নাচের ছন্দে জীবনের সুর ফিরে পেলেন শিল্পী
পদ্মার তীরে নাচের ছন্দে বেড়ে উঠেছিলেন সাইকা খাতুন শিল্পী। শৈশবের সেই নদী, উৎসবের ঢাকঢোল আর নৃত্যের মুদ্রা ছিল তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু জীবনের একপর্যায়ে সেই ছন্দ থেমে যায়। দাম্পত্য জীবনে নির্যাতন, স্বামীর মাদকাসক্তি এবং সন্তান জন্মদানের সময়কার কষ্টকর অভিজ্ঞতা তাকে ঠেলে দেয় জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়ে।
শেষ পর্যন্ত নিজের সন্তানকে নিরাপদে বড় করে তুলতে স্বামীকে ছেড়ে নতুন করে জীবন শুরু করেন তিনি। প্রশিক্ষণ, অদম্য মনোবল ও পরিবারের সহায়তায় আজ রাজশাহীতে তিনি একজন সফল বিউটিশিয়ান ও উদ্যোক্তা। তার এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প যেন নিজের হারিয়ে যাওয়া ছন্দকে আবার খুঁজে পাওয়ার গল্প।
রাজশাহীর এক হিন্দু পাড়ায় পদ্মার তীর ঘেঁষে কেটেছে সাইকা খাতুন শিল্পীর শৈশব। বিশাল ও ধীরস্থির পদ্মা তার ছোটবেলার দিনগুলোর নীরব সঙ্গী। 'স্কুল-কলেজের দিনগুলো থেকে শুরু করে শিক্ষকতা, আমার জীবনটাই কেটেছে নাচের ছন্দে,' বলেন শিল্পী। নিজের হাতে গড়ে তোলা কর্মস্থলে যাওয়ার পথটিও যেন তার কাছে নাচের তালে এগিয়ে চলার মতো।
পূজার মৌসুম এলেই বদলে যেত চারপাশের পরিবেশ। ঢাকঢোলের শব্দে মুখর হয়ে উঠত জনপদ, আকাশে ঝলসে উঠত আতশবাজি। দেবী দুর্গার বিসর্জনের আগে নদীর তীরে গোল হয়ে নাচতেন মানুষ। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য মুগ্ধ হয়ে দেখতেন কিশোরী শিল্পী। নাচের মুদ্রাগুলোর নাম জানতেন না, কিন্তু চোখের সামনে দেখা প্রতিটি পদক্ষেপ তিনি মনে গেঁথে রাখতেন।
শিল্পী স্মৃতি হাতড়ে বলেন, 'দুর্গাপূজার শেষে সবাই নদীর তীরে নাচত। আমি বাড়ি ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সেই নাচের মুদ্রাগুলো আয়ত্ত করার চেষ্টা করতাম। তখন থেকেই নাচের বিষয়টি আমার মনের গভীরে কোথাও না কোথাও গেঁথে গিয়েছিল।'
তাঁদের পরিবারে বাঙালি হিন্দু সংস্কৃতির চিরাচরিত উৎসব 'বারো মাসে তেরো পার্বণ' বেশ ঘটা করেই উদযাপিত হতো। তবে নাচ শেখার বিষয়টি পরিবারের কাছে তখনও খুব একটা প্রাধান্য পেত না। নিজের ইচ্ছাপূরণে একদিন নিজেই উদ্যোগী হলেন কিশোরী শিল্পী। মায়ের ব্যাগ থেকে টাকা নিয়ে চুপিচুপি ভর্তি হয়ে গেলেন একটি নাচের ক্লাসে। তিনি বলেন, 'হুলস্থূল কাণ্ড বেঁধে গিয়েছিল। আমি নাচতে চেয়েছিলাম বলে নয়, বরং চুরি করেছিলাম বলেই এমনটা হয়েছিল।'
কয়েক দিন শাস্তি পেতে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু সেই ঘটনার একটি দিক আজও শিল্পীর মনে উজ্জ্বল। শেষ পর্যন্ত নাচের প্রতি তাঁর আগ্রহে সায় দিয়েছিলেন তাঁর মা। শিল্পী বলেন, নাচের প্রতি আমার আগ্রহের বিষয়ে শেষ পর্যন্ত মায়ের সমর্থন ছিল। তিনি শুধু চেয়েছিলেন আমি যেন সৎ থাকি।
স্কুল ও কলেজের দিনগুলো পেরিয়েও নাচ তাঁর সঙ্গী হয়ে ছিল। পড়াশোনা শেষ করে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে শাস্ত্রীয় নৃত্য শেখাতে শুরু করেন তিনি। পাশাপাশি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও নিয়মিত পরিবেশনা করতেন। শাস্ত্রীয় নৃত্যে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে অল্প অল্প করে অর্থ জমাতেন। স্থিতিশীল আয়ের পাশাপাশি পরিচিতি বাড়ছিল শিল্পীর, আর ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিল বড় স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের পরিধি পদ্মার তীর ছাড়িয়ে বহুদূর বিস্তৃত ছিল।
