জলবায়ু-ঝুঁকি: বিশ্বের সবচেয়ে কম সহনশীল শহরের তালিকায় ঢাকা ও চট্টগ্রাম
বাংলাদেশ মারাত্মক জলবায়ু ঝুঁকির সম্মুখীন এবং রাজধানী ঢাকা বিশ্বের বড় শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ মাত্রার প্রত্যক্ষ জলবায়ু ঝুঁকি বহন করছে। এমন তথ্য দিয়েছে জলবায়ু ঝুঁকি ও সহনশীলতা সূচক (সিআরআরআই)।
আলফাজিওর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সূচকে মূল্যায়িত ৭২টি প্রধান শহরের মধ্যে ঢাকার প্রত্যক্ষ ঝুঁকি স্কোর ছিল ৬০, যা সর্বাধিক। এই স্কোরের মাধ্যমে অভিযোজনের পদক্ষেপগুলো বিবেচনায় নেওয়ার আগেই জলবায়ু সংক্রান্ত বিভিন্ন দুর্যোগে একটি শহরের ঝুঁকির মাত্রা পরিমাপ করা হয়েছে।
অনুকূল অভিযোজনমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে ঢাকা এসব ঝুঁকি কমাতেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ঢাকা অভিযোজন উদ্যোগগুলোর ঝুঁকি ২৪ পয়েন্ট কমিয়েছে, ফলে এর অভিযোজন হার দাঁড়িয়েছে ৪০ শতাংশে। তবে, অতিরিক্ত মাত্রায় প্রত্যক্ষ ঝুঁকির কারণে এর 'রেজিলিয়েন্স-অ্যাডজাস্টেড রিস্ক' (আরএজে) বা সহনশীলতা-সমন্বিত ঝুঁকি স্কোর ৩৬-এ রয়ে গেছে। এটি ঢাকাকে ৭২টি শহরের এই সূচকে সবচেয়ে কম সহনশীল ছয়টি প্রধান শহরের তালিকায় রেখেছে।
চট্টগ্রামের অবশিষ্ট ঝুঁকি তুলনামূলক কম
বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রধান শহর চট্টগ্রাম—ঢাকার তুলনায় কম প্রত্যক্ষ জলবায়ু ঝুঁকির মুখোমুখি এবং অভিযোজন পদক্ষেপের পর এর অবশিষ্ট ঝুঁকির মাত্রাও কম। চট্টগ্রামের প্রত্যক্ষ ঝুঁকি স্কোর ছিল ৪৬ এবং বিভিন্ন অভিযোজনমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে শহরটি তার ঝুঁকি ১৬ পয়েন্ট কমাতে পেরেছে। ঢাকার ৪০ শতাংশের তুলনায় চট্টগ্রামের অভিযোজনের হার ছিল ৩৪.৮ শতাংশ।
ঢাকার অভিযোজনের হার বেশি এবং ঝুঁকি কমানোর মোট পরিমাণ বেশি হওয়া সত্ত্বেও, চট্টগ্রামের সহনশীলতা-সমন্বিত ঝুঁকি স্কোর ছিল কম, অর্থাৎ ৩০। এটি মূলত শহরের প্রত্যক্ষ ঝুঁকির প্রাথমিক মাত্রা কম থাকারই প্রতিফলন। চট্টগ্রাম বেশ কয়েকটি প্রধান দক্ষিণ এশীয় শহরের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। করাচি, ফয়সালাবাদ, কলকাতা এবং লাহোর যথাক্রমে ৩২, ৩৪, ৩৫ এবং ৩৫ স্কোর নিয়ে চট্টগ্রামের পেছনে অবস্থান করছে।
চাপ বাড়াচ্ছে তীব্র তাপপ্রবাহ
সূচকে থাকা দক্ষিণ এশীয় শহরগুলো চরম জলবায়ু ঝুঁকির সম্মুখীন, যেখানে তীব্র তাপপ্রবাহ অন্যতম প্রধান অনুঘটক। বৈশ্বিক এই বিশ্লেষণে সবচেয়ে কম সহনশীল ছয়টি প্রধান শহরের সবগুলোই দক্ষিণ এশিয়ায় অবস্থিত। ভারতের আহমেদাবাদ এবং পাকিস্তানের হায়দ্রাবাদ ৪১ পয়েন্ট নিয়ে সবচেয়ে বেশি সহনশীলতা-সমন্বিত ঝুঁকির শীর্ষে রয়েছে, যার পরেই রয়েছে মুলতান (৩৮ পয়েন্ট)। ৩৬ স্কোর নিয়ে তালিকার পরবর্তী অবস্থানে রয়েছে ঢাকা। এছাড়া কলকাতা ও লাহোর উভয়েরই স্কোর ছিল ৩৫।
