার নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। এই প্রকল্প বিলম্ব বা বাতিল হলে বাংলাদেশের টেলিকম খাতের উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, ডিজিটাল অর্থনীতির অগ্রগতি ব্যাহত হবে এবং সর্বোপরি দেশের জনগণ আধুনিক টেলিযোগাযোগ সেবা হতে বঞ্চিত হবে।"
তার মতে, "৫জি রেডিনেস প্রকল্পটি কেবলমাত্র আর্থিক বিনিয়োগ নয়, এটি বিটিসিএল তথা সরকারের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, কৌশলগত অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অবস্থানকে নির্ধারণ করে। তাই সার্বিক দিকে বিবেচনায় প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি।"
