মালয়েশিয়ায় প্রদর্শনীতে ৩.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক হালাল পণ্যের বাজার ধরতে চায় বাংলাদেশ
বৈশ্বিক হালাল বাজারে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াতে মালয়েশিয়া ইন্টারন্যাশনাল হালাল শোকেসে (মিহাস) খাদ্যপণ্য, ওষুধ, তৈরি পোশাক, পাট, চা, চামড়াসহ বিভিন্ন পণ্য আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সামনে তুলে ধরছেন বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সঙ্গে বাংলাদেশের ছয়টি প্রতিষ্ঠান এবারের প্রদর্শনীতে অংশ নিচ্ছে। মালয়েশিয়া ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড অ্যান্ড এক্সিবিশন সেন্টারে (মাইটেক) গতকাল শুরু হওয়া এ প্রদর্শনী চলবে শনিবার পর্যন্ত। ৩ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের হালাল অর্থনীতির ক্রেতা, পরিবেশক ও সনদ প্রদানকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করছে এ আয়োজন।
এবারের মিহাসে খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনী, ফ্যাশন, অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও পর্যটনসহ ১৪টি খাতের ২ হাজার ৩৮০টি বুথ রয়েছে। আয়োজকেরা ৪৫টি দেশ থেকে ৪৫ হাজার দর্শনার্থী ও ৩০০ ক্রেতার অংশগ্রহণ আশা করছেন। পাশাপাশি ৫৫টি দেশের পাঁচ শতাধিক ক্রেতা এর সোর্সিং কর্মসূচিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
গত বছর ৩০০ ক্রেতা ও মালয়েশিয়ার ৬০০ রপ্তানিকারকের মধ্যে চার হাজারের বেশি সরাসরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই আয়োজনে চীন ও বাংলাদেশ থেকে ৩৯টি করে প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়।
২০০৪ সালে যাত্রা শুরু করা মিহাস এবার 'শেপিং ট্রাস্ট, ড্রাইভিং রেজিলিয়েন্স' প্রতিপাদ্যে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ক্রেতাদের চাহিদার সঙ্গে পণ্যের মিল খুঁজে দিতে এবারের আয়োজনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) একটি ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে।
৩.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার
মালয়েশিয়া এক্সটার্নাল ট্রেড ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের হিসাবে, বৈশ্বিক হালাল অর্থনীতির আকার প্রায় ৩ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার। খাদ্য ও পানীয়ের পাশাপাশি ওষুধ, প্রসাধনী, ফ্যাশন, পর্যটন, ইসলামি অর্থায়ন, লজিস্টিকস ও প্রযুক্তি খাতও এই বাজারের অন্তর্ভুক্ত।
২০২৫ সালে মালয়েশিয়ার হালাল পণ্য রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ১০ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ৬৮ দশমিক ৫২ বিলিয়ন রিঙ্গিতে পৌঁছেছে। এর মধ্যে খাদ্য ও পানীয় রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩৬ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন রিঙ্গিত, যা মোট রপ্তানির ৫৩ দশমিক ৮ শতাংশ। দেশটির প্রধান বাজারগুলোর মধ্যে রয়েছে চীন, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ইন্দোনেশিয়া।
বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনেই, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও ভিয়েতনামের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবারের প্রদর্শনীতে অংশ নিচ্ছে। এর ফলে মালয়েশিয়ার বাইরের ক্রেতা ও বাজারের কাছেও বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর পণ্য তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
২০ লাখ ডলারের ক্রয়াদেশের লক্ষ্য প্রাণের
বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় খাদ্যপণ্য রপ্তানিকারক প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ এবার আটটি স্টলে প্রায় চার হাজার হালাল পণ্য প্রদর্শন করছে। এর মধ্যে রয়েছে স্ন্যাকস, জুস ও পানীয়, কুলিনারি পণ্য, বিস্কুট-বেকারি ও কনফেকশনারিসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য।
এ নিয়ে ১৩তমবারের মতো মিহাসে অংশ নিচ্ছে প্রাণ।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিজনেস ডেভেলপমেন্ট) সামিয়া চৌধুরী বলেন, "এবার আমরা চার হাজার পণ্য প্রদর্শন করছি। শুরু থেকেই খুব ভালো সাড়া পাচ্ছি। বিশেষ করে চীনা কোম্পানিগুলো আমাদের পণ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখাচ্ছে।"
তিনি বলেন, নতুন পণ্য প্রদর্শনের পাশাপাশি কোরিয়ান নুডলসের স্যাম্পলিংও করা হচ্ছে। নুডলসের বাজারে নতুন প্রবণতার সুযোগ কাজে লাগাতে তারা এ পণ্য নিয়ে কাজ করছেন।
সামিয়া চৌধুরী বলেন, মিহাসে অংশগ্রহণের অন্যতম উদ্দেশ্য হালাল খাদ্যের বিশাল বাজারে ব্যবসা সম্প্রসারণে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের হালাল অর্থনীতির বিকাশ ও উদ্ভাবন সম্পর্কে ধারণা নিয়ে প্রাণের রপ্তানি পণ্য ও বাজার কৌশলে নতুনত্ব আনা।