এরই মধ্যে প্রেম আসে শিল্পীর জীবনে। যে মানুষটি তাঁর হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন তাঁর এক ছাত্রীর বড় ভাই এবং সে নিজেও একজন পেশাদার নৃত্যশিল্পী। প্রায় দুই বছর ধরে তাঁকে পাওয়ার চেষ্টা করার পর শিল্পী বিয়েতে রাজি হন। তখন তাঁর বয়স বিশের কোঠায়। 'তিনি আমার মন জয় করে নিয়েছিলেন,' বলেন শিল্পী। কিন্তু সেই ভালোবাসার সম্পর্কই পরে তাঁর জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়ের সূচনা করে।
স্বামী বেকার হওয়ায় এবং নিজেদের আলাদা বাসা করার সামর্থ্য না থাকায় শিল্পী বাবা-মায়ের সঙ্গেই থাকতে থাকেন। ধীরে ধীরে সামনে আসে কঠিন সত্য। তাঁর স্বামী দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত। শিল্পীর কাছে বিয়েটা মানসিক, আর্থিক ও শারীরিক নির্যাতনের এক চক্রে পরিণত হয়। তারপরও সংসারটি বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন শিল্পী। চেষ্টা করলে সংসার বাঁচাতে পারবেন এই ভাবনায় আটকে ছিলেন তিনি।
স্বামী কোনো চাকরিতে টিকতে পারছিলেন না। সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে শিল্পীর কাঁধে। নাচ শেখানোর পাশাপাশি রিসেপশনিস্ট হিসেবেও কাজ করতে শুরু করেন তিনি। কিন্তু স্বামীর নির্যাতন কিংবা মাদকাসক্তির কথা পরিবারের কাউকে জানাননি। শিল্পী বলেন, আমার সব মনোযোগ ছিল সংসার টিকিয়ে রাখা আর যাকে ভালোবাসতাম, সেই মানুষটিকে বাঁচানোর ওপর,'। এরপর তিনি অন্তঃসত্ত্বা হলেন। শিল্পী বলেন, সবাইকে বলতে শুনেছি, গর্ভাবস্থা এক আনন্দের সময়। আমি খুশিই ছিলাম, কিন্তু একই সঙ্গে ভীষণ ভীতও ছিলাম।
বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য ছিল না। তাই সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। প্রসবের সময় পানি ভেঙে যাওয়ার পর চিকিৎসকেরা জানতে পারেন, শিশুটির উল্টে আছে। জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন তাঁরা। কিন্তু অস্ত্রোপচারের খরচ বহন করার সামর্থ্য না থাকায় শিল্পী রাজি হচ্ছিলেন না। পরবর্তী আট ঘণ্টা ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়গুলোর একটি।
তখনকার যন্ত্রণার বর্ণনা দিয়ে শিল্পী বলেন, মনে হচ্ছিল সবকিছু যেন ভীষণ উত্তপ্ত, ধবধবে সাদা আর দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নেওয়ার মতো তীব্র আলোয় আচ্ছন্ন। চিকিৎসকেরা তাঁকে বোঝাচ্ছিলেন, বোনেরা অনুনয় করছিলেন আর বাবা-মা তাঁর হাত ধরে কাঁদছিলেন। অন্যদিকে তাঁর স্বামী মাদকের ঘোরে ওয়ার্ডের এক কোণে পড়ে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের প্রচেষ্টায় অস্ত্রোপচারে সম্মতি দিতে বাধ্য হন তিনি।
জ্ঞান ফেরার পর নার্স তাঁর কোলে তুলে দেন ছোট্ট এক শিশুকে। শিল্পী বলেন, আমি নিচের দিকে তাকাতেই এক জোড়া চোখ আমার দিকে ফিরে তাকাল। ওটাই ছিল আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর মুখ। সেই মুহূর্তেই যেন বদলে গেল সবকিছু। সমস্ত ব্যথা আর মনের কষ্ট নিমেষেই মিলিয়ে গেল।