ঢাকার সার্বিক ঝুঁকি বেশি হওয়া সত্ত্বেও, এর অভিযোজন প্রচেষ্টা অঞ্চলের বেশ কয়েকটি প্রতিবেশী শহরের চেয়ে শক্তিশালী। বিশ্লেষণটিতে তালিকাভুক্ত দক্ষিণ এশীয় শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার ২৪ পয়েন্ট ঝুঁকি হ্রাস ছিল সর্বোচ্চ। প্রতিবেদনটিতে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার অভিযোজন সক্ষমতাকে 'মাঝারি' বলে বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে অঞ্চলটির মুখোমুখি হওয়া প্রত্যক্ষ জলবায়ু ঝুঁকির পরিমাণের তুলনায় অভিযোজনের হার এখনও অনেকটাই কম।
জলবায়ু ঝুঁকি তৈরি করছে আর্থিক চাপ
ঢাকার মুখোমুখি হওয়া উচ্চ জলবায়ু ঝুঁকি বাংলাদেশের জন্য বিশেষত দুর্যোগ মোকাবিলা, অবকাঠামো মেরামত এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ব্যয়ের মাধ্যমে আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ুজনিত প্রত্যক্ষ ঝুঁকি যে হারে বাড়ছে, সেটির সাথে তাল মিলিয়ে মানিয়ে নেওয়ার বা 'অভিযোজন ঘাটতি' দ্রুত দূর করার সক্ষমতা বাংলাদেশের সীমিত। এটি সরকারের জন্য অনুমিত দায় তৈরি করতে পারে এবং সার্বিক রাষ্ট্রীয় ও পৌর বন্ড বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
আবাসন ও অবকাঠামো খাতের বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে এসব ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে সম্পদের মূল্যহ্রাস, অবকাঠামোর আয়ুষ্কাল কমে যাওয়া এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটা।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে 'অভিযোজন অর্থায়নে' সম্ভাব্য অগ্রাধিকারযোগ্য দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, কারণ দেশটির প্রত্যক্ষ জলবায়ু ঝুঁকি এবং বর্তমান অভিযোজন প্রচেষ্টার মধ্যে অনেক বড় ব্যবধান রয়েছে। সুবিধাজনক শর্তে ঋণ এবং উন্নয়ন অর্থায়ন এসব ঝুঁকির কিছু অংশ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
অন্যান্য এশীয় শহরের চেয়ে পিছিয়ে দক্ষিণ এশিয়া
পূর্ব এশিয়ার প্রধান শহরগুলোর সাথে তুলনা করলে জলবায়ু ঝুঁকি কমাতে বিনিয়োগ এবং অভিযোজনের ভূমিকার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ, উচ্চমাত্রার তাপদাহের ঝুঁকির মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও টোকিওর 'সহনশীলতা-সমন্বিত ঝুঁকি' স্কোর মাত্র ২০। অন্যদিকে, বেইজিং এবং সাংহাইয়ের মতো চীনা শহরগুলোতে অভিযোজনের হার ৪৬ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যে।
দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ১৮ স্কোর নিয়ে মুম্বাই সূচকের সবচেয়ে সহনশীল শহর হিসেবে স্থান পেয়েছে, যার পরে রয়েছে দিল্লি (২৩) এবং কলম্বো (২৪)। তালিকায় চট্টগ্রামের অবস্থান ৩০ নম্বরে। যেখানে করাচির স্কোর ৩২, ফয়সালাবাদ ৩৪, কলকাতা ও লাহোর ৩৫, ঢাকা ৩৬, মুলতান ৩৮ এবং হায়দ্রাবাদ ও আহমেদাবাদ ৪১।
পরিসংখ্যানগুলো নির্দেশ করছে, অভিযোজনমূলক উদ্যোগ জলবায়ু ঝুঁকি কমাতে পারে। তবে অতিরিক্ত মাত্রায় প্রত্যক্ষ ঝুঁকির মুখোমুখি থাকা শহরগুলো সহনশীলতায় বড় ধরনের বিনিয়োগের পরও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অবশিষ্টাংশ ঝুঁকির মুখেই থেকে যায়।