মালয়েশিয়ায় প্রাণের পরিবেশক পিনাকল ফুডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম ভূঁইয়া বলেন, গত বছর মিহাস থেকে প্রাণ প্রায় ১৫ লাখ ডলারের ক্রয়াদেশ পেয়েছিল। এবার তা ২০ লাখ ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন তারা।
তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়া ও ব্রুনেইতেও হালাল পণ্যের বড় বাজার রয়েছে। এসব বাজারে প্রাণের উপস্থিতি বাড়ানোও মিহাসে অংশগ্রহণের অন্যতম লক্ষ্য।
সেলিম ভূঁইয়া জানান, হালাল বাজারে প্রবেশের জন্য জাকিম, ইন্দোনেশিয়ার এমইউআই, বাংলাদেশের ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ ছয়টি সার্টিফিকেশন বোর্ডের সঙ্গে কাজ করছে প্রাণ। মালয়েশিয়ার জাকিম কর্তৃপক্ষ প্রাণের প্রায় ৪৫০টি পণ্যের হালাল সনদ দিয়েছে।
তবে মালয়েশিয়ার বাজারে বাংলাদেশি পণ্য প্রবেশের ক্ষেত্রে উচ্চ শুল্ককে বড় বাধা হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা।
সেলিম ভূঁইয়ার মতে, আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো মালয়েশিয়ার বাজারে কম বা শূন্য শুল্কে পণ্য রপ্তানির সুযোগ পেলেও বাংলাদেশের অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্কের হার ৩০ শতাংশ পর্যন্ত। এ কারণে মালয়েশিয়ার সঙ্গে দ্রুত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তার মতে, শুধু হালাল খাদ্য নয়, অন্যান্য বাংলাদেশি পণ্যের জন্যও মালয়েশিয়ায় বড় বাজার তৈরির সুযোগ রয়েছে।
আরও বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান
প্রাণের পাশাপাশি আরও কয়েকটি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান এবার মিহাসে অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ঘরের বাজার, তালুকদার এগ্রো ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, বায়োফার্মা লিমিটেড, প্যারাগন এগ্রো ও বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের প্রতিষ্ঠান মৈত্রী ইনফিনিটি। বাংলাদেশের রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোও (ইপিবি) একটি স্টল নিয়েছে।
ইপিবির স্টলে তৈরি পোশাক, ওষুধ, হারবাল পণ্য, সিরামিক, পাটজাত পণ্য, চা ও চামড়াজাত পণ্য প্রদর্শন করা হচ্ছে। বাংলাদেশ মালয়েশিয়া চেম্বারও মেলায় অংশ নিয়েছে।
তালুকদার এগ্রো ফুড অ্যান্ড বেভারেজের স্বত্বাধিকারী রিপন তালুকদার এবারই প্রথম মিহাসে অংশ নিয়েছেন। কালোজিরার মধু, মাংসের মসলা, অলিভ অয়েল, ঘি ও সরিষার তেলসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে মেলায় এসেছেন তিনি। তার মূল লক্ষ্য মালয়েশিয়াসহ আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন ক্রেতা ও পরিবেশক খুঁজে পাওয়া।
ঘরের বাজারও প্রথমবারের মতো মেলায় অংশ নিয়েছে। পাবনা, রংপুর ও ঢাকার আমুলিয়ায় উৎপাদন কার্যক্রম থাকা প্রতিষ্ঠানটি মালয়েশিয়ায় নতুন পরিবেশক খুঁজছে।
বায়োফার্মা লিমিটেডের জিএম ও হেড অব ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস মো. আলাউদ্দিন বাচ্চু খান বলেন, মূলত ওষুধ রপ্তানির লক্ষ্যেই তারা মিহাসে অংশ নিয়েছেন।
কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি তারিকুল ইসলাম বলেন, "প্রাণসহ বাংলাদেশের ছয়টি কোম্পানি মেলায় অংশ নিয়েছে। ইপিবিও অংশ নিয়েছে। বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দূতাবাসের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।"
পণ্যের পাশাপাশি নতুন বাজারের সন্ধান
মেলায় প্রাণের স্টলগুলোতে বিভিন্ন দেশের ক্রেতাদের আনাগোনা দেখা গেছে। তারা পণ্যের উপাদান, স্বাদ, উৎপাদন প্রক্রিয়া ও দাম সম্পর্কে খোঁজ নিচ্ছেন।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে বিশ্বের ১৪৮টি দেশে তাদের পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। এর মধ্যে ভারত, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য উল্লেখযোগ্য। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রাণ প্রায় ৩২ কোটি ৩০ লাখ ডলার সমমূল্যের খাদ্যপণ্য রপ্তানি করেছে।
এশিয়া, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও আফ্রিকায় হালাল পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের মধ্যে মিহাস বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের আন্তর্জাতিক ক্রেতা, হালাল সনদের প্রয়োজনীয়তা ও নতুন পরিবেশকদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।
রাশিয়ার ক্রেতা প্রতিষ্ঠান মারেভেনের পরিচালক ইগর সারাকভ প্রাণের স্টল পরিদর্শন করে বলেন, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর খাবারের সন্ধানেই তিনি মেলায় এসেছেন। প্রাণের বিভিন্ন ধরনের পণ্য তার চাহিদার সঙ্গে মেলে বলেও জানান তিনি।