তখনই নিজের জীবনের পরবর্তী সিদ্ধান্তটি নিয়ে ফেলেন শিল্পী। নিজের ছেলেকে মাদকাসক্ত ও বিপজ্জনক পরিবেশে বেড়ে ওঠা থেকে বাঁচাতে কঠোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। সেদিন সন্ধ্যায় স্বামী তাঁকে দেখতে এলে শিল্পী শান্তভাবে তাঁকে চলে যেতে বললেন। কোনো নাটকীয়তা ছিল না, ছিল না ফিরে যাওয়ার ইচ্ছাও। এরপরের দেড় বছর ছিল নিজেকে এবং নিজের জীবনকে নতুন করে গড়ে তোলার সময়।
দীর্ঘদিন নাচ ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে সৌন্দর্য, সাজসজ্জা ও এ সংক্রান্ত খুঁটিনাটির প্রতি তাঁর ছিল স্বাভাবিক এক ভালোলাগা। শিল্পী বুঝতে পারলেন, এই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে নতুন একটি পেশা তৈরি করা সম্ভব। তাই ব্র্যাকের দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় ছয় মাসের মেকআপ আর্টিস্ট্রি প্রশিক্ষণে ভর্তি হলেন তিনি। সেই প্রশিক্ষণ যেন তাঁর জীবনে নতুন বাতাসের মতো এসে ধরা দিল।
প্রশিক্ষণ শেষে বাড়ির কাছেই ছোট একটি ঘর ভাড়া নিয়ে শুরু করলেন নিজের বিউটি পার্লার। শুরুটা ছিল একেবারেই সাদামাটা। বাবা কিনে দিলেন একটি ব্যবহৃত চেয়ার, বোন কিনে দিলেন একটি টেবিল। প্রতিষ্ঠানের নাম রাখলেন 'শিল্পীর ছোঁয়া বিউটি পার্লার'। প্রথমদিকে তাঁর গ্রাহক ছিলেন প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন ও ছোটবেলার পরিচিতরা। কিন্তু তাঁর কাজের মানের কথা বেশিদিন গোপন থাকেনি।
দ্রুতই বাড়তে থাকে গ্রাহকের সংখ্যা। একসময় বোনকে হিসাবরক্ষক হিসেবে নিয়োগ করেন তিনি। তিনজন তরুণীকে হাতে-কলমে কাজ শেখান। একই সঙ্গে নিজের পেশাগত নেটওয়ার্কও বিস্তৃত করতে থাকেন। যোগ দেন রাজশাহী বিউটি পার্লার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনে। পরে সদস্য হন রাজশাহী চেম্বার অব কমার্সের। নেপালের রাষ্ট্রদূত রাজশাহী সফরে এলে নিজের পেশা ও খাতের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগও পান তিনি।
পেছনে পড়ে থাকা সময়ের আক্ষেপ অবশ্য ছিল। কিন্তু সেই আক্ষেপকে থামার কারণ হতে দেননি শিল্পী। আজ সাইকা খাতুন শিল্পী একজন সফল বিউটিশিয়ান, উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী। তাঁর 'শিল্পীর ছোঁয়া' পার্লার রাজশাহীর অন্যতম পরিচিত বিউটি পার্লার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে ব্যবসায়িক সাফল্যের বাইরেও তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন মা।
তাঁর ছেলের বয়স প্রায় ১০ বছর। ক্রিকেট খেলতে ভালোবাসে, স্বপ্ন দেখে বড় হয়ে ক্রিকেটার হওয়ার। একসময় যে পরিবার তাঁর কষ্টের নীরব সাক্ষী ছিল, আজ সেই পরিবারই তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি। বয়স্ক বাবা-মা এখন তাঁর সঙ্গেই থাকেন। তাঁদের দেখাশোনার দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন তিনি। আর পদ্মা? রাজশাহীর বুক চিরে নদীটি আজও একইভাবে বয়ে চলে। শৈশবের সেই নদী এখন শিল্পীর কাছে শুধু স্মৃতি নয়, জীবনের এক গভীর প্রতীক।
শিল্পী বলেন, এটি আমাকে সেই সবকিছুর কথা মনে করিয়ে দেয়, যা আমাকে পেছনে ফেলে আসতে হয়েছিল। একসময় তাঁর লড়াই ছিল টিকে থাকার জন্য। এখন তাঁর স্বপ্ন আরও বড়। 'শিল্পীর ছোঁয়া'কে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে চান তিনি। তার লক্ষ্য রাজশাহীর শীর্ষ ১০ জন ব্যবসায়ীর একজন হওয়া। সেই লক্ষ্য পূরণ হবে এ বিশ্বাস তাঁর অটুট।
